শুক্রবার , ৩০ অক্টোবর ২০২০ |

ফেনীতে বঙ্গবন্ধু

  মঙ্গলবার , ০৬ অক্টোবর ২০২০

ড. আবুল কালাম আজাদ

একজন  মানুষের জীবনের স্মৃতি তার বহু বছরের আশা-আকাঙ্খা, বেদনা-উল্লাস, বিষাদ, ক্রোধ, ভালোবাসা,অর্জন ও ত্যাগের ভিত্তিতে প্রাপ্তি ও অ-প্রাপ্তির সমাহারে গ্রন্থিত একটি বিশাল অধ্যায়।প্রকৃতির নিয়মেই সময়ের ফাঁকে অতীতের স্মৃতি অনেক সময়ই মলিন হয়ে পড়ে। স্মৃতির পাতারঅনেক বিষয় মুছে যায়, বিমর্ষ-বিবর্ণ হয়ে পড়ে। তথাপিও কিছু কিছু স্মৃতি থেকে যায় চিরভাস্বরহয়ে, ক্রমান্বয়ে আরও শাণিত হয়। এসব স্মৃতি নির্ভর ভাবগুলো কিছু সময়ের জন্য হলেও মানুষকেভাবায়-কাঁদায়-হাসায় এবং আন্দোলিত করে। বন্দী মনের ভেতরে ঝড় তোলে অবসরে। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সুখ-দুঃখের স্মৃতি গুলিমূখ্য হয়ে উঠে। মানুষ  আনন্দ পায়, কষ্টও পায়।জাপানী  দার্শনিক বলেছেন - Haruki Murakami বলেছেন -“Memories warm you up from the inside; But they also tear you apart”. JohnBanville বলেছেন “The past beats me like a secondheart”.

আমার শৈশবের অগণিত স্মৃতি গুলির মধ্যেঅন্যতম সেরা স্মৃতি হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়কও বাংলাদেশ এর মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে কাছে থেকে দেখা।  আমার জন্ম ৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৩ ইং তারিখে ফেনী মহকুমার (বর্তমানে জেলা) সোনাগাজী  থানার (বর্তমানে উপজেলা)  ৮ নং আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। স্বাধীনতাযুদ্ধকালে আমি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। সে সময় আমার বয়স ৮ বছর এর একটু বেশী। চতুর্থ শ্রেণীরবার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে সবে মাত্র পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। উপরের শ্রেণীতেউন্নীত হওয়ায় মন তখন আনন্দে ভরপুর। ১৯৭১ এর জানুয়ারীতে পঞ্চম শ্রেণীর ক্লাস শুরু হলোস্কুলে। যতদূর মনে পড়ে এপ্রিল (১৯৭১) এর প্রথম সপ্তাহে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক এসে জানালেনস্কুল অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। তিনি বললেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে দেশে। পাকিস্তানী আর্মিবাংলাদেশে আক্রমন চালিয়েছে। কিন্তু কিসের জন্য যুদ্ধ তা ব্যাখ্যা করলেন না। আমি এবংআমার সমবয়সী যারা গ্রামে জন্মেছি এবং গ্রামের স্কুলে পড়তাম, তারা স্বাধীনতা-পরাধীনতাএ বিষয় গুলি তখন ভাল ভাবে বুঝতে সক্ষম ছিলাম না।

 যা হোক, স্বাধীনতা যুদ্ধকালে দেশেরঅন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় আমাদের এ অঞ্চলেও হানাদার বাহিনী ব্যাপক তান্ডব চালায়। অগণিতলোক: নারী-পুরুষ শিশু-কিশোর ভেদে হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে নিহত হন। এলাকারলোকদের ধরে তারা তাদের ক্যাম্প-এ নিয়ে আসতো। সেখানে নির্মম শারিরীক নির্যাতনের পর গুলিকরে মৃত দেহ রাস্তায় ফেলে রাখতো। বীভৎসভাবে হত্যা করা অনেক লাশ আমিও স্বচক্ষে দেখিছি।অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে তারা এবং নির্বিচারে বাড়ীঘর পুড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুরদিকে এলাকাবাসীর  অসংখ্য গবাদি পশু এবং হাস-মুরগীলুটে নিয়েছে  পাকিস্তান আর্মি ও তাদের এ দেশীয়দোসর  রাজাকার-আল-বদররা। এ অঞ্চলে তাদের প্রধানঘাঁটি ছিল  সোনাগাজী সরকারী  হাসপাতাল ভবন। প্রায় প্রতিরাতে অতর্কিত ভাবে রাজাকারদেরসহযোগীতায় হানাদার  বাহিনী  গ্রামে ঢুকে ঘরবাড়ীতে আগুন দিয়েছে, অবর্ণনীয় নির্যাতন করেছে এলাকাবাসীর উপর। ধর্ষণ-লুট এসব ছিল  তাদের নিত্য অপকর্ম। গুলি করে নির্বিচারেহত্যা করেছে নিরীহ গ্রাম বাসীদের।

 এ সব নির্মম ধ্বংসযজ্ঞে স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা সহয়তা করেছে পাক-বাহিনীকে। হানাদার বাহিনী প্রথম ফেনী  আক্রমণ করে ১৯৭১ এর এপ্রিল মাসে। নয় মাস ব্যাপীদীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধে দেশ মাতৃকার অদম্য অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের কঠোর প্রতিরোধেরসংগে ফেনীর  স্থানীয় জনতার যৌথ  অভিযানে দিশেহারা  হয়ে হানাদার পাক বাহিনী পরাজয়বরণ করে। ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে ফেনী হানাদার মুক্ত হয়।

হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর ১৬ ডিসেম্বর১৯৭১ তারিখে নির্লজ্জভাবে আত্নসমর্পনের  মাধ্যমেস্বাধীন  বাংলাদেশে পূর্ণ বিজয় অর্জিত হয়। ত্রিশলক্ষ শহীদের  রক্ত এবং চার লক্ষ  মা-বোনের সম্ভ্রমের  বিনিময়ে আমাদের এ বিজয় অর্জিতও নিশ্চিত হয়। এভাবে দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের বিভীষিকা শেষে দেশ স্বাধীন হলো। লক্ষ প্রাণেরবিনিময়ে আমরা পেলাম একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরদ্ব্যর্থহীন ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব  বাঙ্গালী  জাতিকে দেশের স্বাধীনতার প্রতি সচেতন ও সাহসী করেতোলে। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতার পক্ষের এ দেশের সর্বশ্রেণীর মানুষ।

 স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে আমরাআবার স্কুলে ফিরে যাই। পঞ্চম শ্রেণী থেকে পুনরায় শুরু করি। মুক্তিযুদ্ধের বছর দেশেরসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের স্কুলও বন্ধ ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের একটি বছর আমাদেরশিক্ষা জীবন থেকে হারিয়ে গেলেও তা নিয়ে আমরা ছাত্র-ছাত্রী কিংবা অভিবাবকদের কোন আপসোসবা হতাশা ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বাঙ্গালী জাতির অর্জিত স্বাধীনতার  গৌরব-ই হয়ে উঠে মহান এবং অনবদ্য । সময় গড়িয়ে যায়।যথা নিয়মে ১৯৭২ সালে পঞ্চম শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৭৩ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে আমাদেরগ্রামে যুদ্ধোত্তর স্বল্প সময়ের মধ্যে নব প্রতিষ্ঠিত সোনাপুর জুনিয়র হাই স্কুলে ভর্তিহই। সে সময় আমার বয়স ছিল ১০ বছর।

 ৭ মার্চ ১৯৭৩ তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশেরপ্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়। নির্বাচনের আগে তথা  ১৯৭২ এর অক্টোবর হতে ১৯৭৩ এর ফেব্রুয়ারী এ সময়েরমধ্যে কোন এক দিন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশবাসীর পাশে থাকার ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর ফেনীসফরের ঘোষণা আসলো (তারিখটি মনে করতে পারছিনা বলে আমি দুঃখিত)। সারা অঞ্চলের মানুষেরমধ্যে উল্লাস-উদ্দীপনা। সারা ফেনী, নোয়াখালী, মিরশরাই এবং নিকটস্থ এলাকার মানুষের মধ্যেবঙ্গবন্ধুকে দেখা আর তাঁর কথা শোনার অধির-অদম্য আগ্রহ বর্ণনাতীত। অনেককে বলতে শুনেছিআমাদের নেতা আসছেন, দেখতে  যাব। বঙ্গবন্ধু আসছেনএ উচ্ছ্বাসে ফেনীর এবং আস-পাশের জেলার মানুষ নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন। কখন তিনি আসবেনএ উত্তেজনায় সারা অঞ্চল অপেক্ষমান।

 বঙ্গবন্ধু ফেনী আসছেন, সভা করবেনএবং সভার স্থান নির্ধারিত হলো ফেনী পুরাতন এয়ারপোর্ট। ফেনী শহরের অদূরে বারাইপুর, সুলতানপুর,মজলিসপুর, ধর্মপুর এলাকা গুলির অংশ নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীর  বিশেষতঃ ব্রিটিশদের বোমারু বিমান গুলির উঠানামার/জ্বালানী গ্রহন এর সুবিধার্থে এয়ারফিল্ডটি  তৈরি করা হয়েছিল বলে শুনেছি। এটি ফেনী  অঞ্চলে পুরাতন এয়ারপোর্ট  হিসেবেই বহুল পরিচিত।

 বঙ্গবন্ধুর ফেনী আসার দিন যতই ঘনিয়েআসছিলো ততই মানুষের আগ্রহ এবং উত্তেজনা আরও জোরালো হচ্ছিলো। ফেনীর পার্শ্ববর্তী যেসব গন্তব্যের সাথে ফেনীর বাস যোগাযোগ ছিল (সে সময় মুড়ির টিন বলা হতো ঐ বাস গুলিকে)।সে সব বাসের মালিকরা ঐ দিনের জন্য ভাড়া না নেয়ার ঘোষণা দিলেন। অর্থাৎ ফ্রি সার্ভিসদিলেন। আমার ভিতরে বঙ্গবন্ধুকে দেখার যে  অদম্যআকাঙ্খা-উচ্ছ্বাস তা  লিখে ব্যক্ত করার ক্ষমতাআমার নেই। বঙ্গবন্ধুকে দেখতে ফেনী যাওয়ার বায়না ধরলে আমার মা বললেন তুই ছোট মানুষ-যাবিনা।মানুষের পায়ের নিচে পড়ে মরে যাবি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়েজামাটি কাঁধে নিয়ে লুঙ্গি পরে  গ্রামের আরও৫/৬ জন সাথীদের নিয়ে পায়ে হেঁটে অত্যন্ত ভোরে রওয়ানা হলাম ফেনীর উদ্দেশ্যে। আমাদেরসিদ্ধান্ত ছিল মতিগঞ্জ থেকে বাসে উঠে  ফেনীযাব। কিন্তু মতিগঞ্জ এসে দেখি অগণিত মানুষ ফেনী যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসের  জন্য অপেক্ষমান, কিন্তু কোন উপায় ছিল না বাসে উঠার।প্রতিটি বাস ভেতরে এবং ছাদে সভায় গমনকারীদের বহন করছিলো। হাজারো লোক পায়ে হেঁটেও ফেনীযাচ্ছে। রাস্তায়ও ছিল প্রচন্ড ভিড়। আমরাও উপায়ান্তর  না দেখে ফেনীর উদ্দেশ্যে হেঁটে চললাম।

 

আমাদের বাড়ী থেকে ফেনীর দূরত্ব প্রায়১২ মাইল। এ দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে আসলেও ক্লান্তি আমাদেরকে ততটা গ্রাস করতে পারেনি। আনন্দচিত্তেফেনী থেকে পুনরায় আমরা ক’জন হাঁটা শুরু করলাম পুরাতন এয়ারপোর্ট অভিমুখে, যা ফেনী শহরেরঅদূরে আনুমানিক ২ কি:মি: উত্তরে। সে সময় ফেনী মহকুমা শহরের আয়তন আজকের ফেনী জেলার মতোএতটা ব্যাপক ছিলো না। এয়ারপোর্টের  এক অংশেএখন একটি মহিলা ক্যাডেট কলেজ  প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।বাংলাদেশের ৩টি  মহিলা ক্যাডেট কলেজের ১টি ফেনীতে।

 আমরা এয়ারপোর্ট এর দিকে এগোচ্ছিলাম।  নিকট  দূরত্বথেকে জয়বাংলা স্লোগানের তরঙ্গ আসছিল আমাদের কানে। এ স্লোগান আমাদের ক’জনের মনের  মধ্যেও উত্তেজনা  সৃষ্টি করছিল।  অবশেষে পৌঁছলাম এয়ারপোর্ট-এ। জীবনে প্রথম কোন এয়ারপোর্টদেখা, যদিও পরিত্যক্ত। কোন উড়োজাহাজ নাই। কিন্তু জনতায় পরিপূর্ণ পুরো এয়ারপোর্ট। একপ্রান্তে  ২/৩ টি একতলা অতি পুরাতন ভবন ছিল।মাঠের যতটুকুন দেখেছি তা ছিল ব্রিক সলিন করা। বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষ্যে এয়ারপোর্টটিসমতল করতঃ তাতে ব্রিক সলিন করা হয়েছে বলে মনে হলো তখন।

 মুহুর্মুহু  জয়বাংলা স্লোগানে এয়ারপোর্টের  ঐ বিশালময় এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছিল। তিল ধারণের ঠাঁইছিলনা কোথাও। সাহস করে সম্মুক্ষে এগুতে থাকি সভাস্থলের দিকে। কিন্তু দূরূহ ছিল অগ্রসরহওয়া। অগণিত মানুষের বর্ণনাতীত ভীড়। বয়সে ছোট হলেও চিকন-চাকন  গঠনের শরীর। গ্রামে থাকার কারণে শরীর ছিল টানটান,তুলনামূলক ভাবে শক্ত। একটু একটু করে  ভিড়ের  মধ্য দিয়ে এগুতে থাকলাম। কিন্তু আমার সাথীদের থেকেবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। যা হোক, মঞ্চের খুব কাছে যেতে না পারলেও সামনে এগিয়ে এসে একটাজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লাম, যেখান থেকে মঞ্চ এবং বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায়। কিন্তু সেটাও সহজছিল না। এগুতে গিয়ে সাদা পোষাক ধারী নিরাপত্তা বাহিনীর থাপ্পড় এবং মাথায় চুলটানা খেয়েছিলামঅনেকবার। বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টার থেকে নেমে প্রথমে যে রুমে বসেছিলেন তা থেকে সভার মঞ্চটিক্ষানিকটা দূরেই ছিল। ওয়েটিং রুম থেকে সভামঞ্চ পর্যন্ত একটি ক্ষণস্থায়ী  রাস্তা বানানো হয়েছিল। যার দু’পাশে বাঁশের খুঁটিদিয়ে বেড়া দেয়া হয়েছিল। যখন বঙ্গবন্ধু তাঁর এক পাশে ফেনীর আওয়ামীলীগ নেতা জনাব খাজাআহমদ (প্রয়াত) এবং অন্য পাশে জনাব এ.বি.এম তালেব আলী (প্রয়াত) কে সাথে নিয়ে মঞ্চেরদিকে এগোচ্ছিলেন, তখন প্রাণ খুলে মুগ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখলাম যতক্ষণ নাতিনি মঞ্চে পৌঁছান। দেখলাম-মন জুড়ালো। দীর্ঘ ও সুস্বাস্থের অধিকারী বঙ্গবন্ধুর চেহারাথেকে যেন তেজস্বী ও মায়াবী দ্যূতি ছড়াচ্ছিল। যতদূর মনে করতে পারছি তাঁর পরনে ছিল সাদাধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবী, উপরে কালো রঙের “হাফ-কোট” যা পরবর্তীতে মুজিব কোর্ট হিসেবেসুপরিচিতি লাভ করে এবং বঙ্গবন্ধুর পোশাক বিধায় এটির অনন্য মর্যাদা পায়। পেছনের দিকেআছড়ানো সাদা-কালো ঘন চুল সমেত একজন তেজী ও ত্যাগী নেতার সদর্প পদক্ষেপ যেন কথা বলছিলযেন বলছিলো-আমি তোমাদেরই লোক, তোমাদের কাছেই এসেছি। যতই দেখছিলাম মুগ্ধ, বিমোহিত  এবং বিনয়াবত হচ্ছিলাম। তাঁকে দেখার এ দৃশ্য আমৃত্যুআমার হূদয়ে খোদিত হয়ে থাকবে, যেমনটি আজও রয়েছে ৪৮ বছর পরেও। সভা মঞ্চে ফেনী আওয়ামীলীগেরসিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং ফেনী অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকগণসহ মুক্তি যোদ্ধা কমান্ডারগণও অন্যান্য  নেতৃবৃন্দ  উপস্থিত ছিলেন। সে সময়ের বয়সের কারনে তাঁদেরকে চিনতেবা জানতে আমি সক্ষম হয়নি। আমি যতদূর মনে করতে পারছি মূল সভাটি প্রায় দেড় ঘন্টা ব্যাপিচলেছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় পুরো এলাকাতে নিরবতা-নিস্তদ্ধতা নেমে আসে। সভা শেষেজয় বাংলা স্লোগানে  উল্লাস প্রকাশ করতে করতেসভাস্থল ত্যাগ করতে থাকে জনতা। এত লোকের সমাগম ছিল যে, কত সময় লেগেছিল সমবেতদের সভাস্থলথেকে প্রত্যাগমনে তা বলা মুশকিল।

 আমি এবং আমার ক্ষুদে সঙ্গীরাও একত্রিতহয়ে পুনরায় পায়ে হেঁটে  বাড়ীর দিকে রওয়ানা করলাম।উল্লেখ্য যে, মূল সভায় প্রবেশের পূর্বেই আমরা ক্ষুদে বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলেঠিক করে নিয়েছিলাম যে, যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই তাহলে সভা শেষে আমরা একটা নির্দিষ্ট জায়গায়একত্রিত হবো। সে ভাবে আমরা এয়াপোর্টের পশ্চিম দিকে (যতদূর মনে পড়ে) প্রবেশ পথে একটিজায়গা নির্দিষ্ট করে রেখে গিয়েছিলাম। মূল সভা শেষে আমরা সে নির্দিষ্ট জায়গায় দীর্ঘক্ষণপর একেকজন করে একত্রিত হই।  এয়ারপোর্ট থেকেফেনী শহর, তারপর ফেনী থেকে সোনাগাজী  বাজারহয়ে শেষতক সন্ধ্যায় বাড়ী পৌঁছাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখা এবং জনতার বিশাল সমাবেশ ওআনন্দে সমৃদ্ধ এ  মহাদৃশ্য থেকে মনকে সরাতেপারছিলাম  না। পুরো ঘটনাটি  মনকে বারংবার প্রচন্ড নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো। এ বিষ্ময়করসমাবেশ, বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা শ্লোগান, জনতার উল্লাস সবকিছু আমার ভেতরটাকে নাড়া দিয়েযাচ্ছিলো সজোরে। কেমন যেন বিপ্লবী চেতনা জাগছিল মন ও শরীরে।

 শেষে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়।ফেনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা যুদ্ধে রাখা ফেনীর অনবদ্যঅবদান অতীব বিশাল ও বিস্তৃত। শ্রীমান নবীনচন্দ্র সেন এর হাত ধরে  নূতন রূপ লাভ করা  এবং বঙ্গবন্ধুর আশির্বাদপুষ্ট  এ ফেনী এখনো তার সকল কৃষ্টি ও ঐতিহ্য লালন করে যাচ্ছে।অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আন্দোলন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষাআন্দোলন, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, বাংলা ভাষা,ক্রীড়া, নাটক  ইত্যাদীতে ফেনীর তথা ফেনী অঞ্চলেরপ্রথিতযশা বিজ্ঞ ও নিবেদিত প্রাণ নেতৃবর্গ এবং জনতার অংশগ্রহন ও অবদান অবিস্বরনীয়  এবং অতুলনীয়। ফেনীর এসব অবিস্বরনীয় অবদান ও বিজ্ঞজনদের বিষয়গুলি এ লেখায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অত্র লেখাটিতে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর ফেনী সফরের বিষয়টিতে সীমাবদ্ধ।

 

জননেতা সর্বজনাব খাজা আহমদ এবং এ.বি.এমতালেব আলী কে আমরা চিনতাম। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে তাঁরা আমাদের সোনাগাজী এলাকায়এসে বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মী-সমর্থক, সমাজ সেবক ও মুরুব্বীদেরসাথে সভায় মিলিত হতেন। শ্রদ্ধেয় জনাব খাজা আহমদ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ফেনীর ২১ সদস্যবিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান এবং শ্রদ্ধেয় এ.বি.এম তালেব আলী  ছিলেন ঐ পরিষদের সদস্য। ফেনীতে সে সময় ছাত্রলীগও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে আরও একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে তাদেরঅবদানও অপরিসীম।  ১৯৭৩ এর সাধারণ নির্বাচনেজনাব খাজা আহমদ তৎকালীন নোয়াখালী-২ আসনে এবং জনাব এ.বি.এম তালেব আলী নোয়াখালী-৩ আসনেবিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। নোয়াখালী-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেনফেনীর অপর এক কৃতি সন্তান প্রথিতযশা  সাংবাদিকএ বি এম মুছা। আমাদের  গ্রামটি ছিল বৃহৎ এবংভোটারের সংখ্যাও  ছিল অধিক । ১৯৭৩ এর  নির্বাচনী প্রচারণার জন্য তাঁরা দু’জন একত্রে আমাদেরএলাকায় তথা সোনাপুর গ্রামেও একাধিকবার এসেছিলেন। নৌকা তথা আওয়ামীলীগ সমর্থকরা নৌকাপ্রতিক নিয়ে তাঁদের সাথে মিছিল করতো। মিছিলের সামনে তাঁরা দুই জনই থাকতেন। আমরা ছোটছোট ছেলেরা জয়বাংলা স্লোগান তুলতাম  সবার সংগে।

 সেই সময় একাধিকবার তাঁদের দেখার সুযোগহওয়ায় - জনাব খাজা আহ্মদ এবং জনাব এ.বি.এম তালেব আলী কে আমরা ভালভাবে চেনার সুযোগ হয়েছিল।স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ফেনী সফর এবং ফেনী সভার মঞ্চে তাঁরা উপস্থিত ছিলেন।  উপরাংশে আমি উল্লেখ করেছি যে, বঙ্গবন্ধুর ফেনী আসারদিনক্ষণটি আমার পক্ষে মনে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে আমি দৃঢ়ভাবে আশাপোষণ করি যে, বঙ্গবন্ধুরস্বাধীনতা উত্তর ফেনী আগমনের দিন-তারিখটি অচিরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফেনী জেলা আওয়ামীলীগেরসাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমান সাংসদ (এমপি) জনাব নিজামউদ্দিন হাজারী এর বলিষ্ঠ ও সুদক্ষনেতৃত্বাধীন ফেনীর রাজনীতি এখন সুসংগঠিত এবং সুস্থিতিশীল। তাঁর বিজ্ঞ নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুরফেনী সফরের বিষয়টিকে  স্বরণীয় করে রাখার জন্যেওএমপি মহোদয় উদ্যোগ গ্রহন করবেন বলে আমি আশা করি। কেননা ইতোমধ্যে তার অবদানে ফেনীর সর্বঅঞ্চলেস্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্ন গুলি সুরক্ষিত হয়ে আসছে।

লেখকঃ- নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশব্যাংক, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা।

E-mail:abul.kalamazad@bb.org.bd  , azad30.abulk@gmail.com

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ