শনিবার , ২৭ জানুয়ারী ২০১৮

হাওর রক্ষার কাজে এবারও হেলাফেলা?

  শনিবার , ২৭ জানুয়ারী ২০১৮

হাসান হামিদ:

হাওরেরবর্তমান অবস্থা জেনে আমি আশংখা করছি আরও একটি নিশ্চিত দুর্দশার। আমার বাড়িসুনামগঞ্জের হাওর পাড়ে। খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছি যে, হাওররক্ষা বাঁধের কাজেরঅগ্রগতি নেই বললেই চলে। খবরের কাগজে পড়েছি,সুনামগঞ্জ জেলার ৮৩৭ টি পিআইসির মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৫২ টির। কী ভয়ানক ব্যাপার! কাজের এমন মন্থর গতিতে পাউবোরপ্রকৌশলীরাও দেখলাম হতাশ। আরএটা তো সহজ কথা যে, পিআইসির দায়িত্ব প্রাপ্তদের আরো বেশি দায়িত্বশীলনা হলে সময়মত বাঁধের কাজ শেষ করা যাবে না। তবে সুনামগঞ্জের৩৬টি বৃহৎ হাওরসহ জেলার ১৫৪টি হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ নিয়ে এবারও এমন লেজেগোবরে অবস্থা হবে,তা কেউ ভাবেনি।নীতিমালা অনুযায়ী তো এবার হাওর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি)মাধ্যমে করার কথা।

গত বছর ফসলহারিয়ে দিশেহারা হয়েছিল আমার স্বজনেরা। এবারওবহুমুখি সংকট,একদিকে হাওরের পানি নামছে না, অন্যদিকেধানের চারা বড় হয়ে নষ্ট হবার উপক্রমআবার পানি নানামায় বাঁধের কাজের বিলম্বের কারণে হাওররক্ষা নিয়েদুশ্চিন্তা তো রয়েছে সব মিলিয়ে একটা ভয়াবহ অনিশ্চয়তা কাজ করছে সবার মনে। আমিযতদূর জানি, নীতিমালা অনুযায়ী কাজ শুরু করলে এই সময়ে আরো অনেক বেশি কাজ হবার কথাছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। পিআইসির দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বশীল হতে তাগদা দেওয়ার কথা না, তারা নিজেরাই কাজে লেগে পরার কথা। কিন্তু সব কিছুই হতাশকরছে আমাদের। তারা সময়মতো কাজ শুরু করেনি।

খবরের কাগজমারফতে আমরা জেনেছি, হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইসি) কমিটিতে বিস্তরঅনিয়মের গল্প। কোটি কোটি টাকারপ্রকল্পের দায়িত্ব নাকি পেয়েছেন জেলার ১১টি উপজেলায় ইউপি সদস্য ও তার আত্মীয় স্বজনরাএবং ক্ষমতাশালীরা। প্রকল্প কমিটি প্রকাশ হওয়ার পর হাওরপাড়ের কৃষকরা চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলেশুনেছি এমন অসঙ্গতির বিষয়েবিভিন্ন উপজেলায কৃষকরা লিখিত ভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে অভিযোগের অনুলিপি স্থানীয়সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসক বরাবরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও প্রকল্প কমিটির সময় পারহয়ে যাওয়ায় পর দ্রুত নামমাত্র কমিটি গঠন করা হয়েছে। এমন কমিটি দিয়ে হাওরের আসলেই কাজ হবে কিনা তা নিয়ে আমরা উদ্বেগ আর  উৎকণ্ঠায় আছি হাওরপাড়ের কৃষকরা  গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগে করে বলেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিগঠনে এমন অসঙ্গতির ঘটনা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখেছি, বিগত বছর ঠিকাদার ওপিআইসিদের দূনীর্তির কারণে অকাল বন্যায় বোর ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে জেলার সব কটি বোর ফসলি হাওরতলিয়ে যায়। এবার চলতি বছরও যদি দূর্নীতি গ্রস্থ কিংবাঅসাধূ ব্যাক্তিদের দিয়ে আবার বাঁধের কাজ করানো হয়; তাতে গত বছরের মতদূর্নীতি যে হবে না তা বলার অপেক্ষা রাখে  না।

হাওরপাড়ে জন্ম হওয়ার সুবাধে আমি জানি, এ এলাকায় বাঁধ নির্মাণে যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, তার সম্পূর্ণ টাকা বাঁধ তৈরিতে ব্যবহারকরা হয় না। এটা একেবারে প্রচলিত প্রথা হয়ে গেছে। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২এর ৪৯ ধারায় মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে শাস্তি সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে উল্লেখ আছে,উপধারা (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত বাঅবহেলাক্রমে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে কোন কার্য দ্বারাপরিবেশের এইরূপ বিপর্যয় ঘটান যাহা কোন দুর্যোগের কারণ সৃষ্টি করে এবং ফলশ্রুতিতে অন্যকোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জান, মাল, সম্পদ, স্থাপনা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি সাধিত হয়,তাহা হইলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানেরনিকট হইতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের করিতে পারিবে। উপধারা(২) এই ধারার অধীন ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা পরিচালনায়  Code of CivilProcedure, 1908 (Act No. V of 1908) এর বিধানাবলী প্রযোজ্য হইবে।

আমরাজানি, গত দুই বছর পানিউন্নয়ন বোর্ডের অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে ফসল হারিয়ে কৃষকরাবর্তমানে একবারে সর্বস্বান্ত। আর এবছরও পানি যে-হারে কমছে, তাতেকরে বীজতলা তৈরি করতে পারলেও তা রোপণ করতে পারবে কিনা এই চিন্তায় রয়েছে হাওরপাড়েরলাখ লাখ কৃষক। তাছাড়া পিআইসি গঠনে বিলম্ব হওয়ার বিষয়টি নিয়ে এবছরও প্রশ্নবিদ্ধকরছেন হাওরপাড়ের কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। আর দ্রুত পিআইসি গঠনের কাজশেষ করতে না পারলে এবারও বোরো ফসল ঝুঁকিতে পড়বে। আর হাওরের ফসলের ক্ষতির প্রভাবপড়বে জাতীয় অর্থনীতির ওপর। কেননা সরকারের হাওর মহাপরিকল্পনার হিসাবে দেশের মোটধানের ১৮ শতাংশ এবং উন্মুক্ত উৎসের মাছের ২৮ শতাংশ আসে হাওর থেকে। দেশের জাতীয়অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) হাওরের অবদান ৬ শতাংশ।

সুনামগঞ্জেএবার দুই লাখ ২২ হাজার ৫৫২ হেক্টর বোরো জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাহয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৫শকোটি টাকা। কিন্তু কচ্ছপের গতিতে পানি কমলে চরম ক্ষতির শিকার হবেকৃষকরা। সেইসাথে এবার লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে না। আর এর প্রভাব পড়বে হাওরেরপ্রতিটি মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বপ্ন আর দেশের অর্থনীতিরওপর।

শেষ কথাহচ্ছে হোয়াংহো নদী এক সময় ছিল চীনের দুঃখ। সেটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে আশীর্বাদে পরিণতকরা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে বলতে হয়, হাওরের পানি, মৎস্যসম্পদ এবং ফসল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়তার সমাধান আছে। আমাদের হাওর সারা দেশের এক-তৃতীয়াংশ ধান, মিঠাপানিরমাছের প্রায় অর্ধেক অংশ জোগান দেয়। তাই হাওরবাসীর দুঃখের সমাধান জাতীয় প্রয়োজনেইকরতে হবে। আর এবছর যদি ফসলের ক্ষতি হয়, তবে হাওরবাসীর পক্ষে মানসিক ভারসাম্য ধরে  রাখা শুধু কঠিন হয়ে যাবে না; তারা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এর থেকে পরিত্রাণেরব্যবস্থা রাষ্ট্র কি নেবে না?

লেখক-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা। 

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ