মঙ্গলবার , ০৭ নভেম্বর ২০১৭

কোনো এক ভাষকের গল্প

  মঙ্গলবার , ০৭ নভেম্বর ২০১৭

‘২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস; বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে।

কেন যেন মনে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বিশ্ব ইতিহাসের খেরো খাতায় একদিন ঠাঁই করে নেবে। কেননা সেদিনের সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতিগত চেতনার মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন। তিনি সচেতনভাবে, সুকৌশলে পাকিস্তানিদের শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে এ দেশের জনগণকে মুক্ত করে-স্বাধীনতা অর্জনের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। কৌশলগত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছিল সেই ভাষণটি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও তিনি সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতার জন্য অকুণ্ঠ চিত্তে বলেছিলেন—‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব—এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ শেষে বললেন জয় বাংলা। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের সেই জয় বাংলা তখন মুক্তিকামী স্লোগান হয়ে গেল।

১৯৭১ সাল। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বিকেল ৩টা ২০ মিনিট। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য অসাধারণ স্মরণীয় দিন। পুরাতন সেই রেসকোর্স ময়দান। বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সমবেত জনসমুদ্রে প্রতিবাদী বাঙালির গর্জন।

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বহু শতাব্দীর পরাধীনতার গ্লানি মোচনে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। পুরো জাতি প্রতীক্ষায়। কখন আসবেন কবি। বজ্রকণ্ঠে কেঁপে উঠবে আকাশ-বাতাস। সমবেত গর্জনের হুঙ্কারে থমকে যাবে অত্যাচারীর স্পর্ধা। চারদিকে মুহুর্মুহু স্লোগান। অবশেষে এলেন কবি। সুধালেন অমর কবিতাখানি। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠলেন। তারপর ১৯ মিনিটের এক অলিখিত ভাষণ দিলেন। যেন বাংলার মানুষের বুকের ভেতরের কথাগুলোই বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে উচ্চারিত হলো। ‘...তোমাদের যা কিছু আছে... তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।... ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো...রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব... এই দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ...।’ এমন কাব্যিক, ঐতিহাসিক, শান্ত-তেজোদীপ্ত ভাষণ পৃথিবীতে বিরল। এ কারণেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেসকো। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) কর্মসূচির অধীনে আন্তর্জাতিক তালিকায় (ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার) মোট ৭৮টি দলিলকে মনোনয়ন দিয়েছে। এ তালিকায় ৪৮ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় ঠাঁই পেতে হলে পর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক প্রভাব থাকতে হয়। আর কেনইবা দেওয়া হবে না। ভারতের একজন বিচারপতি বঙ্গবন্ধুর ’৭০-এর নির্বাচনী ভাষণ ও ’৭১-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে বলেছিলেন—‘শেখ মুজিবুর রহমান আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন আর লেনিনের বিপ্লবী চেতনার মূর্তপ্রতীক।’ তাই বিশ্ব স্মরণীয় লেনিন, মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, চার্চিল, ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিঙ্কন এবং জন কেনেডির মতো নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু অন্যতম। কারণ, তিনি বিশ্বের বুকে বিরল ব্যতিক্রম ইতিহাসের জন্মদাতা। বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে চিনেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ হিসেবে। লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা বঙ্গবন্ধুকে মুকুটহীন সম্রাট বলে আখ্যা দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উজ্জীবিত হয়ে জয় বাংলা স্লোগানের চেতনায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতি যুদ্ধে নেমেছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে তারা। কত সরলভাবে, কত সহজ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সব-ই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’

‘২৩ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস; বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে ৭ জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পর যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম।’

তারপর, তখন বাঙালির ওপর যে অত্যাচার করা হচ্ছিল, তার কথাও বললেন—‘কী পেলাম আমরা? আমরা পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি। জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কীভাবে আমার গরিবের ’পরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলি করা হয়েছে, কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন।’

তিনি একটা দীর্ঘ প্রেক্ষাপটকে মাত্র কয়েকটি বাক্যে বর্ণনা করেছেন। কত কৌশলী ভূমিকা ছিল সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দে, বাক্যে। তিনি বলেছেন—‘আমি বলেছি, কিসের বৈঠকে বসব, কার সঙ্গে বসব? যারা মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসব? ২৫ তারিখে অ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই।’...‘ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না।’ ...‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। ৭ কোটি মানুষেরে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।’ ...‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

একজন মানুষ এত ক্ষমতাধর হয়েও এত সাধারণ হতে পারেন! অথবা এত সাধারণ হয়েও অসাধারণ ক্ষমতার উৎস হতে পারেন। বঙ্গবন্ধু তার অনন্য উদাহরণ। কেমন বড় মাপের নেতা হলে দেশ ও মানুষের ভালোবাসার মায়াজালের মোহে একটা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো জেলে আর রাজপথের মিছিলে মিটিংয়ে কাটাতে পারেন—এমন দৃষ্টান্ত শুধু তিনিই স্থাপন করতে পেরেছেন। কতটা নির্লোভ চিত্তের অধিকারী হলে শাসকের দিকে অঙুলি নির্দেশ করে বাঙালি জাতির জন্য মৃত্যুঝুঁকিকে সঙ্গে করে ঘুরতে পারেন। তিনি কি না করতে পারতেন! পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে হাত মিলালে কত বিলাসী জীবন তিনি উপভোগ করতে পারতেন! অথচ সব মোহ এড়িয়ে একটি বাংলাদেশের জন্য, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জন্য এমনকি আছে যা তিনি করেননি!

একজন মানুষ কতটা মহানুভব হলে তার বুকে মুখে লালন করেন পদ্মা-মেঘনা-যমুনার স্রোতধারা? তার সুরতে যেন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন মানচিত্র। এসবই শুধু যেন তার বেলায় সম্ভব। কারণ তিনি বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে বন্দি অবস্থায়ও যিনি নিশ্চিত মৃত্যু জেনে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন—‘আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না।...আমি বাঙালি, আমি মুজিবুর রহমান...একবার মরে দুইবার মরে না...।’ বঙ্গবন্ধু খুব সাদামাটাভাবেই বলেছিলেন—‘আমি প্রতিহিংসা-প্রতিশোধে বিশ্বাসী নই। আমি রবীন্দ্রনাথের মানসে গড়া এক কোমল হৃদয়ের বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখ। আমি সে বিশ্বাস ও ভালোবাসা দিয়ে সব হৃদয়কে জয় করতে শিখেছি। আমি আমার মানুষকে ভালোবাসি।’ বঙ্গবন্ধু এভাবেই অকপটে বলতেন দেশের মানুষের প্রতি তার অকৃৃত্রিম ভালোবাসা আর অগাধ বিশ্বাসের কথা। তিনিই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ, সোনার বাংলার রূপকার, এক মহাকাব্যিক রাজনীতির পথপ্রদর্শক। তিনি ছিলেন সিংহ হৃদয়ের অধিকারী অকুতোভয় মহান নেতা। তার ব্যক্তিত্ব, মানবীয় বোধ, অসীম সাহস, অশেষ ত্যাগ, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, মনুষ্যত্ব আর চিরচেনা বাঙালিয়ানা সত্তার কাছে সব যেন হার মানে। তার প্রতিটি ভাষণ ইতিহাসের অমর দলিল হয়ে থাকবে।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ