বুধবার , ১৩ মে ২০২০ |

- নুরুল আমিন 
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের স্থবিরতায় চরম সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে দেশের অন্যতম সেবা খাত ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং। ২০১৯ সনের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহর থেকেভাইরাসটির সংক্রমনের প্রভাবে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া এবং সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনীতির অন্যতম এই সেবা খাতটির আর্থিক সমস্যা শুরু হয়। পরবর্তীতে ভাইরাসটি বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেয়ার কারণে বিশ্ব-বাণিজ্যে যে ধ্বস নামে। তার প্রভাবে দেশের আমদানি-রফতানিকারকদের ক্ষয়ক্ষতির সাথে সাথে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানিগুলো একইভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে। দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের যে পরিমাণ ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে, সে কারণে যে পরিমান আমদানি কমেছে, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা ঠিক সে পরিমান পণ্য পরিবহণের আয় হারিয়েছেন। একইভাবে সবজি, মাছ, কাঁকড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্পসহ সকল রপ্তানিতে ভাটা জনিত কারণে ঐ সব পণ্যের হ্যান্ডলিং আয়ও হারিয়েছেন। ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত না হলে এসব পণ্যের প্রায় ৮৫ ভাগ পরিবহণ ও হ্যান্ডলিং ফরওয়ার্ডারদের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো । 

অন্যদিকে বিদেশি এজেন্টদের কাছ থেকে পরিবহণের টাকা এবং দেশের রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে প্রিপেইড শিপমেন্টের টাকা না পাওয়ার কারণে অনেক কোম্পানি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। যথাসময়ে এয়ারলাইন ও শিপিং লাইনের পাওনা পরিশোধ এবং কর্মচারীদের বেতনভাতা, ব্যাংক ঋণের সুদ, অফিস ভাড়া ও রক্ষণাবেক্ষন খরচ নির্বাহ করতেনা পেরে সংকটে পড়ে দেশের অর্থনীতির অন্যতম এই সেবা খাতটির সবাই, যারা এখন কমবেশি এই সংকটের সম্মুখীন। ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও চলতি মূলধনের অভাবে অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করার কথা ভাবছেন।
বিশ্বব্যাপী যাত্রীবাহী বিমান চলাচল সীমিত হওয়া, কার্গো বিমান স্বল্পতার বিপরীতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী পরিবহণের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্বের দীর্ঘায়িত লকডাউনের সুযোগে একচ্ছত্র উৎপাদন সামর্থ্য ও বিশ্ববাজার দখলের প্রতযেগিতায় চীন বেশীর ভাগ কার্গো বিমান অগ্রীম লিজ নিয়ে রাখে। ফলশ্র“তিতে পরিবহণ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণে  ফরওয়ার্ডারদের এখন অতিরিক্ত চলতি মূলধনের প্রয়োজন। করোনা পূর্ববর্তী সময়ে যেখানে ঢাকা থেকে ইঊরোপে প্রতি কিলোগ্রাম পণ্যের ভাড়া ছিল ১.৬৫ ডলার, তা এখন ৫.৫০ থেকে ৭.০০ ডলার। আর আমেরিকা ও কানাডায় আগের ১২.০০ স্থলে ১৫.০০ ডলার। এমতাবস্থায় কিছু কিছু এয়ারলাইন জিএসএ প্রচলিত পাক্ষিক বাকি প্রদানের নিয়ম লংঘন করে পরিবহণ ভাড়া অগ্রীম নগদ প্রদান ছাড়া অনেক ফরওয়ার্ডারের বুকিং নিচ্ছে না। এ কারণেও পর্যাপ্ত চলতি মূলধন না থাকায় অনেকে ব্যবসা করতে পারছেন না ।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় মোট ৭২ হাজার৭৫০ কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী । আশা করি এই প্রণোদনা প্যাকেজ সহ সরকারের নেয়া অন্যান্য পদক্ষেপের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যআবার স্বাভাবিক হবে, দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়াবে। দেশের রপ্তানি খাতের উন্নয়ন হলে তথা আমদানি-রপ্তানি খাত চাঙ্গা হলে তাদের সেবা প্রদানের জন্য সাপ্লাই চেইন পার্টনার হিসেবে ফরওয়ার্ডারের বিকল্প নেই। বৈদেশিক বাণিজ্য হ্যান্ডলিং করার যদি লজিস্টিকস সক্ষমতাই যদি না থাকে, তাহলে এসব প্রণোদনার কাঙ্খিত ফসল অর্জন সম্ভব হবে না।

তাই, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংখাতকে বর্তমান ক্ষতি থেকে উত্তরণের জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সেজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকারের কাছে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরছি। 

১। গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের বেতন-ভাতার জন্য সরকার ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জে যে প্রণোদনা দিয়েছে, একইভাবে ফরওয়ার্ডিং খাতের কর্মচারিদের বেতন-ভাতা ও ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের জন্য  বিনা শর্তে  ৬ মাসেরজন্যআর্থিক সহায়তা দেওয়া। 

২। চলতি মূলধন সহায়াতার জন্য সেবা খাতে সরকার ঘোষিত ৩০,০০০ কোটি টাকা থেকে ফরওয়ার্ডারদের জন্য একটি ফান্ড নির্দিষ্ট করে দেওয়া। বাংলাদেশফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তদারকিতে সেই ফান্ড থেকে ঋণের জন্য আবেদনকারী কোম্পানিকে ২০১৯ সালের মোট বার্ষিক ব্যাংক লেনদেনের ৩০শতাংশ পরিমাণ অথর্ ৪শতাংশ সুদে প্রদান করা।

৩। ঋণ প্রাপ্তির প্রতিটি ধাপ সহজ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া। জামানতের পরিবর্তে ব্যবসার বয়স, আকার, পরিচালনা খরচ, সদস্য সনদ ও লাইসেন্সের মূলকপি জামানত, ব্যক্তিগত গ্যারান্টি চেক ও  এয়ার লাইন্সে দেয়া গ্যারান্টি ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে ঋণ দেয়া। বিদেশী পার্টনারদের কাছে পাওনা টাকা ও স্থানীয় কাষ্টমার থেকে অনাদায়ী বকেয়াও একটি মাপকাঠি হতে পারে।

৪। যেহেতু কোম্পানিগুলোর লোকসান কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে, সেহেতু উপরোক্ত ঋণ সমুহের কিস্তি পরিশোধ প্রদান ৬ মাস পর থেকে শুরু করা। এই সময়ের মধ্যে ফরওয়ার্ডাররা ব্যবসা গুছিয়ে নিতে পারবে বলে বিশ্বাস করি। এই সময়ে ঋণ গ্রহনকারী কোম্পানি শুধু ঋণের সুদ প্রদান করবে, কিস্তি নয় । 

৪। চলমানঋণের সুদ মওকুপ করা।

৫। এআইটি নেয়া বন্ধ করা ও কর্পোরেটকরের হার কমানো 

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংখাতকে বর্তমান প্রতিকুল আবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এবং লজিস্টিকস খাতে সক্ষমতা রক্ষার জন্য উপরোক্ত সুপারিশ সমুহ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে গুরুত্ব বিবেচনা করে এব্যাপারে প্রয়োজনীয় জরুরি  নির্দেশনা প্রদানের প্রত্যাশা করছি। 

লেখকঃ ডাইরেক্টর মিডিয়াওপাবলিকেশন, বাংলাদেশফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স এসোসিয়েসন (বাফা) এবং ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, টাওয়ার ফ্রেইট লজিস্টিকস লিমিটেড।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ