সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

করোনাভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে যখন মানুষ ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছে, সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বৈঠকগুলো ‘অনলাইন’ মাধ্যমে চলছে, তখন আকস্মিক ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ সফরে আসেন। আগে থেকে এই সফরের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আচমকাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিগত বার্তা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিতে আসেন তিনি। দুই দেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার জন্যে এই সফর বলে জানানো হয়।

এই সফর নিয়ে কূটনৈতিক মহলে অনেক জল্পনা হচ্ছে। হঠাৎ কী এমন প্রয়োজন দেখা দিল যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতার মধ্যেও ভারতের পররাষ্ট্র সবিচকে বাংলাদেশে আসতে হলো? সরকারিভাবে শুধু এইটুকুই বলা হয়েছে যে, দুই দেশের যেগুলি যৌথ উৎসাহের জায়গা, সেগুলিতে বোঝাপড়া বৃদ্ধি করার জন্য এই সফর।

১৮ ও ১৯ অগাস্টের সফরে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর শেখ হাসিনা এই প্রথম কোনো বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করলেন। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গেও শ্রিংলার বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, করোনাভাইরাস টিকার প্রাপ্যতা, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা ও মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু, সীমান্ত হত্যা বন্ধ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে সবচেয়ে বেশি প্রচার করা হচ্ছে করোনা-টিকার সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি। এটাও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু করোনা-টিকাই যে এই সফরের মূল এজেন্ডা নয়, তা সবাই অনুমান করতে পারছেন।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বাংলাদেশ সফরটি নানা দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুটা চিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। ভারতে নাগরিকত্ব আইন বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকে নিয়ে দুদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে খোদ শেখ হাসিনাও প্রশ্ন তুলেছিলেন। নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে বিজেপি নেতাদের মন্তব্য ছিল বাংলাদেশের জন্য খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত।

রামমন্দিরের শিলান্যাস ঘিরেও ঘরোয়াভাবে কট্টরপন্থীদের সামনে বাংলাদেশ অস্বস্তিতে পড়ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন সম্প্রতি এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা ঐতিহাসিক। এটাকে (মন্দির নির্মাণ) সেই সম্পর্কে আঘাত হানতে দেব না। তা-ও ভারতের কাছে অনুরোধ, এমন কিছু ঘটতে দেওয়া যাবে না, যা দু দেশের সুন্দর ও গভীর সম্পর্কে চিড় ধরাতে পারে।’’ সম্প্রতি বাংলাদেশকে ১০টি রেল ইঞ্জিন দিয়েছে ভারত। কিন্তু বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইঞ্জিনগুলি পুরনো। এমন অনেকগুলো ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ক্রমেই অপ্রীতিকর অবস্থায় নিয়ে যায়।

এ ছাড়া অনেকবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করার ব্যাপারে ভারত আন্তরিকতা দেখায়নি। এটা নিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে মনোমালিন্য আছে। নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি ইত্যাদি সমস্যা তো রয়েছেই।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের আকস্মিক বাংলাদেশ সফরের মূল কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ভূমিকা। সম্প্রতি ভারত ও চীনের তিক্ত সম্পর্কের আবহে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সখ্য ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে চীন৷ লাদাখ নিয়ে চীন-ভারত উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন বাংলাদেশ চীনে ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবার ঘোষণা আসে।

করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় আরও কাছাকাছি এসেছে চীন। ভারত-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি আটকে রয়েছে। কিন্তু শুষ্ক মরসুমে তিস্তার জলস্তর ধরে রাখার প্রকল্পে বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে চীন। করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য টিকার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা বাংলাদেশে চালানোর ব্যাপারেও চীনের সঙ্গে দেনদরবার চলছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের এই ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। তাই জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলাতে বাংলাদেশকে যত বেশি সম্ভব সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ভারত। এতে করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করা সম্ভব বলে দেশটি মনে করছে।

এ দিকে, পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সম্প্রতি হাসিনাকে ফোন করে করোনাভাইরাস ও বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, ঢাকার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় ইসলামাবাদ। এটাও ভারতের জন্য মাথাব্যথার কারণ। সব মিলিয়ে কূটনৈতিক দিক থেকে ভারত বর্তমানে অনেকটাই চাপে রয়েছে।

ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অনেকগুলো ইস্যুতে বিরোধ রয়েছে। বহুল আলোচিত তিস্তা চুক্তি সাফল্য পায়নি৷ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কথা দিয়েছিলেন, খুব শীঘ্রই সমস্যার সমাধান হবে৷ কিন্তু এখনও তার সিকি ভাগও এগোয়নি৷ উল্লেখ্য, ২০১১ সালেই ভারত-বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবল আপত্তিতে শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যায়৷ এখন সময় এসেছে এই বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করার।

চীন আর ভারতের মধ্যে চলমান রেষারেষি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনীতিতে দরকার গভীর প্রজ্ঞার প্রয়োগ। এখন ধারবাহিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের (সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য কমিয়ে আনা, রোহিঙ্গা সমস্যা, বাংলাদেশ নিয়ে অযাচিত মন্তব্য ইত্যাদি) মধ্যে একটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ। বিদ্বেষ বা উগ্র ভারতবিরোধিতা নয়, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অত্যন্ত ধৈর্য্যের সঙ্গে উভয় দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতে হবে। এ জন্য ধারাবাহিক আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারত ভ্রাতৃপ্রতীম প্রতিবেশী দেশ, কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক সমতার ভিত্তিতে স্থাপিত হয়নি। বস্তুত এই দুই দেশের আয়তন ও প্রভাবের মধ্যে ফারাক এত বিপুল যে চট করেই অর্থপূর্ণ সমতা আশা করা কঠিন। দুই রাষ্ট্রই পারস্পরিক স্বার্থের সর্বোচ্চ উপযোগ গ্রহণের নীতিতে চালিত হয়। এতে করে ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সব সময় বঞ্চনার পাত্রটিকেই বহন করতে হয়। তবে যুদ্ধ করে, বয়কট করে এ সমস্যার কোনো সমাধানে উপনীত হওয়া যাবে না। সমস্যা সমাধানে লাগসই কূটনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারত আমাদের সবচেয়ে বৃহৎ প্রতিবেশী, বাণিজ্য থেকে জাতীয় নিরাপত্তা, নদীর পানি থেকে পেঁয়াজ, অনেক ব্যাপারেই এই দেশটির ওপর আমাদের নির্ভরশীল থাকতে হয়। ফলে সমতার সম্পর্ক নিয়ে যত কথাই বলি না কেন, ভারতের ইতিবাচক মনোভাবের ওপর আমাদের অনেকটাই নির্ভরশীল হতে হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা বাহ্যত ‘মধুর’ হলেও ভেতরে ভেতরে অনেকটাই অবিশ্বাসের। দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে কখনওই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যে কোনো সম্পর্ক তৈরি হয় শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ওপর। দেবে আর নেবে মেলাবে মিলিবে। সকলের তরে সকলে আমরা। কেউ কারও স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যকে সাহায্য করবে না। কিন্তু নিজের স্বার্থের জন্য অন্যকে পথেও বসাবে না। কিছু ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। কিছু পেতে হলে কিছু দিতেও হবে। এই খানে ভারতের নেতৃত্ব চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের দায় অনেক বেশি। সবার আগে তাদেরকে ‘বড়ভাই’ সুলভ মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুধু একজনই সে প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন, প্রতিবেশীর প্রতি যথার্থ বন্ধুর হাত বাড়িয়েছিলেন। তিনি আই কে গুজরাল, যিনি প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কোনো শর্ত ছাড়াই বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি যে ‘গুজরাল ডকট্রিন’ অনুসরণ করেছিলেন, তার মূল কথাই ছিল বৃহৎ দেশ ‘বড় ভাই’ হিসেবে ভারতকে বৃহৎ হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘আমি কী পেলাম’ এই শর্ত সে আরোপ করবে না। দুর্ভাগ্যজনক যে, গুজরালের সেই আন্তরিকতা পরবর্তীকালের ভারতীয় শাসকদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায়নি।

পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের অস্থিতিশীলতা যেমন বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে ভারতের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ রাজনীতি-অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই উভয় দেশ সম্পর্কিত। কাজেই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আর পারিপার্শ্বিক জটিলতা দীর্ঘায়িত হলে দুই দেশেরই সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষ চায়, এই উপমহাদেশ শান্ত থাকুক, ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের সহযোগী হয়ে একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠুক। সেটা তৈরি করা ও টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব‌ও উভয় পক্ষের, এই বিষয়টা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বুঝে নিতে হবে উভয় পক্ষের নীতি নির্ধারকদের। বিশেষ করে ভারতের। কিন্তু উগ্রজাতীয়তাবাদ-প্রভাবিত ভারতীয় নেতৃত্ব কী তা অনুধাবন করতে পারছে?

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ