বুধবার , ২২ নভেম্বর ২০১৭

জলাবদ্ধতার ভুলে যাওয়া বাদবাকি গল্প

  বুধবার , ২২ নভেম্বর ২০১৭

হাসানহামিদ

শীত পড়তেশুরু করেছে, আমরা ভুলে গেছে নোংরা জলের ঐতিহাসিক স্নানের গল্প। কিন্তু আগে থেকেভেবে না রাখলে আবার কিন্তু সুদিন আসবে! জলাবদ্ধতা নিয়ে সবাই যখন অস্তির, আমাদের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ারখন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলে, ‘ঢাকারজলাবদ্ধতা আপনি কী দেখছেন? আপনি কলকাতায় যান, বোম্বেতে যান, পৃথিবীর প্রত্যেকটি ক্রমবর্ধমানসিটিতে এ সমস্যা আছে!

আমিভেবেছিলাম জলাবদ্ধতা দেখতে কলকাতা যাবো কেনো, শান্তিনগরে গলা পানি লেগে থাকে, এরচেয়ে বেশি হলে সেটা জলাবদ্ধতা নয়, সাধারণ বন্যাও নয়, ভয়াবহ বন্যা। আমি লক্ষ করেদেখেছি, আমাদের মানুষগুলো কেমন গায়ে সহা হয়ে গেছে। অফিস থেকে বের হয়ে প্যান্ট কাছাকরে, জুতো খুলে হনহন করে নোংরা পানির উপর দিয়ে দিব্যি হাসতে হাসতে যাচ্ছে। কীভয়াবহ! আমাদের মন্ত্রী সেদিন রাজধানীর একটি হোটেলেনির্মল পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম গড়তে মেডিকেলবর্জ্য ব্যবস্থাপনাশিরোনামে অনুষ্ঠিত সেমিনার শেষে ঢাকারদীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা নিয়ে এক সাংবাদিকের করা প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয়সরকারমন্ত্রী উপরের কথাগুলোবলেছিলেন।আর এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেছিলে, ‘জলাবদ্ধতানিরসন নিয়ে কথা বলতে গেলে সময় দরকার। ঢাকার জনসংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ৭৫ লাখ থেকে ১কোটি। সেই জায়গায় এখানে তিন গুণ বেশি মানুষ আছে। আর অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা বৃদ্ধিহচ্ছে। এই অপরিকল্পনার কারণে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা আরওয়াসা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে সিটি করপোরেশনকেযুক্ত করা হবে এবং তাদের নেতৃত্বে ওয়াসা কাজ করবে। এই জলাবদ্ধতাও পর্যায়ক্রমেনিরসন করতে সক্ষম হব।এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটিকরপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তখন সবচেয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলেছিলে,‘আইন অনুযায়ী জলাবদ্ধতা দূর করার মূল দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। তবেসিটি করপোরেশন চেষ্টা করছে ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার

মন্ত্রীরবক্তব্য অনুযায়ী,  ঢাকার চারপাশে যে খালগুলো আছে, সেগুলো নাকি আরখুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেগুলো উদ্ধারের কাজ চলছে। এগুলো পুনরুদ্ধার করে এরমুখগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে। তখন খালগুলোকে আরও গভীর করে দেওয়া হবে। তবে এই জলাবদ্ধতা কিন্তু রাজধানীর অনেকপুরোনো সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময় নেয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। কিন্তুকাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। নগরবাসীর অনেকেই বলছেন রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনেবাস্তবমুখী কোন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে না, আরএ জন্য নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে। নগর পরিল্পনাবিদরা বলেছেন,দিন দিন ঢাকা শহরের খোলা জায়গাগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে, আর দখল হয়ে যাওয়া জায়গুলিতে পাকা দালান গড়ে ওঠায় পানি চুয়ে নিচে যেতেনা পারায়, রান অব ওয়াটার বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে জলাবদ্ধতাদিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আবহাওয়াবিদরা মনে করেন, প্রতি আট দশবছর পর পর এ রকম অতি বর্ষণ হতে পারে, এটাকে মাথায় নিয়েইনগরীর ডেনেজ সিস্টেম করা উচিত। রাজধানীতে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন,বৃষ্টির পানি প্রথমত ভূগর্ভে শোষণ করে নেয়, বাকি পানি রান অব ওয়াটার হয়ে খাল বিল ও ড্রেন দিয়ে নদীতে চলে যায়।কিন্তু এখানে এই দুই পথের সবই অকার্যকর। তাছাড়া নগরীতে যে ড্রেনগুলো আছে তাওআবর্জনায় পূর্ণ, পানি যাওয়ার রাস্তায় বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে,এ কারণে নগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে।

আমরাজানি, বাংলাদেশেমৌসুমী আবহাওয়ার কারণে প্রতিবছর মে, জুন, জুলাই,আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গড়ে প্রতিমাসে ১২-১৮ দিন বৃষ্টিপাত হয়েথাকে। এই সময় প্রতিমাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গড়ে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি হয়ে থাকে।সুতরাং দেশের উন্নয়ন পরিক্রমায় এই ধরনের বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয়ব্যবস্থা ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন থাকা প্রয়োজন। বিশেষত: বড় শহরগুলোতে পানি নিষ্কাশনেবিশেষ যতশীল হওয়া প্রয়োজন যেখানে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার কারণে পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ঢাকা শহরে ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে একদিনেবৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৩৪১ মিলিমিটার যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত।ওই সময় ঢাকা শহরের দুই-তৃতাংশ পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল। এ বছর যে কয়েকবার ঢাকাশহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে কোনবারেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দৈনিক ৮০ মিলিমিটারঅতিক্রম করেনি। এমনকি কমবেশি ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে ঢাকা শহরের অনেক এলাকা পানিরনিচে চলে যেতে দেখা গেছে। বর্তমানে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণকরেছে। রাজউক তাদের প্রণীত ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) ও ড্যাপঅনুযায়ী ভূমি ব্যবহার বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করতে পারার কারণে ঢাকা শহরের আশপাশেরজলাভূমি, নিম্নভূমি, নদী-খাল বেদখল হয়েছে এবং বর্ষামৌসুমে পানি ধারণের স্থান কমে গেছে।

ক্যাডাস্ট্রালসার্ভে (সিএস) ম্যাপ অনুযায়ী ঢাকা শহরের ৫৪টি খাল থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নেরকারণে ওয়াসা বর্তমানে মাত্র ২৬টি খাল চিহ্নিত করতে পারে। ডিসিসি কর্তৃক নির্মিতভূ-উপরিস্থ ড্রেন এবং ওয়াসা কর্তৃক নির্মিত ভূ-গর্ভস্থ ড্রেন ও প্রাকৃতিক খালগুলোরসঙ্গে যথাযথ সংযোগের অভাব রয়েছে। তাছাড়া বর্জ্য অব্যবস্থাপনা ও জনগণের অসচেতনতারকারণেও ড্রেন ও খাল বন্ধ হয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়

আসলেঢাকারপানি নিষ্কাশন পদ্ধতিড্রেনেজ নিয়ে কথা বলতে হলেশুধুমাত্র উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৫১ বর্গ কিলোমিটার নিয়ে চিন্তা করলেচলবে না। পানি নিষ্কাশনে ৩১৮ বর্গ কিলোমিটারের ঢাকাকে বিবেচনায় এনে ঢাকাকে মূলত৩টি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা- ঢাকা পশ্চিম অংশ (১৪৩বর্গকিমি), ঢাকা পূর্ব অংশ (১১৮ বর্গকিমি) এবং ডিএনডি (৫৭ বর্গ কিমি) এলাকা। এরমধ্যে ঢাকা পশ্চিম অংশ ১৯৮৮ সালের বন্যার পর চারপাশে বাঁধ দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে।ফলে নদীর স্ফীতজনিত বন্যার পানি থেকে এই অংশ বহিস্থ বন্যা থেকে মুক্ত হয়। আরঅন্তঃস্থ বৃষ্টির পানি ধোলাই খাল, কল্যাণপুর ও গোরানচাঁদবাড়িতে অবস্থিত পাম্পের সাহায্যে ঢাকা পশ্চিম অংশের পানি তুরাগ ও বুড়িগঙ্গাতেপাম্প করে ফেলে দেয়া হয়। এই অংশের প্রধান প্রধান খালগুলো হলো দিগুণখাল, দিয়াবাড়ি খাল, আব্দুল্লাহপুর খাল, বাউনিয়া খাল, কল্যাণপুর খাল ও তার শাখা খাল,হাজারীবাগ খাল, ধোলাই খাল ইত্যাদি। ঢাকাপূর্ব অংশের প্রধান খালগুলো হলো গোবিন্দপুর খাল, বাওথারখাল, বোয়ালিয়া খাল, সুতিভোলা খাল,শাহজাদপুর খাল, বেগুনবাড়ি খাল, মেরাদিয়া খাল, জিরানি খাল, মান্ডা খাল, নড়াইল খাল এবং তাদের শাখাপ্রশাখা। এই অংশের পানি প্রাকৃতিক প্রবাহে এই সকল খালের মাধ্যমে বালু নদীতে গিয়েপড়ে।

আমার মনে হয়, বন্যারহাত থেকে বাঁচার জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণকরতে হবে। নদী-খাল দখল বন্ধ করতে হবে। ইতোপূর্বে ঢাকার চারপাশের নদী বাঁচানোর জন্যহাইকোর্টকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিন্তু দখল বন্ধ হচ্ছে না। একদিকেউচ্ছেদ অভিযান চলে অন্যদিকে নতুন করে দখল হয়। এই সাপলুডু খেলায় শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়দখলকারীরাই। অথচ নদী দখল বন্ধ করতে না পারলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। পরিবেশসচেতনতার এ যুগে নদীর অপমৃত্যু হবে আর সকলে চেয়ে চেয়ে দেখবে এটা হতে পারে না।দখলকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া নদী দখল বন্ধ করা যাবে না। নদীদখলে একটি দুষ্টচক্র অত্যন্ত ক্রিয়াশীল। এ চক্র ভাঙতে হবে। প্রশাসনের কোন গাফিলতিথাকলে সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আগে থেকে ভাবতে হবে। আমরা আগামী বর্ষায় আর নোংরা পানিতে হাঁটু ভিজাতে চাইনা।

লেখক- গবেষক ও কলামিস্ট। 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ