শনিবার , ১১ নভেম্বর ২০১৭

সমকালের কড়চা

  শনিবার , ১১ নভেম্বর ২০১৭

স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই বাড়ছে বাজার : অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের ধরন। নিত্য ব্যবহারে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের পার্সোনাল ও হাউসহোল্ড পণ্যের চাহিদা। যদিও এ ধরনের অনেক পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি থাকছে আড়ালেই। উন্নত বিশ্বে পার্সোনাল ও হাউসহোল্ড কেয়ার পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এখনো তা ব্যবহার হচ্ছে। ত্বকের রং ফর্সা করতে বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে ফেয়ারনেস ক্রিম রয়েছে। ফেসওয়াশের পাশাপাশি সূর্যরশ্মি থেকে ত্বকের সুরক্ষায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে সানস্ক্রিন উৎপাদন ও বাজারজাত করছে বহুজাতিক ও স্থানীয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব পণ্যে ব্যবহার হচ্ছে পারদ, স্টেরয়েড, হাইড্রোকুইনাইনের মতো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান। এতে দেখা দিচ্ছে, নানা ধরনের চর্মরোগসহ দুরারোগ্য রোগের আশঙ্কা রয়েছে।

বহু ব্যবহৃত হাউসহোল্ড কেয়ার পণ্য ডিটারজেন্ট। ডিটারজেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত একটি কেমিক্যাল গ্রুপ হলো আলকাইলফেনল ইথকজিলেটস বা ‘এপিইও’। ব্যবহারের পর এ কেমিক্যাল পানির সঙ্গে মিশে যায়। জলজপ্রাণীর মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশে তৈরি হয় বিষক্রিয়া। বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া পার্সোনাল কেয়ার পণ্যেও মাইক্রোবিডসের উপস্থিতি পেয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। তারা এক গবেষণায় দেখিয়েছে, ফেসওয়াশ, টুথপেস্ট ও ডিটারজেন্ট থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে প্রতিমাসে নির্গত হয় ৭ হাজার ৯২৮ বিলিয়ন প্লাস্টিক কণা। এসব প্লাস্টিক কণা প্রত্যক্ষ ক্ষতির পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। খাদ্যের মাধ্যমে মাছের শরীরে জমা হয় এগুলো। এসব মাছ খাওয়ার মাধ্যমে তা মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে। এ ছাড়া তাপের সংস্পর্শে প্লাস্টিক থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক নিঃসরণ হয়; যার প্রভাবে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও মুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব ঝুঁকির কারণে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো পার্সোনাল ও হাউসহোল্ড কেয়ার পণ্যে মাইক্রোবিডস ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।

মন্তব্য : মাঝে মাঝে মনে হয় ভেজাল আর বিষের প্রভাবে আমরা যে বেঁচে আছি-এটাইবা কম কী! অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের লোভ সর্ব নিম্নস্তরে নেমে গেছে। সামান্য লাভের লোভে মানুষ মানুষের জীবন নেওয়ার ফাঁদ পাততেও দ্বিধাবোধ কওে না। এই সামাজিক অস্থিরতার অবসান সহসা সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রসাধন পণ্য ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মহামারীর আকার ধারণ করছে। এসব পণ্যের মোড়কে বেশির ভাগ সময়ই উপকরণের নাম উল্লেখ থাকে না। তবে সব পার্সোনাল ও হাউসহোল্ড পণ্যেই যে ক্ষতিকর উপাদান আছে, এমনটিও সত্য নাও হতে পারে। বাংলাদেশে বিভিন্ন উপকরণের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে সেফটি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যাসিউরেন্স সেন্টার (এসইএসি)। মানুষ ও পরিবেশ উভয় ক্ষেত্রে পণ্য নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু তারা কি করছে তাহলে? দেশে বাজারজাত হওয়া পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। তাদেরইবা কাজ কী? সব সময়ই শোনা যায়, তাদের লোকবলের সংকট; তবে কেন লোকবল বাড়ানো হয় না-সেটাই রহস্যজনক। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের ভূমিকা কী? সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থাগুলো নীরব কেন? তারা কি মহামারী ঘটার পর মাঠে নামবেন!

সরকারি প্রতিষ্ঠানে লোকসান : সরকারি মালিকানার ৩১টি প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে দুই হাজার ৪১৫ কোটি টাকা লোকসান। এর মধ্যে টেলিটকের লোকসান ২৪৬ কোটি টাকা। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গত কয়েক বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত মিল-কারখানা লোকসান দিয়ে আসছে। এসব অনিয়ম থেকে বের হয়ে আসার জন্য বিভিন্ন সময় সরকার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত মিল-কারখানাগুলো বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে রয়েছে কৃষি ব্যাংক। এ ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৫১১ কোটি টাকা। ৪৩৩ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ২৪৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে টেলিটক লোকসানি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে।

মন্তব্য : নতুন কিছু নয়। চিরাচরিত চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করাও মুশকিল। বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান মুনাফা করতে পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠান কী কারণে মুনাফা করতে পারে না-সেটাই বোধগম্য নয়। তবে নিশ্চিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দায়িত্বে অবহেলা, জবাবদিহিতার অভাব, মনিটরিং না করা প্রভৃতি। সরকারের প্রতিষ্ঠানকে লোকসানি রেখে কীভাবে সরকারের কাছ থেকে বেতন পায়-সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়। বুঝতে কষ্ট হয়, বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করলেও সরকারি ফোন টেলিটক কীভাবে লোকসান দেয়। নিশ্চয়ই এখানে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষতার ব্যাপার রয়ে গেছে। তদ্রুপ অন্যান্য লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বেলাতেও ঘটছে। বছরের পর বছর সরকার কেন লোকসান দেবে। এ অবস্থা থেকে সরকারকে বের হয়ে আসতে হবে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার ধীরগতি হলে কর্তাব্যক্তিদেরও দায়দায়িত্ব বাড়বে। তাছাড়া লোকসানি প্রতিষ্ঠান ধরে না রেখে পাবলিক মার্কেটে এসব সংস্থার শেয়ার ছাড়া যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানায় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি পর্যায়েও ছেড়ে দেওয়া যায়।

নতুন উদ্যোগ সফল হোক : প্রথমবারের মতো রেলের বগি বা কোচ তৈরি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নীলফামারীর সৈয়দপুরে স্থাপন করা হচ্ছে একটি নতুন বগি (ক্যারেজ) তৈরির কারখানা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রীবাহী ক্যারেজ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করবে। ফলে বৈদেশিক অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রেলওয়ের রাজস্ব আয় বাড়বে। এজন্য ‘রেলওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ সৈয়দপুরে ক্যারেজ তৈরির কারখানা নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫৩ কোটি ৭৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৩০ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ভারত সরকারের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) থেকে ৬২৩ কোটি ৫৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হবে।

মন্তব্য : এই নতুন উদ্যোগের ফলে অনেকদূর এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বাড়বে রেলের সক্ষমতা, সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশ রেলওয়ের বগি ক্রয় বিদেশনির্ভর থাকায় কাক্সিক্ষত সাফল্য আসছিল না। রেল ব্যবস্থার সম্প্রসারণে প্রচুর কোচ প্রয়োজন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে নিজেই বগি তৈরির উদ্যোগটি নতুন আশাবাদ জাগিয়েছে। নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।

ট্যানারির বর্জ্যে মুরগি ও মাছের খাবার : ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার করে মুরগি ও মাছের খাবার তৈরির কারখানাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করতে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। ২০১১ সালের ২১ জুলাই এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন। পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে করা এক রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া ওই রায়ে ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে মুরগি ও মাছের খাবার প্রস্তুত কার্যক্রম বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এ কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মৎস্য ও পশুখাদ্য আইনে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ট্যানারির বর্জ্য ও শুঁটকি থেকে মুরগি ও মাছের খাবার তৈরি করা হয়। তাদের কাছ থেকে এসব খাবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। মুরগি বা মাছের খাবারে ৩০ পিপিএম মাত্রার বেশি ক্রোমিয়াম থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ কারখানায় উৎপাদিত খাবারে প্রায় পাঁচ হাজার পিপিএম মাত্রায় ক্রোমিয়াম রয়েছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

মন্তব্য : ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের দেশে প্রাণী খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটরের (অএচ) ব্যবহার একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখার কেউ নেই, নিয়ন্ত্রণ করারও কেউ নেই। উন্নত বিশ্বে প্রাণী খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটরের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, এমনকি কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর মূলে রয়েছে সরকারও সংশ্লিষ্টদের নজরদারির অভাব, ব্যবসায়ীদের জ্ঞানের অভাব ও অতি লাভের লোভ। পশু চামড়ায় প্রচুর প্রোটিন বা আমিষ থাকে। ফলে চামড়ার বর্জ্য থেকে তৈরি মুরগি বা মাছের খাবার খাওয়ালে মাছ বা মুরগি ও মুরগির ডিম দ্রুত এবং বেশি বড় হয়। কিন্তু এসব খাবার খুবই বিষাক্ত। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। দীর্ঘ সময় এসব খাবার খেলে শরীরে নানা রোগবালাই বাসা বাঁধতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে-এমনটাই প্রত্যাশা।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ