শনিবার , ২৫ নভেম্বর ২০১৭

কী সুন্দর মিথ্যাগুলো!

  শনিবার , ২৫ নভেম্বর ২০১৭

হাসান হামিদ

আওয়ামীলীগেরকেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এমপি।তাঁকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি না, চিনি অন্য সবার মতোই। বাংলাদেশের একটি বড়রাজনৈতিক দলের নেতা তিনি। আমি অবাক হয়েছি তাঁর একটি বক্তব্যে। না, আমি রাজনীতি করিনা; বা রাজনীতির নামে এদেশে যে চামচামি হয় তাঁর কর্মী নই। কিন্তু সোজা কথায় ইতিহাসএভাবে দলামোছা করতে চাইলে উত্তর পুরুষে তিনি কীসের উদাহরণ হবেন তা তো তাঁর নাবোঝার কথা নয়! তিনি সম্প্রতি বলেছেন, জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাছিলেন না, তিনি পাকবাহিনীর সাথে কখনো যুদ্ধ করেননি,জিয়াউর রহমান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন।গত বুধবার দুপুরে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে সদর উপজেলাআওয়ামীলীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বলার আগে একবারও কি ভেবেছেন এটা কতো বড় মিথ্যাচার! তবে এ সংস্কৃতি নতুন নয়।কিন্তু এমনটি পেশাদার রাজনীতিবিদ হিসাবে, সত্যিকারের নেতা হলে কারও বলা উচিত নয়।শ্রদ্ধেয় মাহবুবউল আলম হানিফের তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার কথা!

বেশি কথা বা ইচ্ছেমতো কথা বলে সীমা অতিক্রম করলে সেটাকিন্তু হিতে বিপরীত হয়। টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের চাকর তার অনুপস্থিতিতে একবার পৃথিবীর প্রথম ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছিলো।আর তাতে তিনি রেগে গিয়ে তার এক মাসের বেতন কর্তন করেন তারপরচাকর বেতন কাটার কারণ জানতে চায়। 
-
মনিব আমার অপরাধ ?
-
তুমি সীমা অতিক্রম করেছ
-
কিসের সীমা ?
-
কথা বলার সীমা

কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ আরআমলাদের অতিকথনে সরকার বা দলের অবিভাবক মনে হয় শুনেও না না শোনার ভান করে থাকেন।বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীরআশ্বাসের পরও ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক  বাড়ানোর বিষয়ে অনড় ছিলেনআমাদের অর্থমন্ত্রী। এ কারণে তার উদ্দেশ্যে সংসদে কয়েকদিন আগে ফজলুল করিমসেলিম বলেছিলে, আপনি একগুঁয়েমি সিস্টেম বন্ধকরেন আর কথা কম বলেন।আসলেই কিন্তু অর্থমন্ত্রীরকিছু কথাবার্তায় সরকারকে অনেকবার  বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে;আর তা মোটেই শোভন নয় অথচ এ ধরনের ঘটনা নিয়ে সমালোচনায় কেউ কেউগোস্বা করেন মনে হয়।

আসলে এটা তো শুধু আমাদের বড় রাজনীতিবিদেরানয়, তেল মারার রাজনীতির সংস্কৃতি এ দেশে একদিনে হয়নি; আগে থেকেই ছিল। স্বাধীনতারপর থেকে এ দেশে যে যেভাবে পারছে তেল মেরেই যাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের বলতে শুনি, তারানাকি মুজিব আদর্শে রাজনীতি করেন। কিন্তু আমি তো জানি মুজিব হলো সেই শক্তির নাম, যেকোনোদিন অন্যায়ের সাথে আপোস করেনি। আর সারাজীবন ন্যায্য কথা বলা বঙ্গবন্ধুরআদর্শের সৈনিকরা আজকাল তেলের পুকুর কেটে বসে আছেন। এসব তেলবাজদের খপ্পরে পড়েআমাদের বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে, আমরা একবারও কি ভাবি? তবে ইদানীং রাজনীতিবিদেরা,আমাদের এমপি মন্ত্রীরা কেউ কেউ যখন জনগণের পক্ষে কিছু বলেন, ভালো লাগে। সাধুবাদজানাই যারা নিজেদের সমালোচনা করতে শিখেছেন তাদেরকে।কিন্তু মিথ্যাচার করলে খারাপলাগে। এর নাম রাজনীতি? রাজনীতি মানে শুধু ভোটে জেতা আর দলের লাভ? রাজনীতি মানেজনগণের কিছু নয়? জনগণ এখন আগের মতো এতোখানি বোকা আছে কিনা তা পরিস্থিতি বলে দেবে।তবে দেশের বড় রাজনীতিবিদদের বলবো, দয়া করে নিজের লাভের কথা ভেবে রাজনীতিকে ব্যবসায়পরিণত করবেন না। কিছুদিন পর আপনারা ইতিহাসে বিকৃত এবং বিক্রিত চরিত্র হবেন। ঠাণ্ডামাথায় ভেবে দেখবেন?

আর সব রাজনীতিবিদ একই কথা বলে উপরেরসাহেবদের তেল মারে। মনে হয় সব কোর্স করা তেলবাজ। আর নখল করতে সবাই ওস্তাদ। এ বিষয়েমজার একটি ঘটনা বলি। লেখকপ্রেমেন্দ্র মিত্র তখন চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেনতার নতুন একটা ছবি মুক্তি পেয়েছেকিন্তু ওই ছবির কাহিনী নিয়েকথা উঠেছেবুদ্ধদেব গুহ পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন যে, কাহিনীটিতার লেখা। প্রেমেন্দ্র মিত্র নাকি লেখাটি  নিজেরনামে চালিয়ে দিয়েছেনসবাই উদগ্রীব, প্রেমেন্দ্র মিত্র এখন কীবলেন! কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র কিছু বলছেন নাকিছুদিন পর প্রেমেন্দ্র মিত্র বিবৃতি দিলেনতিনি বললেন, ‘চলচ্চিত্রের কাহিনীটি আমার না সেটা সত্যি, তবে বুদ্ধদেব গুহ যেখান থেকে গল্পটিনিয়েছে, আমিও ওই একই জায়গা থেকে নিয়েছি

স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানকে কেউ খাটো করেদেখলে ভাবতে হবে সে একজন মূর্খ, সে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানে না; অথবাজানে কিন্তু অস্বীকার করে। ইতিহাস বলে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।  আর আমাদের জাতির পিতা তাঁকে স্নেহ করতেন সে কারণেই। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতারজন্য জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁরপরবর্তী সমালোচিত বা অন্য ভূমিকাও কিন্তু আমরা জানি। কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধকরেননি সেটা তো ইতিহাস বলে না। এ ব্যাপারে আরও কয়েক লাইন বলি।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর বর্বরের মতো ঘৃণ্য হামলাচালায়। সে রাতে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে আমাদের জাতির পিতাবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বন্দী হন। বন্দী হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতারঘোষণা দেন। এরপর ২৭শে মার্চ জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকেবঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করে শোনান। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশেরমুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় অবদান রাখেন। তিনি দলবল নিয়ে বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রাম ওনোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকারগঠিত হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিতকরে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনাকরেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নেভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও তারপরজেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বেরজন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। রণাঙ্গনে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল,তিনি সবসময় সামনে থাকতেন এবং কমান্ডারদের সৈনিকের সামনে থাকতেপরামর্শ দিতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি যখন বিদ্রোহ ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করলেন, তখন তিনি দেখলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টেরসৈন্যসংখ্যা মাত্র ৩শ'। তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলরেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক ছিলেন। মাত্র সাতজন অফিসার এবং ৩শ' সৈন্য নিয়ে ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্যএবং অপ্রতুল অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তিনিপ্রথমে তার বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এই বিদ্রোহ ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ।

আমি তাই মনে করি, সম্মানিত রাজনীতির বরপুত্রগণ, সত্যি কথা বলুন। ভিন্ন পথ বাঅন্য মতের হলেই তার সব খারাপ হয়ে যায় না। তাছাড়া একে অন্যকে আক্রমণ করে গলাবাজিবন্ধ করুন। মানুষ এখন এসব বুঝে। যৌক্তিক দোষগুলো সহজ করে জনগণের সামনে বলুন;গঠনমূলক সমালোচনা করুন। আর উপরের বাবুরা কথা কম বললেই ভালো হয়; বঙ্কিম চন্দ্রেরসেই কথা তো সবাই জানা যে, অল্প কথায় কাজ হলে, বেশি কথার দরকার কি? 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ