বৃহস্পতিবার , ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭

সুদাম চন্দ্র, নওগাঁ থেকে ঃ
নওগাঁর খরা পীড়িত ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র অঞ্চলে রান্না-খাবারসহ দৈনন্দিন প্রতিটি কাজেই ভরসা একমাত্র পুকুর আর কুপের পানি। তাও ফুরিয়ে যায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে। বছরের ৯ থেকে ১০ মাস এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। শুরু হয় পানির জন্য হাঁহাঁকার। শত বছরের প্রাচীন এই দূর্ভোগ লাঘবে আশার আলো ছড়াচ্ছে স্থানীয় এমপির নেতৃত্বে সম্মিলিত উদ্যোগে স্থাপিত‘কমিউনিটি পানি সরবরাহ প্রকল্প’। আবার পানি সরবরাহ এই প্রল্পের আওতায় একজন মানুষ মাত্র ৩টায় মাস জুড়ে অনায়াসে পাচ্ছেন বিশুদ্ধ পানি। এতে করে বরেন্দ্র এলাকার চির চেনা দুঃসহ চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। 
জানা গেছে, জেলার পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলার আংশিক এলাকা ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকা হিসাবে পরিচিতি। এসব এলাকার ভুগর্ভস্থ ২শ থেকে ৩শ ফুট অভ্যন্তর পর্যন্ত রয়েছে কঠিন শিলা পাথরের স্তর। এর নিচে রয়েছে পানির স্তর। সাধারণ নলকূপ বসিয়ে বর্ষাকালে পানি পেলেও অন্য সময়ে এক ফোঁটা পানিও পড়ে না এসব নলক’প থেকে। পানি সংগ্রহে যুদ্ধ নামতে হয় এসব এলাকার মানুষদের। বিশেষজ্ঞদের মতে  ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবেই এ সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রতি বছরই প্রকোপ হচ্ছে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট। খরা মৌসুমে এ অঞ্চলের নারী-পুরুষদের পানি সংগ্রহে ছুটতে হতো গ্রাম থেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে গভীর নলক’পের দিকে। কোথাও বড় দিঘী অথবা পুকুরে যেতে হতো তাদের। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই পানি সংগ্রহেই চলে যেত দিনের অর্ধবেলা। কখনো কখনো বাধ্য হয়ে এলাকার ডোবা-নালার পানি ব্যবহার করতে হতো তাদের। এতে করে পানি বাহিত নানা রোগের প্রকোপও ছিল বরেন্দ্র এলাকার যত্রতত্র। 
 ঠিক সেই মুহূর্তে ২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসে জেলার সাপাহারে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রথম স্থাপন করা হয় কমিউিনিটি বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ প্রকল্প। স্থানীয় এমপি মুক্তিযোদ্ধা বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার এর ব্যক্তিগত উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, এলজিইডি বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অর্থায়নে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্রামে সাবমারসিবল মটরের সাহায্যে প্লাস্টিকের ট্যাংকি উচু স্থানে স্থাপন করে পাইপ লাইনে ট্যাপকল বসিয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি পাইপ লাইনের মাধ্যমে নিজ নিজ উদ্যোগে বাড়ির উঠানেও পানি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই সরবরাহে শুধু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বাড়তি কোন অর্থ পানির জন্য দিতে হচ্ছে না। পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুয়ায়ী এই অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এতে করে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাসে ৩ থেকে ৪ টাকা করে খরচ পড়ছে। 
প্রাথমিক অবস্থায় জেলার সাপাহার উপজেলার ৫০টি গ্রামে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে। আরো ১০০টি প্রকল্প চালু করার জন্য উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানান। মাত্র ৩ টাকায় মাস জুড়ে পানি পেয়ে এলাকাবাসীর কাছে এই প্রকল্প অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আবার পানির কোন অপচয়ও নেই। কারণ উদ্যোক্তারা প্রতিটি ট্যাংকির পাশেই পৃথক আরো একটি পাইপ বসিয়েছেন। ট্যাপ হতে অতিরিক্ত পানি সেই পাইপ দিয়ে আবারো ভুগর্ভস্থ গিয়ে ফ্লিটার হয়ে সেই পানি চলে আসছে মূল পাইপে।
উপজেলার গোডাউনপাড়া, কাবুলপাড়া, তুড়িপাড়া, তাজপুর পশ্চিমপাড়া, তাজপুর পূর্বপাড়া, তেহরিয়া, খোট্টাপাড়া, মানিকুড়া, দিঘীপাড়া, কল্যানপুর, মালিপুর, বড়ডাঙ্গা, ভিকনা ও ইসলামপুরসহ স্থাপিত পানি সরবরাহ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা দেখা গেছে এসব এলাকার মানুষ এখন অনায়াসে বিশুদ্ধ খাবার পানি পাচ্ছে। কেউ ট্যাংকির নিচে প্রধান ট্যাপকল থেকে গ্রামের গৃহবধূরা পানি সংগ্রহ করছে কেহ বাড়ির উঠানেই ট্যাপকলেই পানি নিচ্ছে। এসময এসব নারীদের চোখে-মুখে ছিল হাসির ঝিলিক।
 নওগাঁর সীমান্ত ঘেষা খোট্টাপাড়া গ্রামের স্কুল শিক্ষিকা সানজিদা বেগম। গ্রামে কোন টিউবওয়েল না থাকায় তার দায়িত্ব প্রতিদিন তিন বেলা কূপ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হতো। চৈত্র-বৈশাখে কূপের পানিও পাওয়া যায় না। তখন ৩-৪ কিলোমিটার দূরে গভীর নলক’প অথবা বড় দিঘী থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এখন সেই পানি হাতের কাছে পাচ্ছি। এরচেয়ে বড় আর কি পেতে পারি। তিনি উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। 
 ভিকনা গ্রামের কমিউনিটি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের গ্রাহক ৭৫ বছরের বৃদ্ধ আলহাজ্ব ওয়াজেদ আলী জানান পুকুর-ডোবার পানি খেয়ে জীবন ধারন করে আসছি। আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম যে আমরা বিশুদ্ধ খাবার পানি পাব। শত বছরের এই প্রাচীন দুর্ভোগ বাব-দাদাসহ আমাদের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। তিনি বলেন বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে গ্রামে গ্রামে কলেরা, ডায়রিয়া, বসন্তে অনেক লোক মারা গেছে। কিন্ত আমরা কিছু করতে পারিনি। বর্তমানে এই প্রকল্পের পানি শুধু খাবার হিসাবেই ব্যবহার হচ্ছে না। তিনি জানান গ্রামের অনেক জমিতে রবি ফসলের আবাদেও এই পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। 
 একই কথা বলেন ইসলামপুর গ্রামের ৮০ বছরের বৃদ্ধ কেয়াম উদ্দিন মন্ডল, তার স্ত্রী খোদেজা বিবি। ইসলামপুর গ্রামের যুবক জিয়াউর রহমান বলেন আমাদের গ্রামে ২৫ থেকে ৩০ পরিবার রয়েছে। প্রত্যেক পরিবারেই এই পানি ব্যবহার করছে। প্রতি মাসে যে বিদ্যুৎ বিল আসে। সেটা পরিবারের সদস্য সংখ্যা দিযে ভাগ করে যে টাকা পাওয়া যায়। সেই টাকায বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়। এতে দেখা গেছে প্রতি সদস্যকে ৩ থেকে ৪ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। 
সাপাহার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম শাহ চৌধুরী বলেন, গত ১০ বছরের এক হিসাবে দেখা গেছে উপজেলার গ্রাম গুলোতে স্থানীয় জন স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ থেকে যত নলক’প স্থাপন করা হয়েছে। তার ৭০ ভাগ নলকূপই  গায়েব হয়ে গেছে। যেগুলো আছে তাতে পানি পাওয়া যায় না। এই খাতে যা ব্যয় হয়েছে তাতে সরকারের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হয়নি। 
তিনি আরো বলেন স্থানীয় এমপি সাধন চন্দ্র মজুমদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমপির নিজস্ব তহবিল, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ, জনস্বাস্থ প্রকৌশল, এলজিইডির যৌথ অর্থায়নে মাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায় এই প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে সাড়ে ৪’শ ফিট পর্যন্ত গভীরে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মোটর বসিয়ে উঁচু ট্যাংকির মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে পানি। যার সুবিধা পেতে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য মাসে দিতে হয় মাত্র ৩ থেকে ৪টাকা পর্যন্ত। 
 নওগাঁ সাপাহার কলেজ অধ্যক্ষ পরিবেশবিদ মজিবুর রহমান বলেন ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির এরকম একটি সুযোগ করে দেওয়া নি:সন্দেহে একটি উত্তম কাজ। তবে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানিয়-জলের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
নওগাঁ-১ (পোরশা-সাপাহার-নিয়ামতপুর) এলাকার সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন এলাকার বিশুদ্ধ খাবার পানির দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনা মোতাবেক যৌথ প্রচেষ্টায় গ্রাম এলাকায় কমিউনিটি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় উপজেলার ৫০টি গ্রামে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে। সংদীয় এলাকার আরো ১০০টি গ্রামে এই প্রকল্প স্থাপনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলসহ অন্যান্য উপজেলাতেও এই ধরনের প্রকল্প চালু করার জন্য ইতিমধ্যে প্রকল্পটির ডিজাইন করে পাঠানো হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নিদের্শনা পাঠিয়েছেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার পানি সরবরাহে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ