মঙ্গলবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৭

প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের পান্ডুলিপি প্রণয়ন ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনা ও সরবরাহের ২০টি ধাপের মধ্যে ১৬টি ধাপেই অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি): পান্ডুলিপি প্রণয়ন ও প্রকাশনা ব্যবস্থায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল টিআইবি’র ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
 
গবেষণায় বলা হয়, আইনগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত হলেও এনসিটিবি’র কার্যক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। লেখক কমিটি, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কমিটি ও টেকনিক্যাল কমিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। এনসিটিবি’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারায় তারা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে।
 
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান ও সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোরশেদা আক্তার।
 
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিদর্শন ও তদারকিতে ঘাটতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানসম্মত পাঠ্যবই সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। পাঠ্যবই লেখার মতো বিশেষায়িত বিষয় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। পাঠ্যবইয়ে ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শী ধারার ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে বিশেষজ্ঞ, জনবল ও কারিগরি দক্ষতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, এনসিটিবি’র দরপত্র কমিটির একাংশের বিরুদ্ধে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে আগেই দর জানিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। এছাড়া দরপত্র আহ্বানের পর এনসিটিবি’র কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বেনামে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে দরপত্রে অংশগ্রহণ ও কার্যাদেশ প্রাপ্তির অভিযোগ রয়েছে।
 
গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মুদ্রণ, বাঁধাই ও লেমিনেশনের কার্যাদেশ প্রাপ্তির পর কাজের বেশিরভাগই অবৈধভাবে সাব-কন্ট্রাক্টে দেওয়া হয়। এছাড়া অবৈধ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বিএসটিআই সনদবিহীন কাগজের কারখানাকে এনসিটিবি কর্তৃক কাগজ সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
 
এছাড়া মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারকি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সার্বক্ষণিক উপস্থিত না থেকেও উপস্থিতির প্রতিবেদন দেওয়া, মুদ্রণ কাজে নিম্নমানের কাগজ ও কালির ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মুদ্রণ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সন্তোষজনক প্রতিবেদন প্রদানের তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে।
 
প্রতিবেদনে বলা হয়, লেখক দল বই রচনা, পরিমার্জন বা পরিবর্ধন করার পর এনসিটিবির সম্পাদনা বিভাগে জমা দিয়ে থাকেন। একাধিক তথ্যদাতার তথ্য দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্পাদক নিজের মতো করে সম্পাদনা করেন। সম্পাদনার সময় লেখক-সম্পাদক একসাথে বসে লেখার উদ্দেশ্য ও বিষয় সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদনা করার নিয়ম থাকলেও এই কাজটি না করার অভিযোগ রয়েছে। এনসিটিবি এ কাজটি সময় স্বল্পতার অজুহাতে করে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এনসিটিবির অন্যতম কাজ হচ্ছে কারিকুলাম তৈরি হওয়ার পর একবছর পর রচিত পাঠ্যবইয়ের ওপর মাঠ পর্যায় থেকে মতামত নেওয়া। অভিযোগ রয়েছে পাঠ্যক্রম বিভাগ এই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত মতামত যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে না। মাঠ পর্যায়ের তথ্য ব্যবহার করে পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয় না।
 
্এছাড়া কারিকুলাম অনুসরণ না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লেখা পরিবর্তন করা হয়। লেখকদের অজ্ঞাতে পাঠ্যবইয়ে লেখা সংযোজন-বিয়োজন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখা পরিবর্তনে সম্পাদকদের বাধ্য করা হয়। এছাড়াও ২০১৩ শিক্ষাবর্ষে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে শিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার কবিতা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
 
সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সম্প্রতি একটি বিশেষ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চাহিদার প্রেক্ষিতে এনসিটিবি কর্তৃক পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন ও সংশোধন আনা হয়েছে, যার অনেক কিছুই মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিনেও এনসিটিবি’র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধি জারি না হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের দ্বারা আদিষ্ট হয়ে এনসিটিবি’কে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
 
মোরশেদা আক্তার বলেন, দরপত্র নির্দেশিকা তৈরি, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সিএস তৈরি, কার্যাদেশ প্রদান, প্রতি লটের কাগজের হিসাব, কাগজের বরাদ্দপত্র জারি, কার্যাদেশ অনুযায়ী উপজেলায় বই সরবরাহ বাবদ গত ৩ বছরে ৫১ লাখ টাকা বিধি বহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান থেকে এমএলএস পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
 
পাণ্ডুুলিপি প্রণয়ন ও প্রকাশনা প্রক্রিয়ায় সুশাসন ও কার্যকর জবাবদিহিতার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এনসিটিবি’র কার্যক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব হ্রাস করার কথা বলা হয়েছে টিআইবির সুপারিশে। এছাড়া অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের এনসিটিবি’র বোর্ডে সদস্য হিসেবে নিয়োগ, এনসিটিবি’র কর্মীদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন এবং সকল তদন্ত প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে।

 শিক্ষা থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ