রবিবার , ০৫ July ২০২০ |

করোনা ভাইরাস ও আমাদের অর্থনীতি

  শনিবার , ০৬ জুন e ২০২০

ফজলুল হক মাস্টার:
অদৃশ্য ঘাতক করোনাভাইরাসের ভয়াবহ মহামারির তার বিশ্বব্যাপী সহস্র বছরের সভ্যতার জয়যাত্রাকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। শুধু অবরুদ্ধ নয় একেবারে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে চলমান সভ্যতাকে। সভ্যতার ভিত্তি হচ্ছে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধি। এই সবকিছু মিলিয়ে গোটা বিশ্ব শৃঙ্খলাকে তছনছ করে বিশৃঙ্খল বীভৎস মৃত্যুপুরীতে দাঁড় করিয়েছে।
আজকের যে বিশ্ব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে করোনার কবলে পড়ে তা কিন্তু প্রকৃতির  এক ধরনের প্রতিশোধ। জাপানের এক প্রকৃতিবিজ্ঞানী ‘মাসানো বু ফুকো ওয়াকা’ তার ‘খড় বিপ্লব’ প্রবন্ধে বলেছিলেন- এই সভ্য মানুষ তৈরি করতে প্রকৃতির সময় লেগেছিল ৪০ লক্ষ বছর আর সেই মানুষ বিগত একশ বছরে গোটা প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সেই দিক বিবেচনায় অদৃশ্য ঘাতক করোনাভাইরাসও হতে পারে প্রকৃতির প্রতিশোধ। সর্বগ্রাসী নিষ্ঠুর বাণিজ্যিক অর্থনীতি ও অমানবিকভাবে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে যে হারে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে এবং যুদ্ধবাজি করতে দেশে দেশে মারণাস্ত্র তথা পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ করে রেখেছে, তার ব্যয় বিশ্বের সাতশ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও  মানবিক উন্নয়নের চেয়েও সহস্র গুণ বেশি। শুধু ব্যয়ই নয়- এতে অপচয় হয়েছে কোটি কোটি মানুষের মেধা, মনন, শ্রম ও সময়। সে তুলনায় মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে সামান্য মনোযোগও দেওয়া হয়নি। যদি দেওয়া হতো তা হলে ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের বিপর্যয় প্রতিরোধ করা সহজেই সম্ভব হতো। এবং মানব জাতিকে এই ক্রান্তিকালের মুখোমুখি হতে হতো না। আবার অনেকের মতে, করোনার মহামারির বৈশ্বিক সংকটেও উন্নত দেশসমূহের মধ্যে এক অপরকে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতার ফলেই যে এই করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মতে, পুঁজির অনৈতিক কারণে জন্ম নিয়েছে এই করোনাভাইরাস। লাগামহীন মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ধ্বংস করেছি আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ। প্রকৃতিই যে আমাদের প্রথম প্রতিবেশী, সে কথা মনে রাখার কোনো প্রয়োজন অনুভব করিনি। দাম্ভিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে মানুষ হাতের মুঠোয় ধরতে চেয়েছে গোটা বিশ্বকে। শাসন করতে চেয়েছে পৃথিবী ও তার পরিবেশকে। তা যে মানুষের পক্ষে কখনও সম্ভব নয়, করোনা ভাইরাস তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রমাণ করেছে।
এই করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্বের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি যেভাবে ভেঙে পড়লো এবং  পিছিয়ে যাচ্ছে এর শেষ কোথায় তা কারো জানা নেই। এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বেই উপযুক্ত কোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক কিংবা নিরাময়যোগ্য কোনো কিছুই উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়নি। দেশে দেশে দুর্বল ব্যবস্থাপনায় করোনা ভাইরাসের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়াস চলছে তা অনেকটাই অন্ধের হাতি দর্শন অথবা হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রীদের জুতা আবিষ্কারের কর্মকাণ্ডের মতোই। সেই উপযুক্ত মুচির সন্ধান মিলছে না।
করোনাকালে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যেমন বিপর্যস্ত হচ্ছে তেমনই এই ষোল/সতের কোটি মনুষের দেশ বাংলাদেশও নানামুখী বিরূপ প্রভাবের কর”ণ শিকারে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও বালাদেশের অর্থনীতিতে পড়বে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব। চলতি অর্থবছর দেশের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লক্ষ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, পরে অবশ্য তা কমিয়ে করা হয় ৩ লক্ষ ৬০০ কোটি টাকা। তন্মধ্যে ৬ মাসে আদায় হয়েছে মাত্র এক লক্ষ কোটি টাকা। বাকি সময়টুকুতে এই বিপর্যয় পরিস্থিতিতে আদৌ আরও কিছু আদায় হবে কিনা নিশ্চিত বলা যায় না। হলেও ৫০ হাজার কোটি টাকার উপরে তো নয়ই। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের শেষে ৫০% রাজন্ব আদায় হলেও হতে পারে। কারণ লকডাউন, সরকারি ছুটি ও করোনা বিষয়ক নানা কর্মসূচির কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রেই উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, সার্বিক বাজার ব্যবস্থাসহ গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন ১০% লক্ষ্যমাত্রার স্থলে জিডিপি এসে দাঁড়াবে ২% এ। ফলে যে অর্থনৈতিক অচল অবস্থার সৃষ্টি হবে তাতে আসন্ন বাজেটের কি দশা হবে তা এক মাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ বলতে  পারবে না। অর্থনৈতিক  বিপর্যয়ের কারণে দেশে যে নেতিবাচক প্রভাবগুলো পড়বে তার মধ্যে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। ভেঙে পড়বে সরকারের উন্নয়নের অভিযাত্রা, ব্যর্থ হবে এসডিজি অর্জনের পরিকল্পনাসমূহ। দারিদ্র নিরসনের যে কর্মসূচি বহুদূর এগিয়ে ছিল তা পিছিয়ে যাবে অনেকটাই। দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ, নানা মাত্রিক বিক্ষোভ, বিশৃংখলা এবং অপরাধ প্রবণতা।
এ সব সংকট মাথায় রেখে সরকারকে সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সুদূরপ্রসারী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সম্মিলিত বৈশ্বিক সহযোগিতার শক্তিশালী ফোরাম।

লেখক : মো. ফজলুল হক মাস্টার
জামালপুর। মোবাইল: ০১৭২১৫৭৫৪৯৩

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ