সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

মোঃ জাফর আলী :

"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,  এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।" তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭১ সালের সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণের এই একটি বাক্যই ভারতবর্ষে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

ইতিহাস সাক্ষী যে, একজন বঙ্গবন্ধুর তর্জনীই একটা নিদ্রিত জাতির বুকে সাহস সঞ্চার করিয়ে বাঘের গর্জন দিয়ে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই সংগ্রাম করতে শিখিয়েছিল। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে বৃহৎ পরাশক্তিকেও যে কাবু করে দেয়া যায়, বাঙালিদের সেই কৌশলই শিক্ষা দিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের ছোট্ট সেই খোকা।

শেখ মুজিবুর রহমান; দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী একজন রাজনীতিবিদ। যিনি তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারতের বিভাজন ও পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের নাগপাশ থেকে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।

দেশপ্রেমিক, মেধাবী ছাত্রনেতা, দক্ষ সংগঠক,  খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, আন্দোলনকারী, শুদ্ধভাষী বক্তা, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, সফল রাষ্ট্রনায়ক, মানবতার বন্ধু ও একটি জাতির উত্থানকারী হিসেবে একজন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম হলো শেখ মুজিবুর রহমান।

কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, ধৈর্য ও অবিচলতার ব্যাপারে গর্ব করে বলেছিলেন যে, "আমি হিমালয় দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি।" পর্বততূল্য ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতা সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু দেশ ও জাতিকে অনেক বেশি ভালোবেসেছিলেন। বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, "আপনার শক্তি কোথায়?" তিনি উত্তরে বলেছিলেন," আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি।" আবার তার দুর্বল দিকের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি।"

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার মানুষটি তৎকালীন ফরিদপুর জেলার (বর্তমান গোপালগঞ্জ) টুঙ্গিপাড়া গ্রামের, এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সায়েরা খাতুন তাদের তৃতীয় সন্তান, মুজিবকে 'খোকা' বলে ডাকতেন।

তার শিক্ষা জীবনটা শুরু হয়েছিল গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। ৯ বছর বয়সে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কৈশোরে তিনি দারুণ ফুটবল খেলতেন এবং প্রায় প্রায়ই পুরষ্কার জিতে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

১৯৩৪ সালে মাদারীপুরের ইসলামিয়া হাই স্কুলে পড়া অবস্থায় তিনি বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৩৯ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিবাদ সভা করার কারণে প্রথম কারাবরণ করেন। আর দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার জন্য প্রায় চার বছর লেখাপড়া বন্ধ থাকার কারণে ১৯৪২ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে সেখান থেকে বি.এ পাশ করেন ও উক্ত কলেজে থাকাকালে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। পরে ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েও তা সঙ্গত কারনেই সম্পন্ন করতে পারেননি।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মূখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এর কাছে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটি দল একসময় তাদের স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি স্কুলজীবন থেকেই ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর এবং ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে ১৯৪৪ সালে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনীতির আনুষ্ঠিকতা শুরু হয়। এ বছরই তিনি ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনের সম্পাদকের দায়িত্ব পান।  প্রাদেশিক নির্বাচনেও মুসলিম লীগের পক্ষে তার  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে, মুজিবের কন্ঠ থেকে প্রতিবাদী ভাষা উচ্চারিত হতে থাকে। পরে তার প্রস্তাবেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘট ডাকলে তিনি গ্রেফতারকৃত হন এবং তিন দিন পরই মুক্তি পান।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা অধিকার আদায়ে যৌক্তিক দাবি নিয়ে করা তাদের আন্দোলনের পেছনে শেখ মুজিবের সমর্থন ছিল। যার কারণে আবার গ্রেফতার করা হয়েছিল তাকে। জেলে থাকা অবস্থায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং মুক্তি পেয়েই জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। একসময় দুর্ভিক্ষে খাদ্যের দাবিতে ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং এ কারণে জেলও খেটেছেন। আর ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা রোধেও তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ ও অকুতোভয় সৈনিক।

এরপর তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন এবং যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে, সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনায় তার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। দলের জন্য সময় ব্যয় করতে তিনি ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন এবং এ বছরই সরকারি সফরে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন গমন করেন। ইতোমধ্যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর দেশে ফিরলে ঐ বছরই তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৪ মাস পরে ছেড়ে দেয়া হলে আবারও গ্রেফতারকৃত হয়ে পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে সালে ছাড়া পান।

তবুও শেখ মুজিব ঘরে বসে থাকার লোক নন। ছাড়া পেয়েই এ ভূখণ্ডের মানুষের সকল অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, ছাত্রনেতাদের নিয়ে গোপনে 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এভাবে ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, বাঙ্গালী জাতির মুক্তির সনদ বলা হয় যাকে সেই ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন ও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সহ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সকল ন্যায্য অধিকার আদায়ে প্রত্যেকটি কর্মসূচিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের সরাসরি নেতৃত্ব ছিল।

১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবসহ ৩৫ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে, আগরতলা মামলায় তাদেরকে গ্রেপ্তার করলে বাঙালি জাতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলে। কূল না পেয়ে সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকলকে মুক্তি দেয়। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারি মাসেই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে রমনার রেসকোর্স ময়দানে তাদের জন্য বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং তৎকালীন ডাকসুর সভাপতি তোফায়েল আহমেদ তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। যে উপাধির বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতা হিসেবে বাংলার মানুষ শেখ মুজিবকে তাদের বন্ধু মনে করে স্বস্তির পথ খুঁজে পায়।

দেশের মানুষের কাছে তিনি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন যে, তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ৭০ এর নির্বাচনে প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যা ব্যাপক আলোচনার দাবিদার। নির্বাচন সংঘটিত হলেও ইয়াহিয়া খান সংসদ ডাকতে ও সরকার গঠন করতে গড়িমসি শুরু করেন। যার কারণে বাধ্য হয়ে শেখ মুজিব ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের এক জনসভায় স্বাধীনতার ডাক দেন এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা প্রদান করেন। তারপরে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। অবশেষে ২৫ শে মার্চ রাতে সর্বসাধারণের উপর ঘৃণ্যতম বর্বর হামলা শুরু হয় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে নির্বাচিত করা হয় এবং পাকিস্তানী হানাদারদের চালানো ভয়াবহ অভিযান সারাদেশব্যাপী হিংস্রতা ও ব্যাপক রক্তপাতে রূপ নেয়। লক্ষ-লক্ষ প্রাণ, এক সাগর রক্ত ও হাজার-হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দীর্ঘ নয় মাস শোষণ-পীড়ন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বরে অর্জিত হয় বঙ্গবন্ধুর কল্পিত বাংলাদেশ ও আকাঙ্ক্ষিত সেই স্বাধীনতা।

এই মহান মানুষটি গণমানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের স্বার্থে সারাটি জীবন সংগ্রাম করতে গিয়ে অন্যায়ের সাথে ন্যূনতম আপোষহীনতার কারণে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এরমধ্যে ৭ দিন ব্রিটিশ আমলে আর বাকি ৪ হাজার ৬৭৫  দিনই ছিল  পাকিস্তান আমলের ।

জীবনের শেষ কারাবাস শেষে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু এদেশকে এক বিরাট ধ্বংসস্তূপ হিসেবে দেখতে পান। পরে তার নেতৃত্বেই শুরু হয় নবরাষ্ট্রের পুনর্গঠন কার্যক্রম। নতুন করে গঠিত হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

যখন শহরগুলিকে দেখা গিয়েছিল ভুতুড়ে নগরী হিসেবে, যখন ৬০ লাখ ঘর-বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, ২৪ লাখ কৃষক পরিবারে যখন কোন কৃষি উপকরণ ছিলনা, যখন রাস্তা-ঘাট, পুল-কালবার্ট  একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এবং সব ধরনের যোগাযোগেই বিঘ্ন ঘটেছিল, অর্থনীতির ভিত একেবারে ধ্বংস হয়ে যখন অভাবের তাড়নায় চতুর্দিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল প্রতিনিয়ত, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে, এরকম করুণ অবস্থায়ই বঙ্গবন্ধু এদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন এঁকেছিলেন। এসময় তিনি দুর্ভিক্ষ রোধে, শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাসহ কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে দেশে ছুটে বেরিয়েছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই চারটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে সুন্দর একটি সংবিধান রচিত হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তার দল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয়। এভাবে নবগঠিত বাংলাদেশে বিভিন্ন সমস্যা, অভাব, বিভিন্ন সেক্টরে অদক্ষতা, মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি ও বামপন্থী বিদ্রোহসহ দেশব্যাপী নানাবিধ অস্থিরতার মধ্যেও তিনি দৃঢ়তা, অবিচলতা, সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে আমৃত্যু এদেশ পরিচালনা করে গেছেন।

জীবনের পুরোটা সময় এদেশের মাটি ও মানুষের জন্য ব্যয় করা এই মানুষটির বাংলাদেশকে নিয়ে ছিল দুঃসাহসিক স্বপ্ন। সর্বদা তাকে নির্যাতিত, দরিদ্র ও পরিশ্রমী মানুষদেরকে নিয়ে ভাবতে দেখা গেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ইত্যাদি নিশ্চিত করণের মাধ্যমে মানুষের অভাব-অনটন, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ এবং উন্নত জীবনের লক্ষ্যে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর ও অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব।

কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্যঘাটতি দূরীকরণে সৃজনশীল বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তার সরকার। এজন্যই ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষিকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এভাবে তিনি একটি ধ্বংসস্তূপকে প্রত্যেকটি সেক্টরের উন্নয়ন সাধন করার মাধ্যমে একটি ফুল বাগানে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ বিসর্জন দিয়ে, স্বপ্ন গুলোকে তার নিজ হাতে বাস্তবায়ন করার সুযোগ তিনি পাননি।

কিন্তু আজকের বাংলাদেশ থেমে নেই। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, প্রতিনিয়ত তার দেখানো পথকে ব্যবহার করে, তারই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়ে এদেশের গণমানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টার সংগ্রাম পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, এই তিন সূচকের মানদণ্ডে আজকের বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অবস্থান করছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এর মাথাপিছু আয় ২০৭৯ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগোচ্ছে।

৫০ বছর পূর্বেও যে বাংলাদেশের অস্তিত্বই ছিলনা সেই বাংলাদেশ এখন একটি স্যাটেলাইটের মালিক। এছাড়া আরো কয়েকটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণসহ মঙ্গল অভিযানের স্বপ্নও দেখে এদেশ। একসময় যে বাংলাদেশকে কেউ চিনতই না সেই বাংলাদেশ, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প ও কৃষিসহ বিভিন্ন রপ্তানিপণ্য, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্য, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণীদের বিশ্বব্যাপী পদচারণা , ক্রিকেট, অন্যান্য খেলাধুলা ও বিভিন্ন প্রতিযোগীতাসহ বিভিন্ন শিল্প-সংস্কৃতির জন্য পুরো পৃথিবীতে আজ বাংলাদেশের সুপরিচিতি রয়েছে।

ছোট্ট ও জনবহুল একটি দেশ হয়েও প্রাকৃতিক দুর্যোগের দক্ষ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র দূরীকরণ, বৃক্ষরোপণ,  সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে ইতিবাচক সফলতায় এক দৃষ্টান্তের নাম বাংলাদেশ।

শিক্ষাখাত, স্বাস্থ্যখাত, নারী ও শিশুর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটালাইজেশন, কৃষি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, প্রবাসী শ্রমিক উন্নয়ন, বিদ্যুৎ শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, দক্ষ ভূমি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি উদাহরণ।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে এত উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু জাতীয় অসামঞ্জস্যতারও ব্যাপক বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। তন্মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি, ধর্ষণ ও খুন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। পত্র-পত্রিকা খুললেই প্রতিনিয়ত এই এসব খবর আমরা দেখতে পাই। যেটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক এবং যা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় মোটেও মেনে নেয়ার মতো ব্যাপার নয়।  
এই গর্হিত কর্মকাণ্ডগুলো বর্জন করে, বঙ্গবন্ধুর আত্মা প্রশান্তি পাবে এমন কাজ করে দল-মত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের সকলের এ দেশকে আরো এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে, সবসময় এটাই কামনা।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ