সোমবার , ১৩ নভেম্বর ২০১৭

জনমনে নানা প্রশ্ন

  সোমবার , ১৩ নভেম্বর ২০১৭

নানা টানাপড়েনের পর অবশেষে পদত্যাগ করলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা। যদিও ছুটিতে যাওয়ার পরপরই তার পুনরায় কাজে যোগদান ‘সুদূরপরাহত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল। তার যুক্তি ছিল, ‘অন্য বিচারপতিরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একই বেঞ্চে বসতে না চাইলে বিচার বিভাগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। বাস্তব অবস্থা বিচার করলে প্রধান বিচারপতির দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ সুদূরপরাহত।’ এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই মন্তব্যই সত্যে রূপ নিল।

মূলত ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও সে রায়ে ব্যক্তি পর্যবেক্ষণ নিয়েই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরকারের নির্বাহী বিভাগের টানাপড়েন দৃশ্যমান হয়। এর আগে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপড়েন চলছিল। শুরুটা হয়েছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে। গত আগস্টে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সে টানাপড়েন প্রকাশ্য রূপ নেয়। বিশেষ করে সে রায়ে দেওয়া পর্যবেক্ষণের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা। রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম হয়ে পড়ে রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গন। পরে গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রায় বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব পাস করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়।

এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনা-সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিন্হা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। তিনি বলেন, পদত্যাগের বিষয়টি প্রধান বিচারপতির একান্ত নিজস্ব বিষয়। প্রধান বিচারপতি দেশের প্রধান বিচারপতি, একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে থাকতে পারেন। যেকোনো ব্যক্তির পদত্যাগ করার অধিকার আছে। বিচার বিভাগ স্বাধীন, তাই এ নিয়ে কিছু বলাই নেই। এমনকি ‘সরকারপ্রধান বিচারপতিকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে’-এমন অভিযোগের উত্তরে এই নেতা বলেন, আমরা কেন তাকে পদত্যাগ করতে চাপ দেব? আমরা ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে কিছু আপত্তি তুলে ধরেছি মাত্র, তার পদত্যাগ চাইনি। আসলে বিএনপির হাতে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই, তাই অযথাই বিচার বিভাগ নিয়ে ছুতো বের করে কথা বলছে। এর আগে প্রধান বিচারপতিকে সরকার জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে বলে বিএনপি অভিযোগ করে।

অবশ্য প্রধান বিচারপতির দেশের বাইরে থেকে পদত্যাগ করাকে ভালো চোখে দেখছেন না আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রধান বিচারপতির উচিত ছিল দেশে ফিরে পদত্যাগ করা। এমনকি তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা পড়েছে, সে বিষয়ে আইনি পথে যাওয়া। তা হলেই তার কর্মকান্ডের স্বচ্ছতা প্রমাণিত হতো। সেটি না করে বিদেশ থেকে পদত্যাগ করায় এসব অভিযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে একটি ধারণা তৈরি হলো। এর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগকে তিনি নতুন প্রশ্নের মুখে ফেললেন।

এর আগে ছুটিতে যাওয়ার সময়ও প্রধান বিচারপতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। একদিকে আবেদনপত্রে অসুস্থতার কথা উল্লেখ করলেও বিদেশে যাওয়ার সময় তা নাকচ করে তিনি বলেন, অসুস্থ নন, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় তিনি ‘বিব্রত’। এমনকি নিজের ওপর চাপের বিষয়টি নাকচ করে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা বলেন, বিচার বিভাগ যাতে ‘কলুষিত না হয়’, এ জন্য তিনি নিজেই ‘সাময়িকভাবে’ বিদেশ যাচ্ছেন। এ ছাড়া বিদেশ যাওয়ার সময় প্রধান বিচারপতি সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগও করে যান। গত শনিবার সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ছুটি নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্হা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২১ জন বিচারক প্রধান বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হাই প্রথম, যিনি এভাবে পদত্যাগ করলেন। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এস কে সিন্হার ৩১ জানুয়ারি অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবসরে যাওয়ার ৮১ দিন আগেই পদত্যাগ করলেন তিনি।

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু বিষয় সামনে চলে এসেছে। আলোচিত হচ্ছে নানা প্রশ্ন। এতে বিচার বিভাগে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হলো কি না-এখন কে হবেন পরবর্তী প্রধান বিচারপতি-এ প্রশ্ন যেমন উঠছে; তেমনি উ™ভূত পরিস্থিতিতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায় ও রায়ে দেওয়া প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের কী হবে, কোন পথে এগোবে রায়ের রিভিউ-সে নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এমনকি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির যে ১১টি অভিযোগের কথা রাষ্ট্রপতি বলেছেন, সেগুলোর কী হবে-ঘুরেফিরে আসছে সে আলোচনাও।

আইনজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, কে ও কীভাবে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি হবেন এবং তার আগে কে কীভাবে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন, তা সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কোন সাংবিধানিক জটিলতা বা শূন্যতা সৃষ্টির সুযোগ নেই।

এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, প্রধান বিচারপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পরও যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নতুন একজনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দিচ্ছেন, সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে ততক্ষণ পর্যন্ত অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি থাকবেন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা। প্রধান বিচারপতির পদ যদি শূন্যও হয়ে থাকে, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রয়োগ করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাজ হবে, কোনো শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি।

পরবর্তী প্রধান বিচারপতির কে ও কীভাবে নিয়োগ হবে-প্রসঙ্গে আইনজ্ঞরা জানান, প্রধান বিচারপতি কে হবেন তা নির্ভর করছে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের ওপর। রাষ্ট্রপতি কাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন তা তিনিই জানেন। কারণ সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রপতির। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা দেওয়া আছে। তবে সংবিধানে যাই থাকুক না কেন, দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সরকারের ভূমিকাই মুখ্য। সরকার যাকে চায়, তাকেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে।

তবে বিদেশ থেকে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগকে ভালো চোখে দেখছেন না সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। তিনি বলেন, উনি (প্রধান বিচারপতি) নিলেন। ছুটি বর্ধিত করলেন। কিন্তু বিদেশ থেকে কেন পদত্যাগ করলেন? যেহেতু তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্র্নীতির ১১টি অভিযোগ রয়েছে, তার উচিত ছিল দেশে এসে পদত্যাগ করা এবং এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি পথে লড়া। বিদেশ থেকে পদত্যাগ করায় এখন ধারণা তৈরি হলো যে, উনি এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। উনি যদি এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত না থাকতেন, তা হলে উনি দেশে ফিরতেন। আমরাও চেয়েছিলাম উনি ফিরে আসুক। তাকে আইনি সহায়তা দেব। কিন্তু তিনি সে পথ খোলা রাখলেন না। উল্টো বিদেশ থেকে পদত্যাগ করায় অভিযোগের ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে এক ধরনের ধারণা তৈরি হলো।

সার্বিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে এই আইনজ্ঞ বলেন, প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে কোনো ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির সুযোগ নেই। সংবিধানের ৯৫ ও ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কে দায়িত্ব পালন করবেন এবং কীভাবে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পাবেন, তা স্পষ্ট করা আছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন এবং প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। কিন্তু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এবারও তাই হবে।

পদত্যাগের ফলে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের কী হবে-জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আইন তার নিজের গতিতে চলবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। এ ব্যাপারে সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতি ছাড়া রাষ্ট্রের যে কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা যাবে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, সে অভিযোগ তদন্ত করে মামলা চলবে। এতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এটি ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে তদন্ত হবে।

এ ক্ষেত্রে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ কোন পথে এগোবে-জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির অধীনে গঠিত আপিল বিভাগ বেঞ্চে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের বিরুদ্ধে সরকার রিভিউ করতে পারবে এবং বিচারকাজ চলবে। সে ক্ষেত্রে রায় যদি পুরো পাল্টে যায়, তা হলে প্রধান বিচারপতির দেওয়া ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণও আপনা-আপনিই বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি রায় না পাল্টায়, তা হলে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বাতিলের এখতিয়ার প্রধান বিচারপতির হাতে। কেবল তিনিই পারবেন পর্যবেক্ষণ বাতিল করতে।

 আইন-শৃংখলা থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ