শনিবার , ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ |

শতবর্ষে বঙ্গবন্ধু: ওষ্ঠসেবা নয়, প্রয়োজন নিবিড় জীবনপাঠ ও সচেতন অনুসরণ

শিশির ভট্টাচার্য্য   সোমবার , ০৯ নভেম্বর ২০২০

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭৪। ছবি: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

জাতি-রাষ্ট্র-সরকার – আজ যতই আমাদের যাপিত জীবনের অপরিহার্য অংশ বলে মনে হোক, শ তিনেক বছর আগেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব দৃশ্যমান ছিল না বিশ্বের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের আগে রাজারাণীদের শাসনে কমবেশি সুখে-শান্তিতে বসবাস করত বিভিন্ন জাতি ও ধর্মগোষ্ঠী। কোনো গোষ্ঠীর সদস্য-সংখ্যা কত বেশি বা কম – এই তথ্য বা সত্যের খুব বেশি ভূমিকা ছিল না সে যুগে, গোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণে।

কিন্তু জাতিরাষ্ট্র গঠিত হতে শুরু হওয়ার পর থেকে পুরনো বাতাবরণ পাল্টে গেল। তখন থেকে সদস্য-সংখ্যার ওপর নির্ভর করে গোষ্ঠীগুলোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে চলেছে। কেক ছোট, খানেওয়ালা বেশি। আমি সংখ্যাগুরু, কেকের বেশিরভাগটা আমিই খাবো – তুমি সংখ্যালঘু, তোমাকে কিসসু দেব না। সংখ্যালঘু বিনাপ্রতিবাদে মেনে নিলে সাধারণত তেমন সমস্যা নেই। অন্যথায় লঘুড়াঘাতে সংখ্যালঘুর জীবন অসহনীয় করে তোলে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়, দেশে-বিদেশে, পৃথিবীব্যাপী। সরকারগুলো বাধ্য হয়ে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সংখ্যাগুরুর পক্ষে থাকে, কারণ এখনও এই ‘কুসংস্কার’খানা বলবৎ রয়েছে যে সরকার গঠিত হয় জনমতের ভিত্তিতে। অতি সংক্ষেপে এই হচ্ছে দেশে দেশে ‘আন্তঃজাতিক’ সম্পর্কের টানাপোড়েন।

যেকোনো রাষ্ট্রেই বহু গোষ্ঠীর বসবাস। এর মধ্যে যে গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো সংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, সেই সেটির বা সেগুলোর সদস্য সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারলে – সে হত্যা করেই হোক, কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দেশছাড়া করেই হোক, নিজেদের গোষ্ঠীর স্বার্থ নিরঙ্কুশ হয়। পাঞ্জাবে কিংবা বাংলায় যেভাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়েছিল, দক্ষিণ ভারতে সেভাবে হয়নি, কারণ দক্ষিণ ভারতে মুসলমানের সংখ্যা ১০% ভাগেরও কম। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা এখনও চলমান বিচ্ছিন্নভাবে, সারা ভারতবর্ষে। জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে গোষ্ঠীদাঙ্গা অঙ্গাঙ্গী জড়িত – অন্ততপক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার মতো অশিক্ষিত, পশ্চাদপদ মনমানসিকতার অঞ্চলে।

গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তির দুই প্রধান নিয়ামক – সাদৃশ্য এবং পার্থক্য। উভয়েই মুসলমান – ধর্মের এই সাদৃশ্যের উপর ভিত্তি করে পশ্চিমের পাঞ্জাবি এবং পূর্বের বাঙালি নিখিল ভারতের হিন্দুর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েম করেছিল। তথাকথিত স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাস পরেই পরিষ্কার হতে শুরু করেছিল, বাঙালি মুসলমান যাকে ‘স্বাধীনতা’ মনে করেছিল, সেটা মূলত ছিল ‘প্রভূবদল’ – নতুন এক ধরনের পরাধীনতা। বাঙালি চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য: অবিমৃষ্যকারীতা – ভেবে কাজ না করা এবং কাজ করে হায় হায় করা! অচিরেই ধর্মের সাদৃশ্য চাপা পড়ে গেল, উজ্জ্বলতর হয়ে উঠল ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য। এই পার্থক্যের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ, অবশ্যই বহু ত্যাগ, মৃত্যু, অশ্রু ও সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে।

ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং নিউ টেস্টামেন্ট – দুটি আলাদা পুস্তকের সমষ্টি বাইবেল। দুই আলাদা মহামানবের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল এই দুটি পুস্তক। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ – বাঙালি মুসলমানের আত্মোপলব্ধি এবং স্বাধীকার আন্দোলনের দুটি ক্রমধারার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশের তিনি একমাত্র প্রতিষ্ঠাতা-নায়ক। চার দশক ব্যাপী বহু চড়াই-উৎড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, বহুবিধ দুঃসহ শারিরীক-মানসিক পীড়ন সহ্য করে বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যতকাল বাংলাদেশ রাষ্ট্র বজায় থাকবে, ততকাল তিনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন, একা এবং অদ্বিতীয় হয়ে – বঙ্গবন্ধুর জাত শত্রুরাও হয়তো এই সত্যে আর সন্দেহ প্রকাশ করে না।

কেন বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠাতা নায়ক বলছি? বলছি, কর্তাভজার কারণে নয়, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে, পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো মনোযোগ দিয়ে পাঠ করার পরেই। ভারতবর্ষে বাঘ শিকারের নিয়মটা হচ্ছে এরকম: মাচা বাঁধতে হয়, কিল অর্থাৎ আধ-খাওয়া গরু-ছাগল আশেপাশে রাখতে হয় বাঘকে আকৃষ্ট করার জন্যে, লোকজন লাঠি দিয়ে ঝোপঝাড়ে পেঠাতে থাকে মানুষখেকো বাঘকে শিকারির কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য। বহু লোক বহু কাজে জড়িত থাকে এবং সে কাজগুলো একটাও ফেলনা নয়। কিন্তু বাঘকে গুলিটা যে করে, বাঘ শিকারের সম্মানটা তাকেই দিতে হয়। আনুসঙ্গিক কাজগুলো অপরিহার্য ছিল তো বটেই, কিন্তু একজন শেখ মুজিবকে ছাড়া পাকিস্তানি বাঘ কিছুতেই যে মরত না – তা পাকিস্তানিরা জানত বলেই প্রথম সুযোগেই তারা তার ওপরই প্রতিশোধ নিয়েছে।

শেখ মুজিব কিংবা বেগম মুজিবের মতো ব্যক্তিত্ব বাংলা কিংবা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় জন নেই – এটা আমার দাবি। বঙ্গবন্ধুর নিজের নেতা যারা ছিলেন, তাদের একজনের সঙ্গেও আমি তার চরিত্রের মিল দেখতে পাই না। প্রথমে আসি জিন্নাহর কথায়। বরাহমাংস সহযোগে হুইস্কি খাওয়া শুধু নয়, জিন্নাহ চরিত্রের একটি বড় দোষ, ব্যারিস্টার মানুষ তিনি, মুখের উপর মিথ্যা কথা বলতে পারতেন। ইসলামে মিথ্যাকে ‘উম্মুল গুনাহ’ বলা হয়েছে। তার একটি মিথ্যা: States-কে ‘টাইপের ভুল’ বলে উপমহাদেশে একটি মাত্র মুসলিম-প্রধান রাষ্ট গঠন করার খেসারত দিয়েছে বাঙালি – চব্বিশ বছর ধরে নির্যাতন-শোষণ এবং অবশেষে ৩০ লক্ষ শহীদ ও অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমহানি। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা জিন্নাহর আরেকটি মারাত্মক (ভুল নয়!) অপরাধ। শেখ মুজিব ছিলেন খাঁটি মুসলমান। মদ স্পর্শ করতেন না। মৃত্যু সম্পর্কে অকুতোভয় ছিলেন। নিশ্চিত বিশ্বাস করতেন, মুসলমানের মৃত্যু একবারই হবে। মিথ্যা বলা দূরে থাক, সত্যও গোপন করতেন না। সোজা কথার মানুষ ছিলেন তিনি। যা মনে আসত, যা ভাবতেন, তাই বলতেন।

নূরুল আমিন, নাজিম উদ্দীন, মোনায়েম খান শুরু থেকেই বাঙালি-বিরোধী এবং পশ্চিমাদের পা-চাটা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে আজীবন কষ্ট দিয়েছেন এই তিন নেতা। শেরেবাংলা এবং মাওলানা ভাসানী উভয়েই ছিলেন দোদুল্যমান চরিত্রের লোক। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না, কানকথা শুনতেন। ভাসানী তো আইউব খানের কড়া সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। শেরেবাংলা নিজের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্যে ঘন ঘন দল বদলাতেন। ভাষা আন্দোলনে একটি কথাও বলেননি শেরেবাংলা শ্রেফ নিজের চাকরিখানা বাঁচাতে। জীবনের শেষে চরম অপমানিত হয়ে তিনি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ ত্যাগ করেন, একান্তই নিজের হীন স্বার্থবুদ্ধির কারণে।

সোহরাওয়ার্দী পশ্চিম পাকিস্তানীদের অন্যতম দাবি: ‘প্যারিটি’ অর্থাৎ দুই পাকিস্তানের সমান সাংসদ সংখ্যার দাবিকে সমর্থন করতেন। এই দাবি একান্তই বাঙালি-বিরোধী – বঙ্গবন্ধু বার বার লিডারকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কারণ প্যারিটি প্রতিষ্ঠিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাঙালি নিখিল পাকিস্তানে সর্বাধিক আসন পাবে না। জিন্নাহ প্যারিটির বিপক্ষে ছিলেন, কারণ প্যারিটির ধারণা পাকিস্তানের ঐক্যের বিরুদ্ধে যায়। জীবনের শেষে সোহরাওয়ার্দী পুরোপুরি সামরিক জান্তার খপ্পরে পড়ে যান এবং অবশেষে বৈরুতের হোটেলে তার করুণ মৃত্যু হয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ১. দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, ২. অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং ৩. প্রচণ্ড সাহস – সদগুণের এই ত্রিবেণীসঙ্গম এক শেখ মুজিব ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো নেতার চরিত্রে দৃশ্যমান হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যাবতীয় অপূর্ণতা সত্তেও বঙ্গবন্ধু উপরোক্ত সব নেতাকেই যোগ্য সম্মান করতেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও চরিত্র পাঠের প্রয়োজন কেন? আমরা কেউ কি আদৌ তার মতো হতে পারব? পারবে কি তার উত্তরাধিকারীরাও? ১৯৭৫ সালের পর এমন একজন নেতাও কি আমরা দেখেছি বাংলাদেশে, দেশপ্রেম ও চরিত্রের দিক থেকে যিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তুলনীয়? অনন্য বলেই মুজিব-জীবনী অবশ্যপাঠ্য। শ্রেফ ‘বঙ্গবন্ধু’ নামক চরিত্রটির সৌন্দর্য্য ও অনন্যতা আস্বাদনের জন্যেই বঙ্গবন্ধুর জীবনপাঠ অপরিহার্য। দোষ কি ছিল না তার চরিত্রে? তিনি কি ভুল সিদ্ধান্ত নেননি কখনও? চন্দ্রেও কলঙ্ক থাকে। ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে। উছলে পড়ে আলো।’ চন্দ্রের গুরুত্ব বিচার করার সময়ে কলঙ্ক ঘাঁটলে চলে না। দেখতে হয়, কলঙ্ক ছাপিয়ে ‘চাঁদের হাসির কতটা বাঁধভাঙা আলো উছলে পড়ছে’ চরাচরে।

কোনো বাঙালি কখনও বঙ্গবন্ধুর মতো হতে পারবে – এমনটা আমারও মনে হয় না। কেউ কারও মতো হয় না – এটা ঠিক, তবু বাঙালির ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে, গোপন, নোংরা খানাখন্দের ভেতর থেকে, একেকজন খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দীন ঠাকুরের চোরা চাউনি চোখে পড়ে বৈকি। ফারুক, ডালিম গং ইদানীং ঘাপটি মেরে আছেন বটে, কিন্তু তারা আছেন, সুযোগ পাওয়া মাত্র কিলবিল করে বিষধর সাপেরা বেরিয়ে আসবে। তাজউদ্দিনরা বিরল, কিন্তু দুর্লভ নন। নাম নাই বা নিলাম, আজ এ দলে, কাল ও দলে, পরশু কোন্দলে যোগ দেন – এমন শত শত বামপন্থী নেতা গিজগিজ করছে বাংলাদেশে। কিন্তু শেখ মুজিব – সেই একজনই ছিলেন, আছেন, থাকবেন। বর্তমানের কোনো নেতা তার ধারে কাছেও নেই এবং ভবিষ্যতেও কেউ থাকবেন – এমন আলামত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু এতটাই মহান এবং এতটাই অনন্য যে তার রক্তের উত্তরাধিকারীরাও পুরোপুরি তাকে ধারণ করতে পারে না।

বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছাকে যে আমরা পাত্তা দিই না তার প্রমাণ চোখের সামনে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর দেশগড়ার ডাকে তেমন কেউ সাড়া দেয়নি, না আমলা, না শিক্ষক, না সৈনিক, না বিচারক, না ব্যাবসায়ী, কেউ না – অন্ততপক্ষে আন্তরিকভাবে তো অবশ্যই না। তিনি বাংলা ভাষাকে একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করতে চাইতেন, আমলারা তার নাকের ডগায় রিপোর্ট লিখত ইংরেজিতে। হাজার বলেও কিছু হতো না। ক্ষমতার অঙ্গুলিহেলনে যে বিশ্ববিদ্যালয় শেখ মুজিবুর রহমানকে বহিষ্কার করেছিল ১৯৪৯ সালে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় ২০২১ সালে নিজের শতবর্ষ উদযাপন করছে। কিন্তু ১৯৪৯ সালেও এই বিশ্ববিদ্যালয় যেমন গণবিরোধী ছিল, আজও তেমনই রয়েছে। প্রমাণ চান? ঘোষণা হয়েছে, শতবর্ষ উপলক্ষে যত গবেষণা-প্রকাশনা-সেমিনার-ওয়েবিনার হবে, তার ভাষা হতে হবে ইংরেজি, কোনোমতেই বাংলা নয়। এর কারণ, আমাদের জ্ঞানের বহর দেখাতে হবে বিদেশিদের! এই অবসরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতি যে অন্যায় হচ্ছে, সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে, ১৯৮৭ সালের বাংলাভাষা আইন না মানার মতো ফৌজদারি অপরাধ হচ্ছে – সেই দিকে খেয়াল নেই কারও। পৃথিবীর আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষ পালনের সময়ে উপনিবেশের ভাষায় গবেষণাপত্র লিখতে বাধ্য করেছে? বঙ্গবন্ধু কি এই আদেশ দিতে পারতেন? তিনি জিজ্ঞেস করতেন: বাংলায় কেন জ্ঞান সৃষ্টি হবে না? তিনি নিশ্চয়ই বলতেন: শতবর্ষপূর্তিতে সকল প্রবন্ধ বাংলায় লিখিত হবে এবং বাংলায় লেখার জন্যে প্রণোদনা দেওয়া হবে। ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেছিলেন, আমরা যেদিন থেকে ক্ষমতা হাতে নেব, সব কাজ বাংলায় হবে, আপনারা বুদ্ধিজীবীরা যাই বলেন না কেন!

সেদিনও বুদ্ধিজীবীরা বঙ্গবন্ধুর কথা মানেনি, আজও মানে না। বুদ্ধুজীবীরা শুধু ওষ্টসেবা দিয়ে দিয়ে গলা শুকায়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কৃষক-শ্রমিক হচ্ছে দেশের প্রকৃত মালিক, আমলারা পাবলিক সার্ভেন্ট। মালিককে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। আমলারা কি শুনেছিল তার কথা? শোনে কি এখনও? নিজের শিক্ষক সাঈদুর রহমানের কাছে বঙ্গবন্ধু ১০০ জন সৎ লোকের তালিকা চেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে সেই তালিকা করা যায়নি। আজ হয়তো শয়ে শয়ে ছদ্মবেশী ‘সৎ’ লোক ক্ষমতাকে ঘিরে ফেলেছে। ‘সৎ লোকের শাসন চাই!’ – দাবি করত একটি দল কদিন আগেও, যারা কিনা ১৯৭১ সালে ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জ্বতহানির অন্যতম হোতা।

কোনো শাসক যখন প্রশাসন চালানোর জন্যে সৎ মানুষ খোঁজে, তখন বুঝতে হবে, তিনি চৌকশ শাসক নন। তিনি যত তাড়াতাড়ি অবসর নেবেন – তত তার নিজের এবং দেশের জন্যে মঙ্গল। প্রশাসনে সৎ মানুষের প্রয়োজন ততটা নেই, যতটা প্রয়োজন রয়েছে প্রশাসন চালাতে পারেন – এমন চৌকশ মানুষের। দুটি প্রশ্ন আছে এখানে। প্রথমত, মানুষ কি সখ করে সৎ হবে? সৎ হতে মানুষকে বাধ্য করতে হবে, বিচার ব্যবস্থা বলবৎ করে। দ্বিতীয়ত, সৎ মানে কী? কী রকম সৎ? আর্থিক দিক থেকে সৎ, নাকি আদর্শিক দিক থেকে সৎ? কম্বল চুরি অর্থাৎ আর্থিক দুর্নীতি না করলেই কি মানুষ সৎ হয়? আদর্শগত দিক থেকে যারা অসৎ, তারা তো আরও মারাত্মক। যিনি মনে মনে বাংলাদেশকে ‘পাকিস্তান’ বানানোর স্বপ্নে মশগুল, তিনি দুই-চার টাকা ঘুস না খেলেই বা কী! যিনি বলেছিলেন: ‘মাানি ইজ নো প্রোবলেম, আই উইল মেক পলিটিকস ডিফিকাল্ট!’… এ ধরনের ‘সৎ’ লোকেরা ক্ষমতাকে ঘিরে ফেলেছিল ১৯৭৫ সালে। তার পরের ইতিহাস সবার জানা।

আর্থিক দুর্নীতি এড়াতে গিয়ে আদর্শিক দুর্নীতির কুক্ষিগত হয়ে পড়তে পারে যেকোনো সরকার প্রধান। যাদের পক্ষপূটের আশ্রয়ে ক্ষমতা আজ নিশ্চিত বোধ করছে, তারা আসলে হয়তো ‘পাক’, যার অর্থ ‘পবিত্র’ ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু। গোড়ালির ওপর কাপড় পরার বাধ্যবাধকতার ঘোষণা ক্ষমতার অন্দরমহলে PK47 ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম প্রমাণ। আকলমন্দ কে লিয়ে ইশারাহি কাফি হ্যায়! সময় থাকতে ‘আকলমন্দ’ না হলে ‘কপালমন্দ’ হতে দেরি হবে না। তাজা বা বাসি, গরীবের কোনো কথা যেন কখনই না ফলে, বালাই ষাট!

সুকুমার গ্রীক ভাষ্কর্যের সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করে থাকি। সখ করে অনেকেই তাজমহল দেখতে যাই আমরা, শেখ মুজিবুর রহমানও গিয়েছিলেন। একজন মানুষের জীবনও একটি চমৎকার ভাষ্কর্য কিংবা স্থাপত্য হতে পারে না কি? খুব কম জাতির ইতিহাসের দিক চক্রবালের দিকে তাকালে একজন সফল নেতার এমন চমৎকার একটি ভাষ্কর্য কিংবা সৌধ চোখে পড়বে। নেহেরু-গান্ধী-জিন্নাহর মতো তার বিলাতি লেখাপড়া ছিল না। সুযোগ পেয়েও বিলাত যাননি, অক্সফোর্ডের জায়গায় বেছে নিয়েছেন ঢাকা কারাগার। ১৯৭২ সালের আগে চব্বিশ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত কেউ দেখাতে পারবে না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে বাঙালি যেমনভাবে চেয়েছিল, তৎকালীন বিশ্বপরিস্থিতিতে যেভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করার দরকার ছিল, তিনি সেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম হননি। তার সমসাময়িক সব নেতা কখনও না কখনও ব্যক্তিগত লাভের জন্যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ভুল মানুষেরই হয়, বঙ্গবন্ধু মানুষ ছিলেন, দেবতা ছিলেন না। কিন্তু একটি সিদ্ধান্তও তিনি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে নিয়েছেন – এই দোষ তার কোনো শত্রুও এ যাবৎ দিয়েছে বলে জানি না। বাংলাদেশের গণ্ডগ্রাম থেকে উঠে আসা অতি সাধারণ, অর্ধশিক্ষিত এক বাঙালি যুবক ভাগ্য-স্বভাব-চেষ্টায় কী বিশাল উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে নিজে এবং কী উচ্চতায় টেনে নিয়ে যেতে পারে নিজের জাতিকে – তার চাক্ষুষ প্রমাণ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আগামী হাজার বছর ধরে বাঙালি যত উন্নতিই করুক না কেন, কাবলিয়ত বা অর্জনের সর্বোচ্চ শিখরেও যদি সে পৌঁছে যায় ভাগ্যক্রমে বা ভুলক্রমে, বঙ্গবন্ধুর উপকারের কণামাত্রও বাঙালি জাতি পরিশোধ করতে পারবে না। বেগম মুজিবের চব্বিশ বছরের রুদ্ধ অশ্রুর একেকটি অদৃশ্য বিন্দু, ৩২ নম্বরের সোপানের ধাপগুলোর কোনায় আজও জমাট বেঁধে থাকা মুজিব পরিবারের একেকটি রক্তবিন্দু … কৃপণ, বেঈমান বাঙালি, কত ঋণ শোধ করবে তুমি? ওষ্ঠসেবা নয়, বঙ্গবন্ধুর একেকটি জীবনীগ্রন্থ পড়ে একটু ভাবো, জানলাটা খুলে সুনীল আকাশের দিকে তাকিয়ে খানিক উদাস হও। তাতে বঙ্গবন্ধুর কিছু হোক না হোক, তোমার নিজের মনটা অন্তত ‘মানুষের’, ‘বাঙালির’ হবে।

‘আজ উদাসী হাওয়ার পথে পথে মুকুলগুলি ঝরে। আমি কুড়িয়ে নিয়েছি, তোমার চরণে দিয়েছি। লহো লহো করুণ করে…’ (সমাপ্ত)

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ