শনিবার , ১৮ এপ্রিল ২০২০ |

প্রকৃতির প্রতিশোধ কি করোনা ভাইরাস ?

মো: ইয়ামিন   শনিবার , ১৮ এপ্রিল ২০২০

নিয়তির খেলা বোঝা বড় দায়, আজ বিশ্বের মানুষ যখন ঘরের ভেতরে বন্দী ঠিক সেই সময় পশু-পাখি, নদ-নদীর প্রানীরা মুক্ত, বায়ুমন্ডল আগের থেকে অনেক ভাল, মোট কথা হল মানুষ ছাড়া সবাই এখন ভাল আছে। যে প্রকৃতি আমাদের উজার করে দিয়ে জীবন বাঁচাতে সাহয্য করেছে তারাই আজ একটু স্বস্তি নিচ্ছে ।

তবে কি কারণ এটাই! বিশ্ববাসীকে করোনাই শিক্ষা দিচ্ছে? যুদ্ধ-বিগ্রহের পাশাপাশি নানা সামাজিক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে মানব জাতি। নিজেদের উন্নতি, অগ্রগতির জন্য যা ভালো, তাই করি। সাম্রাজ্যবাদ আর পুজিবাদের কারণে সঠিক-বেঠিক ভুলে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে প্রকৃতির উপর করা অত্যাচারের এমনতর প্রতিশোধ।   

 আসলে করোনা কি মানব জাতিকে শিক্ষা দিচ্ছে ? এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব কারো কাছে নেই। সময়ের প্রেক্ষাপট হিসেব করলে যে যাই বলুক, যে যেভাবেই হিসেব মিলাক এই বৈশ্বিক ইকোসিস্টেম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমেরিকা, চীন, রাশিয়া বা অন্য যে কোন দেশের  অপব্যবহারের ফলই   ভোগ করতে হচ্ছে সবাইকে।  এই করোনা যেখান থেকেই ছড়াক না কেন তা পরিবেশ ধ্বংসের অনিবার্য ফল। 

কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মূলধারার সংবাদমাধ্যমে  দেখতে পাচ্ছি- কক্সবাজারে সৈকত ঘেঁষা সমুদ্রে খেলছে ডলফিন। সাদা আর কালো রঙের ডলফিনেরা মনের আনন্দে নাচছে। মাথা তুলে ছুটছে। আবার গোটা শরীর পানির উপরে ছুড়ে দিয়ে আবার ঝপ করে ডুব মারছে পানিতে। এই সমুদ্রে ডলফিন ছিল, তা আগে হয়তো কারো দেখা হয়নি।

আবার সমুদ্রের তীরে লাল কাকঁড়া দলে দলে মনের আনন্দ গুড়ে বেড়াচ্ছে ।  সমুদ্রের পাড়ে জন্ম নিচ্ছে সবুজ লতা-পতা । কি মনোরম দৃশ্য যা আগে সচরাচর দেখা যেত না । এখন দেখচ্ছি। সমুদ্রতীরে মানুষের আনাগোনা নেই। নেই সমুদ্রে নেমে ঝাঁপাঝাঁপি। সর্বোপরি নেই সমুদ্রে ময়লা ফেলার মচ্ছব। তাই নিজেদের সমুদ্রের দখল পেয়েই বুঝি ডলফিনগুলো মনের আনন্দে এই নাচানাচি করছে। দেখুন প্রকৃতি কতই না উদার। আর তাই মাত্র ক’দিনের নিষ্কৃতিতে সমুদ্র ফিরে পেয়েছে তার রঙ। তার নিজের রূপ। এই নিষ্কৃতি যে সহজেই মিলেছে তা নয়। করোনা নামের ঘাতক ভাইরাস যখন মানবকুলে তার মরণ কামড় বসিয়েছে, তখন প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শত্রু  মানুষ ঢুকে পড়েছে ঘরে। খুব যে সচেতনতায়, তা নয়, স্রেফ আতঙ্কে। বাঁচার তীব্র বাসনায়।

এই লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাসের বাসনায় সুন্দর ধরিত্রীটিকে আমরা কোথায় নিয়ে ফেলেছি, তা আমাদের সকলেরই জানা। সে কারণে এই করোনা ভাইরাসকে কেউ কেউ প্রকৃতির শিক্ষা হিসেবেই দেখছেন। কেউ কেউ প্রকৃতির প্রতিশোধ বলতেও দ্বিধা করছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী, ‘পয়জন স্প্রিং’ নামে বিশ্বখ্যাত পরিবেশবাদী বইয়ের রচয়িতা এভাগেলোস ভ্যালিয়ানাটোস তার সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে বলেছেন- করোনা ভাইরাস প্যানডেমিক কোনো দুর্ঘটনা নয়। অতীতের আরও অনেক বৈশ্বিক মহামারির মতো এও প্রকৃতির এক সতর্কবার্তা, যা পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর মানুষের উপর্যুপরি ধ্বংসাত্মক আঘাতেরই ফল হিসেবে এসেছে। ‘জলবায়ু পরিবর্তন, কোভিড-১৯ ও প্রকৃতির প্রতিশোধ’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি আরও লিখেছেন- ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের নির্লজ্জ আচরণ জলবায়ুকে পাল্টে দিয়েছে, বিশ্বটাকে উষ্ণতর করে তুলেছে, পৃথিবী নামক গ্রহটিকে ফেলেছে হুমকির মুখে। আর সে কারণেই প্রকৃতি (এই পৃথিবী) আজ পাল্টা জবাব দিচ্ছে।’ দ্ব্যর্থহীনভাবেই এই পরিবেশবিদ বলেছেন- ‘জলবায়ু পরিবর্তনই বুনছে এসব মহামারি রোগের বীজ।’

তাই আমাদের বড় প্রয়োজন প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যকে অক্ষুণ্ণ রাখা। আমরা যখন পরিবেশ ও প্রতিবেশকে বিপন্ন করি তখন মানবকুলে তার যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে বনের ও পানির প্রাণীকুলের ওপরও পড়ে তার সমান আঘাত। হয়তো একটু বেশিই পড়ে। ফলে প্রাণীকুল বেশি বিপন্ন হয়। একসময় উজাড় হয়ে যায়। তবে সবচেয় বেশি যা ঘটে তা হচ্ছে, প্রাণীকুলে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রোগ-বালাই। ঘটে জীবাণুর বিস্তার। অনেক ক্ষেত্রেই তা মানুষের চোখের আড়ালে থাকে। কিন্তু প্রকৃতি এক নির্দয় নিরপেক্ষ বিচারকর্তা। ফলে একসময় বন্য কিংবা গৃহপালিত প্রাণীকুলের শরীর থেকে সেই সব ভাইরাস মানবদেহেও ছড়িয়ে দেয়।  জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, সংক্রমনজনিত রোগগুলোর ৭৫ শতাংশই পশু-প্রাণীর শরীর থেকে মানব শরীরে বাসা বাঁধে ও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মানুষও হয়ে পড়ে বিপন্ন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মানুষ অনেক এগিয়েছে বটে। কিন্তু কখনো কখনো প্রকৃতি মানুষকে এমন কিছুর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় যে, তার কোনো প্রতিকারও মানুষের জানা থাকে না। তখন স্রেফ অসহায় হয়ে পড়ে মানুষ। ঠিক যেমনটা ঘটেছে এই কোভিড-১৯ ভাইরাসের ক্ষেত্রে।

করোনার এই আঘাত আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই পরিবেশ ও প্রাণীকুলকে সুরক্ষা দিতে হবে। তা না হলে- প্রকৃতি এমন সব ভয়াবহ শিক্ষা নিয়ে হাজির হবে যে, মানবতাই বিপন্ন হয়ে পড়বে। তখন আর শেষ রক্ষা হবে না। তাই আসুন আমরা সবাই ঘরে থাকি। এখনি ডলফিনের নাচ দেখতে বিচে ছুটবেন না। তবে জানালা দিয়ে একটু বাহিরে তাকিয়ে দেখবে আকাশটা একটু বেশিই নীল মনে হচ্ছে ।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ