শনিবার , ১১ নভেম্বর ২০১৭

ট্রেনে কাটা জীবন

  শনিবার , ১১ নভেম্বর ২০১৭

শিশুটির বয়স তখন ২। হঠাৎ ট্রেনে কাটা পড়ে হারায় দুই পা -ছবি: শাহীন কাওসার রেললাইনকে ঘিরেই ওদের বসবাস। শিশুদের খেলাধুলা রেললাইনের উপরেই। জটলা বেঁধে গল্প করা? তাও রেললাইনের উপরেই। কোনো ভয় নেই, ডর নেই। ট্রেন আসার শব্দ পেলে সরে দাঁড়ায়। ফের আবার গল্পে মেতে ওঠে।  বউ-ঝিরাও মাথার উকুন বাছাই থেকে ঝগড়া-বিবাদ সবই করে রেললাইনে দাঁড়িয়েই। এ দৃশ্য প্রতিদিনের। তেজগাঁও রেললাইন বস্তির দুই পাশে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর বেঁধে ওদের বসবাস। আর তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে এখানে বসবাস করছে মানুষ। অনেকেই এর মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। আবার অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। ৫ বছরের শিশু মিরাজ। দুই বছার বয়সে ট্রেন দুর্ঘটনায় তার দু’পা হারায়। তারপর থেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে সে।

 

এখন আর সে খেলতে পারে না। বাবার কোলে চড়ে স্কুলে যাওয়া আসা করে। তার নানী বেলী বেগম জানান, মিরাজ দুই বছর বয়সে রেললাইনের পাশে একটা টুকরি নিয়ে খেলছিল। হঠাৎ ট্রেন এসে পড়ায় টুকরিটা আটকে যায় ট্রেনে সঙ্গে। টুকরি থেকে ছিটকে মিরাজের পা দুটি চলে যায় ট্রেনের নিচে। পা দুটো কাটা পড়ে তার। একই বস্তিতে থাকতো বিল্লাল। দেড় বছর বয়সে রেললাইনের উপরে খেলার সময় ট্রেন এসে পড়ায় এক পা কাটা পড়ে তার। এরপর এক পায়ে লাঠিতে ভর দিয়ে চলাচল করতো সে। এক পা হারানোর পরও বিল্লাল বড় হতে থাকে আর নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। বাবার সঙ্গে কাঁচামাল বিক্রিতে সহযোগিতা করতো সে। প্রতিদিনের মতো ৯ মাস আগে বাবাকে সাহায্য করতে কাঁচামালের আড়তে যাচ্ছিল বিল্লাল। রেললাইনে তার লাঠি আটকে গেলে পড়ে যায় বিল্লাল। এ সময় ট্রেন এসে পড়ায় আর উঠতে পারেনি। ১৪ বছরের বিল্লাল ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। বিল্লালের মা খোদেজা বেগম বলেন, দেড় বছর বয়সে পোলাটা আমার এই ট্রেনের তলায় পইড়া পা হারাইছে। সেই পোলারে কত কষ্ট কইরা বড় করছি। আবার ওই ট্রেনেই আমার পোলাটারে খাইলো। আমরা গরিব মানুষ কাওরান বাজারেই কাজ করি আর রেললাইন বস্তিতে থাকি। এই বস্তিতে না থাকলে পোলাটা আমার মরতো না। এই বস্তি ছাইড়াই বা কই যামু। তিন বছর বয়সে ট্রেনের নিচে এক পা কাটা পড়ে জেহাদের। তখন থেকে এক পায়ে লাফিয়ে চলে সে। জেহাদ এখন ইসলামিয়া প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। কোনোরকম সাহায্য ছাড়াই এক পায়ে চলা রপ্ত করেছে জেহাদ।

 

জেহাদের মা পেয়ারা বেগম বলেন, আমার ছেলের এক পা গেছে। তার পরও বাধ্য হয়ে আমরা এই বস্তিতে থাকি। আমাদের তো কোনো বাসাবাড়ি নেই। সরকারও তো আমাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা করে না। এই বস্তিতে হাজার মানুষ থাকে। সবাই বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ভয়ে থাকে- কখন কার কি বিপদ হয়। এদিকে ১৫ বছর আগে এক পুলিশ সদস্যকে বাঁচাতে গিয়ে ট্রেনের নিচে পারভীনের ডান পায়ের চার আঙ্গুল কাটা পড়ে। পারভীনের নাতনি দুলালী বলেন, আমার নানী আগে এই বস্তিতে থাকতো। এখন গাজীপুরে থাকে। ১৫ বছর আগে এক পুলিশ রেললাইন দিয়া হাঁটছিল তখন ট্রেন আইসা পড়ে। নানী ওই পুলিশের জামা ধইরা টান দেয়। কিন্তু নানী পুলিশরে বাঁচাইতে পারেনি। বরং নিজের পায়ের আঙ্গল ট্রেনের নিচে কাটা পইড়া যায়। তেজগাঁও রেলওয়ে বস্তিতে থাকেন লাভলী। লাভলী বলেন, ‘প্রতি মুহূর্তে আমার এক বছরের সন্তানকে নিয়ে চিন্তায় থাকি। কতক্ষণ আর তাকে ঘরে আটকে রাখা যায়। আর ঘরের দরজা থেকে বের হইলেই তো রেললাইন। আমরা গরিব মানুষ। এইভাবেই আমাদের জীবন চলে। রাতে অনেক সময় ঘুমাতে পারি না। মনে হয় ট্রেন ঘরের ভিতর তুইলা দিব। এইখানে আমার শ্বশুর প্রথম আইসা ঘর তোলে। এরপর থেইক্যা এইখানে সব।’ তিন বাচ্চার জননী রত্না বলেন, এই বস্তিতে থাকি ১৮ বছর। প্রতি ২০ মিনিটে এইখানে তিনটা ট্রেন যায়। আল্লাহর ভরসায় এইখানে আমরা থাকি। বাচ্চাদের তো আর সারাক্ষণ দেইখ্যা রাখতে পারি না। আমি বাসা বাড়িতে কাম করি আর সারাক্ষণ ভয়ে থাকি।

 বিশেষ খবর থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ