সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

কল্যাণ দার্শনিক অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান

  শুক্রবার , ২৮ আগষ্ট ২০২০

রাসেল আহম্মেদ

শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, সমাজসেবক সাইদুর রহমান ব্রাহ্মণবাড়িয়াজেলার নবীনগরের রছুলাবাদ গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বরাবরই একজনমেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকস্তরে তিনি তৎকালীন অবিভক্ত ভারতে মেধা তালিকায় স্থান অর্জন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়থেকে দর্শন বিষয়ে স্নাতক সম্মান (১৯৩১) ও এমএ (১৯৩২) উভয় পরীক্ষায় তিনি অসাধারণফলাফল অর্জন করেন। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পরপরই তিনি রাজশাহী কলেজে দর্শনের অধ্যাপকহিসেবে যোগ দেন। পেশাগত জীবনে সাইদুর রহমান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকরেন। কলকাতার বিখ্যাত বেকার হোস্টেলের সুপার, চট্টগ্রাম বিভাগের ইন্সপেক্টর অব স্কুলস,শিক্ষা বিভাগের স্পেসাল ইন্সপেক্টর অব এডুকেশন, স্পেসাল অফিসার ইন এডুকেশন ইত্যাদিপদে দায়িত্ব পালনে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে তিনি স্বল্পসময়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগেখন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। সাইদুর রহমান ১৯৫৭ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়েবিলেত যান এবং ‘অরগ্যানাইজেশন এন্ড এডমিনিস্ট্রেশন এন্ড ফারদার এডুকেশন’ বিষয়ে প্রশিক্ষণগ্রহণ করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬৩ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এ সময়তিনি বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে কলেজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুস্থপরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। কলেজে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া সহশিক্ষার ব্যবস্থাতিনি পুনরায় চালু করেন। বিশাল কলেজের বিপুল সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল কর্মকান্ডকে যুবসমাজও দেশবাসীর মধ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি কলেজ বার্তা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন।তাঁর আমলেই এ কলেজে দুই শিফটে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয় এবং নৈশকালীন বি.এসসি কোর্সচালু হয়। এছাড়া তিনি ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন গার্লস কলেজসহদেশের বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

 বাংলাদেশে দর্শনচর্চার ইতিহাসে সাইদুর রহমানের দর্শন‘কল্যাণ দর্শন’ নামে পরিচিত। কল্যাণ দর্শনের রূপরেখা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে:‘জীবনসংগ্রামের লক্ষ্য হবে নবীন পরিবেশ সৃষ্টি এবং তাতে সামষ্টিক কল্যাণ গুরুত্ব পাবে,অবসান হবে শোষণ-বঞ্চনা-অন্ধকুসংস্কারের। কল্যাণ দর্শন হচ্ছে প্রগতির দর্শন। এ দর্শনেরঅবকাঠামোতে সমাজ গঠনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরার্থপর মানসিকতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধেরচেতনা।’ নিতান্ত সহজ-সরল জীবনযাপনকারী এবং মানবদরদী সাইদুর রহমান দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরঅধ্যাপনা এবং সমাজসেবা করেন। সাইদুর রহমান স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয়সমর্থক ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তাঁর নিজ বাড়িতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরচিকিৎসার জন্য ছোট একটি হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন। সাইদুর রহমানের একমাত্র গ্রন্থেরনাম এ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলামিক কালচার অ্যান্ড ফিলোসফি এবং বিখ্যাত প্রবন্ধসমূহেরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘অবস্থা বনাম ব্যবস্থা’, ‘প্রগতির দর্শন’, ‘সংশয়’, ‘পরার্থপরতারমানসিকতা’ ইত্যাদি।

 এ দেশের মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী চিন্তাবিদদেরমধ্যে যারা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার অগ্রপথিক হিসেবে অবদান রেখেছেন,তাদের মধ্যে অধ্যাপক সাইদুর রহমান এক স্মরণীয় নাম। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে তিনিমেধার স্বাক্ষর রাখেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি রাজশাহী কলেজ, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ,ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, সিলেট এমসি কলেজ, জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরদর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন।

যে কাজ ও জীবনদৃষ্টি অধ্যাপক সাইদুর রহমানকে গতানুগতিকশিক্ষকতার বা ছাপোষা পেশাজীবীর স্তর থেকে বিশেষভাবে আলাদা করেছে সেটা তার শতভাগ সংস্কারমুক্তমন। তিনি তাঁর সমসাময়িক সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অশিক্ষা-কুশিক্ষার বিরুদ্ধে আন্তরিকভাবেকাজ করেছেন। সে কাজই তাকে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের কাছে পরমশ্রদ্ধার ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। সাইদুর রহমানের পেশাগত জীবনের বিশেষ গৌরবের দিক হলোতিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। কলকাতার ইসলামিয়াকলেজে অধ্যাপক থাকাকালে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে সাইদুর রহমানের সুসম্পর্ক গড়েওঠে। বঙ্গবন্ধু’র ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও তাঁর নানা স্মৃতি উল্লেখ আছে। বঙ্গবন্ধুরহত্যাকাণ্ডের পর অধ্যাপক সাইদুর রহমান তাঁর প্রিয় ছাত্রকে নিয়ে স্মৃতিকথাও লিখেছেন।তিনি সেখানে একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করতে ভোলেননি। সেটি আমাদের জানা জরুরি বলেই মনেকরি। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব যখন রাষ্ট্রপতি তখন সাইদুর রহমান তার প্রিয় ছাত্র মুজিবেরকাছে যেতেন। আবার কখনো রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব গাড়ি পাঠিয়ে সাইদুর রহমানকে তার অফিসেনিয়ে এসে দেশের সমস্যা নিয়ে মতবিনিময় করতেন। সেরকম আলাপচারিতারই একটি ঘটনা ঘটে ১৯৭৪সালে। শেখ মুজিব একদিন তার জাতীয় পরিষদ ভবনের অফিসে ডেকে নিয়ে আসেন সাইদুর রহমানকে।তখন দেশের অফিস আদালতে ঘুষ খাওয়ার হিড়িক দেখে বিরক্ত শেখ মুজিব সাইদুর রহমানকে বলেন,‘স্যার, শুনে অবাক হবেন যে, হাইকোর্টের জজও এর ঊর্ধ্বে নন।’ তখন প্রশাসন ও সমাজ জীবনেক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, খাইখাই ভাব ও চাটার দলের দৌরাত্ম্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাইদুররহমানের অনেক কথা হয়। কথার এক পর্যায়ে শেখ মুজিব আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্যার মনে আছে একবারআপনার কাছে একশটি ভালো মানুষের তালিকা চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে ভালো মানুষের সেই তালিকাকিন্তু আজও দিতে পারেননি।’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনীতি,প্রশাসন ও বিচার বিভাগে ভালো এবং মেধাবী মানুষের বিকল্প নেই। সেই সৎ মানুষের খোঁজেথাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর প্রিয় শিক্ষকেরই শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

ধর্মনিরপেক্ষতার অগ্রপথিক, উপমহাদেশের প্রথিতযশাদার্শনিক, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সাইদুর রহমান। এদেশে ‘কল্যাণ দর্শন’–এর জনক অধ্যাপক সাইদুররহমান ১৯৮৭ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকার এ মৃত্যুবরণ করেন। অসামান্য মেধাবী মানবিক এই ব্যক্তিত্বের,মহান এই মনীষার স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ