রবিবার , ১৯ নভেম্বর ২০১৭

পরিবার থেকেই সততার পাঠ

  রবিবার , ১৯ নভেম্বর ২০১৭

‘নীতিকথার ভাত নেই’-এমনটাই এখনকার সময়ের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস। প্রকৃতপক্ষে পরিবেশ অনেকটাই বাধ্য করছে মানুষকে এমনটা চিন্তা করার জন্য। একজন সাধারণ মানুষ দুঃখ করে তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘কর্মজীবনে সত্যের সঙ্গে কাজ করে খাইলাম বাঁশ।’ বিষয়টি হলো কর্মক্ষেত্রে একজন বা দুজন কর্মকর্তা সৎ হলে তাদের পথচলা খুবই দুরূহ হয়ে ওঠে। ঘুরেফিরে সব দোষ ওই সৎব্যক্তিদের ওপরই বর্তায়। তখন নিরপরাধ মানুষগুলোই হয় অপরাধী আর দোষী মানুষগুলো বনে যায় সাধু। তাই সমাজের ভালো মানুষগুলোও ধীরে ধীরে খারাপের পথেই পা বাড়ায়। কেউ লোভে পড়ে আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে।

তবে আশার কথা হলো, সততার এই ক্রান্তিলগ্নেও কিছু কিছু মানুষের সৎ কর্মপরিকল্পনা ও চিন্তা-চেতনা জাতিকে ন্যায়ের পথে চলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এতে কর্মরত ভালো মানুষগুলো পুনরায় সততার পোশাক গায়ে জড়িয়ে শক্তি পাচ্ছে। পরবর্তী প্রজন্মও পাচ্ছে সৎ হওয়ার উপযুক্ত পাঠ। এমনই একটি পরিকল্পনা হলো মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে দুদকের অর্থায়নে ‘সততা স্টোর’ স্থাপন করা। ইতোমধ্যে দেশের বেশ কিছু বিদ্যালয়ে তা করাও হয়েছে। পণ্য রয়েছে থরে থরে সাজানো, কিন্তু নেই কোনো বিক্রেতা, নেই সিসি ক্যামেরাও। প্রতিটি পণ্যের গায়ে মূল্য নির্ধারণ করা আছে। শিক্ষাসামগ্রী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের টিফিনের সব ধরনের মানসম্মত খাবার রয়েছে এখানে। এর ক্রেতা শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা ন্যায়নীতি অনুশীলনের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি প্রশংসনীয় ও উত্তম প্রয়াস।

বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনকে অভিনন্দন না জানানোর কোনো সুযোগ নেই। তারা সত্যিকারার্থেই সততা প্রতিষ্ঠায় মূল জায়গায় কাজ শুরু করেছে। তবে এ কথাও সত্য যে, অপরকে ভালো কিছু করার পথ দেখাতে হলে নিজেকেও ভালো কিছু করে দেখাতে হয়। আর এই ভালো কিছু করার পেছনের মূল শক্তিই হচ্ছে সততা। সততার শিক্ষা দিতে গিয়ে নিজেই যদি অসৎকর্মে লিপ্ত থাকি, তাহলে কোনো ভালো কর্মসূচিই আলোর মুখ দেখবে না। এর ভূরিভূরি প্রমাণ এ দেশের অলিতেগলিতেই পড়ে আছে। এক্ষেত্রে আরো একটি উদাহরণের জন্ম যেন না হয়, সেটাই কাম্য।

শিক্ষাজীবনই একজন মানুষের জীবন গড়ার মূল পর্ব। আর এই পর্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা। এই পর্যায়ে বিক্রেতাহীন সততা স্টোর থেকে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় সৎ হওয়ার অন্যতম একটি পথ খুঁজে পাবে- এটাই আমাদের বিশ্বাস।

সততা টাকা খরচ করে শেখার বিষয় নয়। তবে পরিবেশের ওপর নির্ভর করে পর্যায়ক্রমে মানুষের দখলে চলে আসে। মায়ের ভাষা যেমন কাউকে প্রশিক্ষণ দিয়ে শেখাতে হয় না, তেমনি সততাও কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাওয়া যায় না। একটি শিশু জন্মের পর পারিপার্শিক পরিবেশ অনুযায়ীই বেড়ে ওঠে। শিশুটি যদি আরব দেশে জন্মে তাহলে সে আরবি বলবে, ইংরেজদের দেশে জন্ম নিলে ইংরেজি বলবে-এটাই স্বাভাবিক। ঠিক একইভাবে কোনো শিশুর জন্ম যদি ঘুষখোর ন্যায়নীতিহীন দুর্নীতিবাজ কোনো মানুষের ঘরে হয়, তাহলে সেও বড় হয়ে ন্যায় বিবর্জিত মানুষ হবে-এটাই স্বাভাবিক। সততা প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হলো পরিবার। পরিবারই হলো একজন মানুষের প্রথম এবং সর্বোত্তম শিক্ষালয়। আর দ্বিতীয় ধাপ হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঙ্গন। সুতরাং পরিবারের মানুষজন যদি সৎ হয়, সেই পরিবারের সন্তানরাও সৎ হবে। যদিও পরিবার থেকে সন্তানদের সৎ হওয়ার কোনো চাপ দিতে হয় না।

সর্বোপরি সমাজে দু’ধরনের অসৎ মানুষ রয়েছে। প্রথমত, যারা প্রকৃতিগতভাবেই অসৎ, অর্থাৎ পরিবার থেকেই অসততার শিক্ষা নিয়ে বড় হয়েছে। পরবর্তীতে তারা যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই আসীন হোক না কেন দুর্নীতি করবেই। দ্বিতীয়ত, যারা সৎলোক অর্থাৎ পারিবারিকভাবেই কোনো সৎপরিবারে বড় হয়ে ওঠা মানুষ। বর্তমানে এদের সংখ্যা যদিও কম। এই দুই শ্রেণি যখন একই প্রতিষ্ঠানে দেশ উন্নয়নে কাজ করবে, তখন সৎমানুষগুলোই বারবারই অনাহূত বিপদের মুখে পড়বে। অথবা বলা যায়, ফেঁসে যাবে। সেক্ষেত্রে এই সৎমানুষগুলোকে বলব, বুকে সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে চলুন। ক্ষণিকের জন্য যদিও আপনি বা আপনারা অসৎ লোকদের কাছে কিছুটা খাটো হয়েছেন, এতে মোটেও সাহস হারাবেন না। মনে রাখতে হবে সৎমানুষের পাশেই সৃষ্টিকর্তার বসবাস। অসত্য, অন্যায় চিরস্থায়ী নয়, বরং সৎমানুষের বিজয় সুনিশ্চিত এবং দীর্ঘস্থায়ী।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ