রবিবার , ১৬ আগষ্ট ২০২০ |

করোনাভাইরাসের সাথে সংসার

  মঙ্গলবার , ০৭ July ২০২০

বিপ্লব পাল

আচ্ছা আলোর মধ্যে কী অন্ধকার থাকে? কিংবা অন্ধকারের মধ্যে আলো? যদিও সব সময় আমরা শুনে এসেছি অন্ধকারের পরে আলো আসে, আর আলোর পর অন্ধকার। কিন্তু মানব জীবনে আলোর মধ্যেই অন্ধকারের দেখা মেলে, কিংবা অন্ধকারের মধ্যে আলো। শুধু কত সময় সে থাকবে তা নির্ধারণ হয়, তার শক্তির উপর। যার যত শক্তি, সে ততবেশি অবস্থান করতে পারে। সবখানেই শক্তির লড়াই। ঠিক যেন করোনাভাইরাসের মতো।

করোনাভাইরাস আমাদের ঘরের পরিচিত নাম। শিশু থেকে বয়স্ক সবাই জানেন-চেনেন এই মহামারীর কথা। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে কোনো ওষুধ নেই তা প্রতিরোধই একমাত্র ভরসা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতির এই দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা উন্নত দেশের তুলনায় কয়েকশো গুণ বেশি কঠিন। ঠিক যেন সড়ক দুর্ঘটনার মতো। আপনি যতই সাবধানে গাড়ি চালান না কেন, অন্য গাড়ির চালক অথবা পথচারী সচেতন না হলে, দুর্ঘটনা অবধারিত। অথচ ওই দুর্ঘটনার জন্য হয়তো আপনি দায়ী নন।

করোনাভাইরাস মোকাবেলা একা একা সম্ভব নয়। সবাই মিলে একসাথে প্রতিরোধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। অন্তত যতক্ষণ টিকা বা ওষুধ না পাওয়া যায়। আমরা কী সবসময় পারছি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে একসাথে সচেতন হতে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সবার পক্ষে সমানভাবে লড়াই করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিকল্প তো কিছু নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি গণমাধ্যমকর্মী হয়ে করোনাভাইরাস নিয়ে এত কথা বলছি কেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সত্যি আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমি করোনাভাইরাস আক্রান্ত। শুধু আমিই নই, পরিবারসহ। আমার স্ত্রী, কন্যা-পুত্র সবাই।

পেশাগত কারণে করোনাকালে নিয়মিত অফিস করতে হয়েছে। কিন্তু নিজেকে নিরাপদে রেখে নিউজরুমে বসে কাজ করেছি, অন্যরা এখনো করছেন। প্রতি মুহূর্তে হাত ধোয়া, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জীবাণুনাশক করা সবাই হয়েছে। আমার বাড়তি সতর্কতার জন্য অনেকে টিপ্পনি কেটে বলেছেন, ‘বিপ্লব যত নিরাপদমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে ভয়ে করোনা পালাবে, আমরা নিরাপদ।’ টিপ্পনিগুলো সত্যি হতো তাহলে সবচেয়ে বেশি আনন্দ আমারই হতো। কিন্তু আমিই করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলাম। সাথে পরিবারের সদস্যরাও।

২১ জুন অফিস শেষে বিকেলে বাসায় ফিরি। পরদিন ২২ জুন শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা শুরু হয়। ২৩ জুন ভোরে জ্বর আসে, সাথে শরীর ও মাথা ব্যথা। ২৪ জুন থেকে জ্বর নেই, কমে যায় শরীরের ব্যথা। কিন্তু সকালে স্ত্রীর জ্বর আসে। ৯ বছরের মেয়ের জ্বর আসে বিকেলে, আর সন্ধ্যায় আসে এক বছরের ছেলের। স্বাভাবিকভাবে নানা চিন্তা ভর করে। শুরু হয় চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে নিজেদের বন্দি করে ফেলি। যেহেতু খুব মারাত্মক উপসর্গ নেই, তাই করোনাভাইরাস পরীক্ষা না করার পরামর্শ দেন এক চিকিৎসক। কিন্তু কিছুতেই মন যেন মানতে চায় না। নানাভাবে করোনাভাইরাস পরীক্ষার চেষ্টা করি। পরে ২৮ জুন নমুনা দিতে পারি। ৩০ জুন পজিটিভ ফল আসে। আশ্চর্য এক ফল! পজিটিভ কিন্তু মনে অশান্তি আর ভয়।

করোনাভাইরাস পজিটিভ হলে কেমন লাগে? সেই বুঝতে পারেন, যার হয়েছে। তাছাড়া আর কারোর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আর তাদের জন্য আরো বেশি ভয়ংকর, যারা বাবা অথবা মা। ছোট সন্তান যখন আক্রান্ত তখন এর চেয়ে বেদনা আর কষ্টের কিছু হয় না। ঈশ্বরের কাছে প্রতি মুহূর্তে আত্মসমর্পন করে সন্তানকে ভালো রাখার প্রার্থনা। পরিবারের একমাত্র আমিই বাড়ির বাইরে যাই। তাই ঘরে করোনাভাইরাস ঢুকেছে আমার কাছ থেকে বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ এই ফল ভোগ করছে আমার দুই ছোট সন্তান। এই কষ্ট বোঝানোর কোনো শব্দ জানা নেই। আমার মতো এমন অসহায় শত শত বাবা আছে। এটি যেন শত শত থাকে, লাখ যেন না হয় – প্রার্থনা আমার।

এত সতর্ক থাকার পর, কেন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলাম, এই প্রশ্ন বার বার ঘুরছে। মাস্ক পরা আর ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে করোনাভাইরাস ঠেকানোর কথা বলা হচ্ছে। ঘরের বাইরে মাস্ক, গ্লাভস, গগলস পরেছি, নিয়মিত হাত ধুয়েছি। কিন্তু তবুও করোনাভাইরাস ঠেকাতে পারলাম না। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছি। প্রতিরোধে কিছু গলদ কী ছিল আমার? অবশ্যই ছিল। যেমন- নিয়মিত গরম পানি না খাওয়া, গরম পানির ভাপ না নেয়া, ভিটামিন সি জাতীয় খাবার প্রচুর না খাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যয়াম না করা। মোট কথা শরীরের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত চেষ্টা না করা।

করোনাভাইরাসকে অঙ্কুরে বিনাশ করাই সবথেকে ভালো উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকেরা। মে মাসে ভারতের বিশিষ্ট সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ ডা. এম কে ভট্টাচার্যের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এ সময় তিনি বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন- প্রতিদিন ১৫ মিনিট সূর্যের তাপ গায়ে লাগানো, প্রতিদিন কমপক্ষে দেড় লিটার পানি পান করা, বেশি বেশি গরম পানি খাওয়া; এছাড়া রসুন, আনারস, ডিম, মাংস ও মাছ খাবার পরামর্শও দেন। আামাদের অণুজীববিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল পরামর্শ দিয়েছেন- সকালে ঘুম থেকে উঠে, দুপুরে এবং সন্ধ্যায় গার্গল করা; আদা, লবঙ্গ ও একটা গোলমরিচ, মধু বা চিনি দিয়ে চায়ের সঙ্গে খাওয়া এবং এই পানি দিয়ে গারগেল করা; নাক ও মুখ দিয়ে গরম পানির ভাপ নেওয়া; ভিটামিন ‘সি’ জাতীয় খাবার খাওয়া।

আমার অভিজ্ঞতা বলে, শুধু হাত ধুয়ে আর মাস্ক পড়ে করোনাভাইরাস ঠেকানো যাবে না। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বিশেষজ্ঞর পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। ফাঁক রাখা যাবে না। কারণ লোহার বাসর ঘরের ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে ঢুকে লক্ষিন্দরকে সাপ দংশন করেছিল। তাই সামান্য অবেহলা নিজের ও পরিবারের বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই আসুন সবাই নিজের অবস্থান থেকে সচেতন হই। কারণ আমি বা আপনি সচেতন হলেই চলবে না, সবাইকে একসাথে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা পাওয়া আমাদের মতো দেশে অনেক কঠিন। তাই প্রতিরোধ করেই পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মানতে খুব বেশি টাকার প্রয়োজন নেই। শুধু প্রয়োজন চেষ্টা। সামান্য অবহেলা, আমার মতো আপনার পরিবারেও বিপদ ডেকে আনতে পারে। পৃথিবীর সব বাবা-মা-সন্তানেরা ভালো থাকুক, পরিবারের সাথেই থাকুক প্রার্থনা আমার।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ