মঙ্গলবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৭

পাথর কোয়ারিতে এক বছরে ৩৫ জন নিহত

  মঙ্গলবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৭

সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে শ্রমিকের প্রাণহানি থামছে না। এখানকার বালি ও পাথরের এলাকা সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জাফলং ও কানাইঘাট। একসময় এসব এলাকায় গরিবরা হাতে-কোদালে পাথর উত্তোলন ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু পর্যটনসমৃদ্ধ এ এলাকায় এখন পরিবেশ বিধ্বংসী বোমা মেশিন বসিয়ে পাথর তুলতে গিয়ে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। এর অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন। সিলেটের পাথর কোয়ারি এখন শ্রমিকদের জন্য মৃত্যুপুরী। এ বছর বিভিন্ন কোয়ারি ও টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের সময় মাটিচাপায় মারা গেছেন অন্তত ৩৫ জন।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সকালে কানাইঘাটের মোলাগুল বাংলাটিলা এলাকায় লোভাছড়া নদীর তীর কেটে পাথর উত্তোলনের সময় মাটি ধসে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এই পাথর উত্তোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় প্রশাসনও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলে অভিযোগ করছেন পরিবেশবাদীরা। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় জনসাধারণকে সচেতন করা না গেলে শুধু অভিযান চালিয়ে প্রকৃতি ধ্বংসের এই সর্বনাশা কাজ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরফিন টিলা, বিছনাকান্দি, লোভাছড়াসহ জেলার বিভিন্ন কোয়ারি থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছে প্রভাবশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, ওই চক্রটিকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের নেতারা। ফলে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা

ঘটলেও তা সহজেই ধামাচাপা দিয়ে দেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে মাঝেমধ্যে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন লোক দেখানো অভিযান চালালে দুয়েক দিন বন্ধ থাকে পাথর উত্তোলন। এরপর আবারো শুরু হয় যথারীতি পাথর উত্তোলনের মহোৎসব। বেপরোয়াভাবে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে শ্রমিকদের।

চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরফিন টিলা কেটে পাথর উত্তোলনের সময় ভূমিধসে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই টিলা থেকে পাথর তুলতে গিয়ে চলতি বছরে প্রাণহানি ঘটে আরো ছয়জনের। এ ছাড়া গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি, জাফলং, কানাইঘাটের লোভাছড়া কোয়ারিতে চলতি বছর আরো ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে সিলেটের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র জাফলং এখন বিরানভূমি। জাফলংকে ইতোমধ্যে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু থেমে নেই পাথর উত্তোলনের নামে পরিবেশ ধ্বংসের কুকর্ম। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদীরা আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু কোনোভাবেই রক্ষা করা যাচ্ছে না জাফলংকে।

এদিকে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য পরিবেশবাদীরা দায়ী করছেন এর নেপথ্যে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কীম বলেন, পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। ফলে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায় না। মাঝে-মধ্যে দুয়েকটি অভিযান চালানো হলেও তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে অল্পদিনে কোটিপতি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় রাজনৈতিক নেতারাও কোয়ারিগুলোতে প্রভাব খাটাচ্ছেন। কোয়ারিগুলোতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ার কথা স্বীকার করে সিলেটের পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জেলা ও পুলিশ প্রশাসন মিলে কোয়ারিগুলোতে অভিযান চালায়। কিন্তু অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ সম্ভব হচ্ছে না। জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া পরিবেশ বিধ্বংসী এই কর্মকান্ড বন্ধ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রশাসনের উদ্যোগে নানা কর্মকান্ড হাতে নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে পাথর কোয়ারিগুলোর পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

 বিশেষ খবর থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ