বৃহস্পতিবার , ১৬ নভেম্বর ২০১৭

কবে আমাদের হুঁশের বয়স হবে?

  বৃহস্পতিবার , ১৬ নভেম্বর ২০১৭

পণ্ডিতদের ম‌তে, দুর্যোগ কোনো সংকট নয়, এটা একটা পরিস্থিতি। এহেন পরিস্থিতি তখনই সংকট আর সমস্যার আবর্তে ফেলে দেয়, যখন আমরা পরিস্থিতি অনুধাবনে ব্যর্থ হই। আনাড়ি ব্যবস্থাপনা, মানসিক দুর্নীতি, সংকীর্ণতা আর ন্যায্য পরিচালন-পদ্ধতির অনুপস্থিতিও যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের ঘোল খাওয়াতে পারে।

সিডর তেমনই এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল; আমরা যারা সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম আর সুযোগ পেয়েছিলাম নতুন করে গড়ার, নতুন কিছু করে দেখানোর। সুযোগ পেয়েছিলাম মানুষের বেঁচে যাওয়ার কৌশলগুলো জেনে নেওয়ার, শুধু উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং নির্মাণকৌশলের কারণে স্থানীয় সামগ্রী ব্যবহার করেও কোনো কোনো বাড়ি টিকে যাওয়ার কার্যকারণ বিশ্লেষণের। ভেবে দেখার অবকাশ পেয়েছিলাম, কেন কোনো কোনো গাছ প্রথম ধাক্কাতেই শুয়ে পড়ল আর কোনো কোনো গাছ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকল— মানুষকে পাহারা দিল চরম সংকটে। আমরা কি সিডর-পরবর্তী এই ১০ বছরে জানা-বুঝের দায়িত্বটা পালন করতে পেরেছি, না করার চেষ্টা করেছি? ততটা করিনি, যতটা নিজ নিজ প্রকল্প আর কল্পনাবিলাসের অগভীর জলে হাবুডুবু খেয়ে সন্তুষ্টির ঢেকুর উদ্‌গার তুলেই চলেছি।

শরণখোলার লিপি বেগম এখন কোথায়?
আশ্রয়হীন নিরুপায় যাঁরা বাধ্য হয়ে বাঁধের ওপর থাকেন, তাঁরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি, প্রাণও যায় তাঁদেরই বেশি; পয়লা আঘাতে আহতও হন তাঁরা। আবার দিলদরাজ রাষ্ট্র লাশ দেখালে ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু যে লিপি বেগম পাঁচটা শিশু নিয়ে স্বামী হারিয়ে বিধবা হলেন, বাঁধের ওপর বাঁধা তাঁর ‘আসমানিদের ঘর’ উড়ে গেল, তিনি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন—ক্ষতিপূরণের টাকা ওঠানোর জন্য? তাঁর ঠিকানা কী হবে? রাষ্ট্রের ‘মাস্টার রোলে’ ক্ষতিপূরণের আশায় শেষ পর্যন্ত বিধবা লিপি বেগমকে অন্যের আশ্রয়ে চলে যেতে হয় শুধু একটা ঠিকানার জন্য—বলা বাহুল্য সে আশ্রয় নিঃশর্ত ছিল না। কঠিন ছিল সেসব শর্ত—ক্রীতদাস হয়ে যায় পুরো পরিবার।

লিপি বেগম ইচ্ছা করলে তাঁর ভাইদের সংসার পিরোজপুরের নেছারাবাদ চলে যেতে পারতেন। কিন্তু এক জেলার ক্ষতিপূরণ অন্য জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা? ক্রীতদাসের জীবন থেকে মুক্তি পেতে লিপি বেগম একসময় বেপরোয়া হয়ে রাস্তার পাশে সড়ক ও জনপথের জায়গায় ঘর তুলে থাকতে শুরু করেন। তত দিনে তাঁর বড় দুই মেয়ে ঢাকায় পাচার হয়ে যায়। থানার দারোগা নিজের কাছে রাখা আর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় তাঁর ‘বড় বোনের বাসায় গৃহকর্মীর কাজে’ পাঠিয়ে দিয়ে বোনের প্রতি ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করেন। লিপি বেগমের দ্বিতীয় কন্যা তখন ক্লাস ফোরের ফার্স্ট গার্ল। চার বছরের মাথায় গিয়ে শুনি তার পুত্রসন্তানটিকে এক লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ওস্তাদে নিয়ে গেছেন। একদিন কাকডাকা ভোরে সেই এতিমখানায় গিয়ে দেখি, বড় হুজুর ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে আছেন আর লিপি বেগমের চোখের মণি তপন মিয়া মশা তাড়িয়ে বাতাস করে তাঁকে ‘দম’ নিতে সাহায্য করছে। তিন-চার বছর আগে শরণখোলা যাওয়ার পথে লিপি বেগমের ঘরের কোনো চিহ্ন চোখে পড়েনি। সড়ক ও জনপথ তাদের রাস্তা প্রায় দ্বিগুণ প্রসারিত করেছে। শরণখোলার রাস্তা এখন আঞ্চলিক মহাসড়ক—এটাও কি সিডর-পরবর্তী অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের অংশ ছিল? রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত কোনো সংস্থা কি বলতে পারবে, লিপি বেগমের ঠিকানা? কোথায় থাকেন এখন তিনি? তাঁর ছেলেমেয়েদের হালসাকিন?

পুনর্বাসন নাকি নির্বাসন?
সুযোগ এসেছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮২৬টি (সরকারি হিসাব, তদানীন্তন খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়) বাড়ি পুনর্নির্মাণে সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহারের। কেউ কি বলতে পারবেন, এখন পর্যন্ত কত বাড়ি বানানো সম্ভব হয়েছে? সবাই কি মাথা গোঁজার ন্যায্য ঠাঁই পেয়েছে? ঘরবাড়ি বানিয়ে দেওয়ার প্রকল্প নিয়ে যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের কড়া করে জানিয়ে দেওয়া হলো, কোনো অবস্থাতেই তথাকথিত অবৈধ স্থাপনাগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এ দেশের নদী-ভাঙা সব-হারানো মানুষের শেষ আশ্রয় হচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এতিম বাঁধগুলো কিংবা রাস্তার পাশের বাড়তি এক চিলতে জায়গা কিংবা রেলসড়ক অথবা সদ্য জেগে ওঠা জোয়ারে ডোবা ভাটায় ভাসা নতুন চর। এসব জায়গায় যাঁরা নিরুপায় হয়ে ঠাঁই নেন, তাঁরা ‘অবৈধ’ হয়ে যান রাষ্ট্রের কাছে। প্রথম ঝটকায় তাঁদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, যাঁর নিজের জমি নেই, তাঁকে ঘরবাড়ি করে দেওয়া যাবে না। [সূত্র: তদানীন্তন বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের স্মারকপত্র এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মালিকদের সভায় তার তেজদীপ্ত উচ্চারণ]

‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’
১৯৯১ সালের পর সিডরই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস। ১৯৯১ সালে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১৯ হাজার ৬০৮। সেই তুলনায় ২০০৭ সালে একদম নষ্ট হওয়া ঘরবাড়ির হিসাব ছিল ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮২৬। আংশিক বা প্রায় ধ্বংসের তালিকায় যোগ হয় আরও ১৮ লাখ ১১ হাজার ৩২৯টি বাড়ি। স্বাভাবিকভাবেই গৃহনির্মাণ অগ্রাধিকার তালিকার এক নম্বরে চলে আসে। আসন্ন শীতকে মাথায় রেখে চটজলদি ঘর তৈরির নানা তরিকা নিয়ে নানা সংগঠন এগিয়ে আসে। প্রায় সবাই বাড়ির কাঠামো নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে থাকে—নীতিনির্ধারণী আর অনুমোদনী কর্তারাও সেখানেই জোর দেন বেশি। কাঠামো প্রকৌশলীরা প্রধান হয়ে ওঠেন সে প্রচেষ্টায়। উন্নত কাঠামো যে উন্নত গৃহকোণ নিশ্চিত করে না, এই সহজ সত্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা বুঝলেও সনদওয়ালা বিশেষজ্ঞরা সেটা জানতে চান না। ঘরবাড়ির সঙ্গে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক কৃষ্টি আর অর্থনৈতিক প্রপঞ্চের যে সম্মিলন দরকার, তা আমরা মানতে চাই না। জনশূন্য বিচ্ছিন্ন চরে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে উন্নত গ্রাম এবং ঝড়সহিষ্ণু বাড়ি নির্মিত হয়েছে। শিয়াল পণ্ডিতের পাঠশালার ‘কুমিরছানা’ হয়ে ওঠে জাতিসংঘের এসব প্রকল্প। তালি-বাঁশি-উচ্ছ্বাস-উৎসাহে চারদিকে রইরই রব পড়ে যায়। বছর দুই পরে সবাই ভুলে যায় ঢাকঢোলের সেই অর্জনকে। তখন গিয়ে দেখি, দোতলায় উঠতে মানুষ ভয় পাচ্ছে; বাতাসে দোলে সেসব ঘর। কাঠের কাঠামো ধরে রাখার জন্য দড়ির টানা দিচ্ছে কেউ কেউ। দেখে শুনে জনপ্রিয় গায়ক জেমসের গানের কথা মনে পড়ে: ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া, দরজা জানালা কিছু নাই…’!

যার দরকার তার অবস্থা বুঝুন
একটা সংগঠন নকশা-টকশার ধার না ধেরে খুবই প্রগতিশীল এক সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের প্রস্তাবটা সরল। তারা বলে, আমরা টাকা দিয়ে দেব, দরকার হলে টিনও কিনে দেব। মানুষই তার পছন্দমতো ঘর বানিয়ে নেবে। ঠিক হয়, তারা টাকা দেবে কিস্তিতে। ৩০ শতাংশ কাজের জন্য অগ্রিম, তারপর ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হলে আবার আরেকটা অগ্রিম। এভাবে কাজের অগ্রগতি দেখে তিন-চার বারে সব টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। তবে বাড়ির কাজ শেষ করতে হবে ৩০ জানুয়ারি ২০০৮-এর মধ্যে। ভালো কর্মসূচি, ভালো অগ্রগতি সবাই অহ্লাদে আটখানা। আমরা গেলাম যাঁদের কাজের অগ্রগতি নেই, তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে। মোস্তফা গাজী বরগুনার এক প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন। তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন সিডরে। তিন ছেলেমেয়ে। কাজ করেন করাতকলে। সিডরের আগে ওই অঞ্চলে করাতকল নিষিদ্ধ ছিল। ঝড়ের পর ছাড় দেওয়া হয়েছে। মোস্তফা গাজীর এখন মেলা কাজ। তিনি কোনো ঘরের কাজে হাত দিচ্ছে না। মোস্তফার ব্যাখ্যা শুনে চোখ কপালে উঠল সবার—এসব তো ভাবা হয়নি?

মোস্তফা জানালেন, ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছগুলোর একটা বিহিত করার জন্য করাতকলের সাময়িক অনুমতি মিলেছে। বড়জোর দুই মাস তাঁর কাজ থাকবে অবিরত। এখন কাজে কামাই দিয়ে ঘর তুলতে গেলে তিনি রোজগার হারাবেন। আরও হিসাব আছে, এখন পৌষ মাস, বেলা ছোট। যাঁদের দিয়ে কাজ করাবে, তারা বেলা ১১টায় আসে, সাড়ে তিনটার আগেই চলে যায়। তোমাদের দেওয়া মজুরির টাকায় কাজ করতে গেলে শীতের পর বেলা বড় হলে কাজ ধরলে পড়তা পড়ে। এ ছাড়া এখন তোমাদের কথায় মেতে তাড়াহুড়ো করে কাঁচা কাঠের বাটাম দিয়ে ঘর তুলে মেটে তেল লাগালেও সে কাঠামো টিকবে না। কাঁচা বাটামগুলো ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে। তারপর সাফ বলে দিলেন, চাইলে তোমরা তোমাদের টিন আর টাকা ফেরত নিতে পারো। আমি আমার সময়মতো ঘর বাঁধাব। তুমি তখন এসে ফটো তোলো। এক দড়িতে সবাইকে বাঁধার আর মাপার এই এক ঝক্কি; প্রকল্পের মাপে মানুষের জীবন বাঁধার এই জারিজুরি আমাদের ছাড়তে হবে।

সত্যটা আমরা কবে উপলব্ধি করব?
আরও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ধোঁকাবাজি কান্নাকাটি দাতাদের মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা দ্বিগুণ-তিন গুণ করার টাকা জমা হয় যায় কোষাগারে। শুরু হয় শ্যামা নৃত্য-ন্যায্য; নির্মাণের নামে চুরি হয়ে যায় রাজকোষ। চোর চাই চোর চাই ধ্বনিতে আকাশ-বাতাসে মুখরিত হলেও চোরকে আর পাওয়া যায় না। কাতারে কাতারে আশ্রয়কেন্দ্র এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্তের মাদুলি গলায় পরে পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ একটা মস্ত বড় আশ্রয়কেন্দ্রের টাকায় কমপক্ষে ৩০টা পরিবারের ঘূর্ণিঝড়-সহনীয় গৃহ নির্মাণ করা সম্ভব। এসব বাড়িতে ঝড়ের সময় কমপক্ষে আশ্রয়কেন্দ্রের দ্বিগুণ মানুষকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব। এটা কোনো কল্পকাহিনি নয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল আর স্থাপত্যকলার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নকশায় পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় এ রকম বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে স্থান নির্বাচন, নির্মাণের গুণগত মান, পরিবার নির্বাচনপ্রক্রিয়া—এগুলো নিয়ে মতামত, প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা, পরামর্শ থাকতে পারে, কিন্তু মানুষকে দুর্যোগ সহনীয় ঘরবাড়ি প্রদানের কোনো বিকল্প আছে কি? মানুষ শেষ সময় পর্যন্ত তার বাড়িতে থাকতে চায়—কি একাত্তর, কি একানব্বই অথবা ২০০৭-এ! এই সত্যটা আমরা কবে উপলব্ধি করব?

কবে আমাদের বয়স হবে, আমরা পরিণত হব? বুদ্ধি আর বিবেকের সম্মিলন ঘটিয়ে মানুষকে নিয়ে মানুষের সঙ্গে বসে তাদের পছন্দকে মূল্য দিয়ে একটা পরিকল্পনা তৈরি আর তা বাস্তবায়ন করতে পারব?

 সাক্ষাৎকার থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ