বুধবার , ১৫ নভেম্বর ২০১৭

এক বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও ৩০০ ফুট সড়ক হিসেবে পরিচিত ঢাকার কুড়িল-পূর্বাচল সড়কে এখনো চালু হয়নি কোনো গণপরিবহন। আর এতে দুর্ভোগে রয়েছেন ঢাকার উপকণ্ঠের কয়েকটি এলাকাসহ রাজধানীতে যাতায়াতকারী পূর্বাঞ্চলের মানুষ। কুড়িল থেকে পূর্বাচল উপশহরের কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত ৩০০ ফুট সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে। তবে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ প্রবেশপথের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই এ সড়কে যান চলাচল শুরু হয়ে যায়।

তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ওই সড়কে বাস চালুর আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএর উপ-পরিচালক এবং আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সদস্য সচিব মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেন, সড়কটি যান চলাচলের উপযোগী; রাজউকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর আবেদনগুলো বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া এই সড়কে বাস নামাতে অনেক পরিবহন মালিকেরও আগ্রহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির চেয়ারম্যান খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।

জানা গেছে, ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করছে সড়কটি। রাজধানীর দক্ষিণের প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী ও উত্তরের টঙ্গী-আবদুল্লাহপুরের যানজট এড়িয়ে দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং সাভার, আশুলিয়া ও টঙ্গী এলাকায় যাওয়ার সহজ পথ এটি। প্রতিদিন হাজার হাজার প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও ট্রাক এ সড়ক ধরে রাজধানীতে ঢুকছে, চলছে দূরপাল্লার কিছু বাসও। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যেতে লোকজন এই সড়ক ব্যবহার করেন।

সড়কটির নির্মাণকারী সংস্থা রাজউক এটিকে যান চলাচলের জন্য উপযুক্ত বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেওয়ায় নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক বছরেও চালু হয়নি কোনো গণপরিবহন। কিছু পুরোনো ব্যক্তিগত গাড়ি এ সড়কে ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে। কুড়িল, কাঞ্চন ও ভুলতা এলাকায় গিয়ে চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুড়িল বিশ্বরোড থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের ভুলতা এবং কাঞ্চন সেতুর পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত চার শর বেশি এমন গাড়ি চলাচল করে।

ভুলতা এলাকার লাইনম্যান আইয়ুব আলী জানান, পুরোনো এসব ব্যক্তিগত গাড়ি প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বহন করে। একটি গাড়ি চারজন করে প্যাসেঞ্জার নেয়। ভুলতা থেকে প্রতিদিন গড়ে চার ট্রিপ মারে। আর কাঞ্চন থেকে আটটি ট্রিপ মারতে পারে। কিছু অটোরিকশাও প্যাসেঞ্জার নেয়। সব মিলে যাত্রীর সংখ্যা প্রত্যেক দিন ১৫ হাজারের কম হবে না। এদিকে এসব প্রাইভেট কারের বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গত ২৫ অক্টোবর থেকে সেগুলোকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত যেতে দিচ্ছে না পুলিশ।

গণপরিবহনের স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভাড়া হলেও সময় বাঁচিয়ে রাজধানীতে যাতাযাতে এসব প্রাইভেট কার ব্যবহার করেন এ পথে যাতায়াতকারীরা। কোনো গণপরিবহন চালু ছাড়াই সেগুলোকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত যেতে না দেওয়ায় যাতায়াতে আরাে দুর্ভোগ বেড়েছে তাদের। বর্তমানে এসব গাড়ি পূর্বাচল সড়কের বালু সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত আসে। সেখান থেকে অটোরিকশায় কুড়িল বিশ্বরোড। তবে এতে সময় এবং অর্থ দুটোই এখন আরো বেশি লাগছে বলে জানিয়েছেন এ পথে যাতায়াতকারী কয়েকজন যাত্রী।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বালিয়াপাড়ার আবদুল জব্বার বনানী সুপার মার্কেটে অনুবাদের দোকান চালান। তিনি বলেন, কোনো গণপরিবহন না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমি যদি গুলিস্তান বা রামপুরা হয়ে বনানী যাই, তাহলে পুরো শহর ঘোরা লাগে, আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। গাউছিয়া থেকে ৩০০ ফুট হয়ে গেলে এক ঘণ্টাও লাগে না। কিন্তু বাস বা ভালো কোনো পরিবহন না থাকায় বেশ ঝামেলা হয়। আমরা চাই এই সড়কে বাস চালু হোক।

রাজধানীর সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের সংযোগে ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট পূর্বাচল সড়কের বালু সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে বছর বালু সেতু পর্যন্ত সড়কের কাজ শেষ হয়। ২০১৬ সালের শেষের দিকে কুড়িল থেকে পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হয়। মূল সড়কটি চার লেনের। এ ছাড়া দুই পাশে দুই লেনবিশিষ্ট আরো দুটি সার্ভিস লেন রয়েছে। কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে কাঞ্চন সেতুর পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত এ সড়কের দৈর্ঘ্য ১৩ কিলোমিটার। কাঞ্চন ব্রিজের কাছে ঢাকা বাইপাস সড়কে মিলেছে দেশের অন্যতম প্রশস্ত এ সড়কটি।

কাঞ্চন সেতু পার হয়ে ঢাকা বাইপাস সড়ক ধরে সাড়ে সাত কিলোমিটার এগিয়ে গেলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা চৌরাস্তা। সেখান থেকে সিলেট মহাসড়ক হয়ে নরসিংদী ও ভৈরব হয়ে সিলেটসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাওয়া যায়।

ভুলতা থেকে আরো ১৮ কিলোমিটার গেলে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বিশনন্দী ফেরিঘাট। ফেরিঘাট পার হলে কুমিল্লার হোমনা, মুরাদনগর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যাওয়া যায়। ভুলতা থেকে ঢাকা বাইপাস সড়ক হয়ে ১৩ কিলোমিটার গেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর। সেখান থেকে কুমিল্লা, বৃহত্তর নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম যাওয়া যায়। কাঞ্চন ব্রিজের পশ্চিম প্রান্ত থেকে বাম দিকে ঢাকা বাইপাস সড়ক ধরে ১৫ কিলোমিটার গেলে টঙ্গী-ঘোড়াশাল-পাঁচদোনা সড়কের মীরেরবাজার। ২৭ কিলোমিটার গেলে গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তা।

বিমানবাহিনীর সাবেক টেকনিশিয়ান বদর উদ্দিনের বাসা ক্যান্টনমেন্ট থানার বালুঘাট এলাকায়। ব্যবসার কাজে গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা থানার মরজালে যাতায়াত করেন। এ সড়কে বাস চালু হলে তাদের উপকার হবে বলে জানান বদর উদ্দিন। এই সড়কে বাস নামালে আমাদের খুব উপকার হতো। এটা করা খুব দরকার। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও টঙ্গীর ওপর চাপ কমত।

পূর্বাচলে গণপরিবহন চালু হলে আরো বেশি যাত্রী এ পথে আসবেন বলে জানান নিকুঞ্জ এলাকার তৈরি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম। আমার মতো অসংখ্য লোক এই পথে যাতায়াত করতে চান। কিন্তু বাস না থাকায় যেতে পারেন না। প্রাইভেট কারে এলে ১০০ টাকা করে ভাড়া গুনতে হয়। এ ছাড়া সড়কে জ্যাম থাকলে ভাড়া আরো বেশি নেয়। আবার সেগুলো সব সময় পাওয়াও যায় না। বাসে গাউছিয়া পর্যন্ত ভাড়া আসবে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা। এ কারণে অনেকেই ডেমরা বা যাত্রাবাড়ী হয়ে রাজধানীতে যাতায়াত করেন।

তিন শ ফুট সড়কে বাস নামাতে অনেক পরিবহন মালিকের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির চেয়ারম্যান খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। তিনি বলেন, রাজউক সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত বলে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) বুঝিয়ে দিলে সে সড়কে বাস নামানো হবে। অনেকে রুট চাচ্ছে। তবে রাজউক সড়কটি এখনো হস্তান্তর করেনি। যে কারণে আমরা বাস নামাতে পারছি না।

পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের পরিচালক আবদুল আউয়াল বলেন, পূর্বাচলের সড়ক দিয়ে গণপরিবহন চালুর বিষয়ে এখনো বিআরটিএর কাছ থেকে কোনো চিঠি পাইনি। তবে আগামী বছরের প্রথমার্ধে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে এই সড়কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের চিন্তাভাবনা আছে।

 জাতীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ