মঙ্গলবার , ২০ এপ্রিল ২০২১ |

বঙ্গবন্ধু বনাম বঙ্গশত্রু

শিশির ভট্টাচার্য্য   বৃহস্পতিবার , ০৩ ডিসেম্বর ২০২০

দুইটি শব্দই সমাসান্ত, কিন্তু এদের মধ্যে পাণিনীয় ব্যাকরণগত সূক্ষ্ণ তফাৎ রয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু’ একটি যোগরূঢ় শব্দ এবং ‘বঙ্গশত্রু’ একটি সাধারণ (ষষ্ঠী) তৎপুরুষ সমাসান্ত শব্দ। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের দুটি অর্থ হতে পারে: ১. ‘বঙ্গের বন্ধু’ এবং ২. বিশেষ একজন ব্যক্তি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা শেখ মুজিবুর রহমান। ‘বঙ্গশত্রু’ শব্দের অর্থ একটাই: নিখিল বঙ্গ কিংবা বাংলাদেশের শত্রু। বিশেষ কোনো ব্যক্তি বঙ্গশত্রু নন, যদিও তাদের সংখ্যা হয়তো লক্ষাধিক, কোটিও ছাড়িয়ে যাবে।

ধরা যাক, ১৯৩৮-৩৯ (প্রথম কারাবাস) থেকে ১৯৬৯- এ ত্রিশ বছরব্যাপী শেখ মুজিব নামে এক নেতার আচরণ, মনমানসিকতা ও কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে সেই নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। এটা কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার? নেতাতো আরও ছিলেন। অখ্যাতদের কথা যদি বাদও দিই, প্রখ্যাত নেতা অন্তত কয়েক জনতো ছিলেনই: খাজা নাজিম উদ্দিন, নুরুল আমিন, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, মোনায়েম খান- এই ছয় জন তারকা নেতার উল্লেখ তো আমরা করতেই পারি। এদের মধ্যে একজনকেও শেখ মুজিবের মতো দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করতে হয়নি, কিংবা কখনও জীবনেরও ঝুঁকি নিতে হয়নি। হেসেখেলে, ক্ষমতার মসনদে বসে রাজনীতি করেছেন তারা প্রায় সবাই। কাউকেই পূর্ব বাংলা থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে হয়নি ভাঙা উর্দুতে সেখানকার লোকদের বোঝানোর জন্যে যে বাঙালিরা কী চায়? ওই ছয় জনের কারও বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হয়নি, একজনও বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্র করতে সশরীরে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত-সীমান্ত পাড়ি দেননি।

নুরুল আমিন এবং নাজিম উদ্দিন পাঞ্জাবি সামরিক জান্তার পদলেহী ছিলেন। শেরে বাংলা পাকিস্তানের প্রশাসন থেকে সুবিধা নেবার কারণে ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখেননি কিংবা রাখতে পারেননি, যখন কিনা শেখ মুজিব ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়ে কারাবরণ করেছেন এবং অনশন করে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছেন ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। সোহরাওয়ার্দী এবং ভাসানী উভয়েই তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কোনো না কোনো পর্যায়ে সামরিক জান্তার সঙ্গে আপস করেছেন। আইউব খানের সঙ্গে ভাসানীর সুসম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ‘আমার আইউব’ প্রকাশ্যে বলতেন তিনি। এই আদুরে সম্বোধনের ইতিহাস ‘আচ্ছালামুআলাইকুম’ দিয়ে মুছে ফেলা যাবে কি? সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। লিডারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন শেখ মুজিব। সোহরাওয়ার্দী ‘প্যারিটি’র (অর্থাৎ দুই পাকিস্তানে সমান সংখ্যক সাংসদ থাকবে, যদিও পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা বেশি!) পক্ষে ছিলেন। এই নীতি বাঙালি-বিরোধী এবং পাঞ্জাবি সামরিক জান্তার স্বার্থরক্ষাকারী- শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দিকে এই সত্য কোনওমতেই বোঝাতে পারেননি।

কাউকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়, কেউ কারও মতো হয় না। কিন্তু যিনি বড় কাজ করেছেন, বড় মুখ করে তার কথা বলায় দোষটা কোথায়? ভাসানী নিজের মুখে সিরাজুল আলম খানকে বলেছিলেন: ‘আমার সাঙ্গপাঙ্গরা সব কমিউনিস্ট, তারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায় না, কারণ কমিউনিস্টদের কাছে দেশ গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশ স্বাধীন করার সাহস ও ক্ষমতা যদি কারও থাকে, তবে সেটা আছে শেখ মুজিবের। তোমরা তার কাছে যাও!’

স্বাধীনতাকামী জনগণ অনুসরণ করার মতো আর কাউকে পাননি ৬৯-৭১ সময়কালে। ছিলেন একজনই, শেখ মুজিব, যিনি ত্রিশ বছর ধরে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হবার প্রস্তুতি নিয়েছেন কারাগারের নির্জনতায়, শত শত বইয়ের পাতায়, বাংলার হাটে-মাঠে-শহরে-বন্দর ঘুরে ঘুরে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে, নদীবক্ষে আব্বাস উদ্দীনের গান শুনে, রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে। যার প্রস্তুতি এত দীর্ঘ, এত নিবিড়, তিনি যে পরীক্ষায় অন্যদের তুলনায় ভালো ফল করবেন, তাতে আশ্চর্য হবার কী আছে?

আজ যখন কেউ সিংহাবলোকনে ১৯৩৮/৩৯ থেকে ১৯৬৯- শেখ মুজিবের এ ত্রিশ বর্ষব্যাপী কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাবে, তখন তার এমন একটি আচরণ ও সিদ্ধান্ত খুঁজে বের করতে পারবে কিনা সন্দেহ, যেটার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত লাভ ও লোভ। অন্য নেতাদের জীবনে এমন আচরণ ও সিদ্ধান্ত আকছার পাওয়া যাবে। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন, ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়- বাংলার মুসলমানের জীবনে সমৃদ্ধি আনয়নই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য। তিনি যখন দেখলেন, পাঞ্জাবি জান্তা স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের স্বপ্ন আত্মসাৎ করে ফেলেছে, তখন তিনি সেই ভুল সংশোধনের ক্রমাগত চেষ্টা করে গেলেন, চব্বিশ বছর ধরে। এবং সংশোধন করলেন তিনি। একের পর এক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সৃষ্টি করলেন স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। জনগণের সঙ্গে একটানা, এমনতরো বন্ধুত্বের আচরণ উভয় বঙ্গ কিংবা সর্বভারতের অন্য কোন নেতা করেছেন ইতিহাসে? ‘বঙ্গবন্ধু’ নামকরণের সার্থকতা এখানেই।

ব্যক্তি শেখ মুজিবের তিন দশকের বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাভাষায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের অর্থ বদলে গিয়েছিল- তৎপুরুষ সমাসান্ত শব্দ পরিণত হয়েছিল যোগরূঢ় শব্দে। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের যোগরূঢ়তার কারণে শব্দটির পূর্বতন তৎপুরুষ সমাসান্ত অর্থ বাতিল হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের জনগণ নিশ্চয়ই আজ দুই ভাগে বিভক্ত: বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গশত্রু। আপনি কোন দলে জনাব? জিন্নার ভাষায় ‘পোকায় কাটা’ পাকিস্তান একটি বিফল, ক্ষতিকর প্রকল্প ছিল এবং বঙ্গবন্ধু সারা জীবন এ প্রকল্পের ভুল সংশোধনে ব্যস্ত ছিলেন। শেষ রক্ষা করা যায়নি। ২৪ বছরের ব্যর্থ চেষ্টার পর পাকিস্তান প্রকল্প বাতিল করে পূর্বাঞ্চলে নতুন একটি প্রকল্প: ‘বাংলাদেশ’ শুরু করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। পশ্চিমাঞ্চলে অনুরূপ প্রকল্প শুরু হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মানুষ রাষ্ট্র গঠন করে কেন? নিঃসন্দেহে ব্যক্তির, সমাজের উন্নয়নের জন্যে। পাকিস্তান প্রকল্পে জনগণের অবস্থার উন্নতি হয়েছে- এমন দাবি পাকিস্তানিরাও করে না। ধর্মান্ধতা, সন্ত্রাস, বেকারি, বিদেশি সাহায্য নির্ভরতা, সেনাবাহিনীকেন্দ্রিকতা- জনগণের উপর কত শত দুর্গতি চাপিয়ে দিয়ে আসছে পাকিস্তান প্রকল্প তার জন্মলগ্ন থেকে। পাকিস্তান সৃষ্টির আট দশক পর প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পাকিস্তানের বিরোধী দলের নেতারা যখন বলে: ‘হামারা ওয়াতনকো আপ বাংলাদেশ বানাকে দেখাইয়ে!’, তখনও পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তান প্রকল্পের অভিভাবকেরা ভাবেন, তাদের নৈতিক পরাজয় হয়নি। যারা পূর্বাঞ্চলে এখনও পাকিস্তান প্রকল্প জারি রাখতে চান, তারা অবশ্যই বঙ্গশত্রু। বাংলাদেশকে যারা ধর্মান্ধতার অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে, তারাও বঙ্গশত্রু বৈকি। বঙ্গবন্ধু এদের ক্ষমা করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি পর্যন্ত তারা মুছে দেবার বৃথা চেষ্টা করেছে, করছে, দশকের পর দশক ধরে, বাস্তবে, মুদ্রিত ও সামাজিক মিডিয়ায়, কোথায় নয়?  

বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিতেন, আমলারা মানতো না। শুধু কি আমলা? মুক্তিযোদ্ধা, সেনাবাহিনী, বিচারবিভাগ, আওয়ামী লীগের নেতারা, নিজের অতি কাছের বন্ধুবান্ধব, পরিবারের লোকজন, কেউ কি মানতো তার কথা? বঙ্গবন্ধু একবার দুঃখ করে বলেছিলেন: ‘পাঞ্জাবি-পাজামা, মুজিবকোট পড়ে আদেশ দিলে সিএসপিরা শুনে না। খাকি পোশাক পড়ে, লাঠি হাতে হুকুম দিলে তারা ঠিকই শুনতো!’

সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কয়েক বছর পর জিয়াউর রহমান বা এরশাদ যখন পাতাবাহার পোশাক পড়ে নির্দেশ দিতেন, আমলারা তখন শশব্যস্ত হয়ে পরম উৎসাহে তাদের নির্দেশ পালন করতো। চট্টগ্রামে এমন লোককে বলে ‘লাথির কাঁঠাল’, লাথি ছাড়া যে কাঁঠাল পাকে না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ কৌশলে অমান্য করতেন যে লাথির কাঁঠালেরা, তারা অবশ্যই বঙ্গশত্রু ছিলেন। এদের মূল লক্ষ্য ছিল, ছলে-বলে-কৌশলে বঙ্গবন্ধুর অপমান এবং পতন। এখনও সরকারি কাজকর্মে আন্তরিক নন যে সব কর্মকর্তারা, কোনো বিচারেই তারা বঙ্গবন্ধু হতে পারে না।

বঙ্গবন্ধু চাইতেন, বাংলাদেশের দাপ্তরিক ভাষা, শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা। বার বার বলেছেন তিনি এ কথা, স্বাধীনতার আগে ও পরে। আমলারা, বিচারকেরা, বুদ্ধিজীবীরা, সেনাবাহিনীর লোকজন তার কথায় কর্ণপাত করেনি কেউই। এখনও এদের পছন্দের ভাষা ইংরেজি, যদিও এদের কাউকেই ইংরেজিতে চৌকস বলা যাবে না। অবশ্যই ইংরেজি এবং সম্ভব হলে অন্যান্য ভাষা যেমন চীনা, জাপানি, ফরাসি, স্প্যানিশ, জার্মান ইত্যাদি আমাদের শিখতে হবে। বর্মি, হিন্দি বা তামিল ভাষাই বা কেন শিখবো না আমরা! প্রতিবেশীর ভাষাই যদি না জানি, তবে প্রতিবেশীর সঙ্গে অপরিচয়ের দেয়াল ঘুচবে কেমন করে?

কোনো ভাষা শেখা এবং সেই ভাষায় রাষ্ট্র ও শিক্ষা পরিচালনা দুটি ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশের সিংহভাগ লোকজন কখনোই ইংরেজি শিখতে পারবে না, যতই আমরা চেষ্টা করি না কেন। এটা একটা অনতিক্রম্য প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধ। সরকারের যে নীতিনির্ধারকেরা এ সত্যটি এখনও মেনে না নিয়ে দেশের অর্থ ও সময় নষ্ট করে চলেছেন, তারা অবশ্যই বঙ্গশত্রু। যারা ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম করার এবং রাখার পক্ষে, তারাও বঙ্গশত্রুই বটে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের বঙ্গশত্রু গিজ গিজ করছে। শতবর্ষ পূর্তিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পছন্দের ভাষা বাংলা নয়, ইংরেজি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যেহেতু এ দুষ্কর্মে প্রধান উৎসাহদাতা, সেহেতু সেই প্রতিষ্ঠানকেও ‘বঙ্গবন্ধু’ বলা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু একদলীয় শাসন বাকশাল চালু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যে সময়ের রাষ্ট্রনায়ক, তখন একদলীয় মডেল পৃথিবীতে চালু ছিল অনেক দেশেই। চীন, কিউবা, আরবদেশে এখনও চালু আছে। কেউ কি কখনও গবেষণা করে দেখেছেন, কোন বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু অগত্যা, বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

জাসদ যদিও স্বীকার করে না, তবুও জাসদের নামে গণবাহিনী, সর্বহারা বাহিনী সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। শত শত থানা লুট হয়েছিল ৭৩-৭৪ সালে, শত শত পুলিশ, রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কঠোর হতে পারছিলেন না। কার্যত অসহায়, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। জনবিচ্ছিন্ন তাকে করা হয়েছিল। বঙ্গশত্রুরা তার কন্যাকেও জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাইবে তাতে আর সন্দেহ কি!

বঙ্গবন্ধুর আরেক ‘দোষ’, চারটি মাত্র পত্রিকা বাদে বাকি সব পত্রিকা তিনি বাতিল করেছিলেন। বুদ্ধিটা কি তৎকালীন আমলারাই দেয়নি, নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার উদ্দেশ্যে? বঙ্গবন্ধুতো শুধু আদেশ দিতেন, আদেশ পালন করতো তো আমলারাই। তাছাড়া একই কাজ কি জিয়া-এরশাদ গং করেনি? এদের সময়ে গভীর রাতে পত্রিকার সম্পাদককে বলা হতো, কী ছাপা যাবে আর কী ছাপা যাবে না- যার মানে হচ্ছে, সামরিক ও আধাসামরিক শাসনামলে চারটি কেন, কোনও পত্রিকাই ছিল না। এখনও সব কথা খোলাখুলি বলা যায় বাংলাদেশে? একটা ভয়ের, আতঙ্কের বাতাবরণ রয়েছেই- গুম, ক্রসফায়ার অতীতের দুঃস্বপ্ন মাত্র নয়- এটা আমাদের সরকারগুলোর অন্যতম ব্যর্থতা।

যত সিদ্ধান্তই বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত লাভের জন্যে নেননি কোনটা, সব সিদ্ধান্ত দেশের ভালোর জন্যেই নিয়েছিলেন, যতটা তার বুদ্ধিতে কুলিয়েছিল। এটা ঠিক যে বঙ্গবন্ধু সবার মতামত নিতেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতেন নিজেই। তাকে কি আরও কয়েকটা বছর সুযোগ দেওয়া যেতো না? পাকিস্তাানকে বাঙালিরা চব্বিশ বছর সহ্য করেছিল, শেখ মুজিবকে চার বছরও সহ্য করতে পারলো না! তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেই বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মানুষ ছিলেন তিনি, দেবতাতো ছিলেন না। কাজ করতে গেলে ভুল হতেই পারে। তার পর যারা ক্ষমতায় এসেছে একে একে, তারাও কি সবাই সব কিছু শুদ্ধ করেছে? বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কারও তুলনা কি করা যায়? যে পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের হাল ধরেছিলেন, তার চেয়ে বহুগুণ ভালো পরিস্থিতিতেও পরবর্তী শাসকেরা দেশের উপর বিদেশি সাহায্য ও ঋণের বোঝাই শুধু চাপিয়ে দিয়েছিল, দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন করতে পারেনি, অনেকটা পাকিস্তানের মতো। তারা অবশ্য পাকিস্তান প্রকল্পই অনুসরণ করছিল বাংলাদেশে।

পাকিস্তানপন্থিরা ভূতের মতো। পা পেছনদিকে ঘোরানো বলে তারা কখনও সামনে এগোতে পারে না, ইচ্ছা থাকলেও না, শারিরীক-মানসিক প্রতিবন্ধিতা জয় করা সহজ নয় বলেই পারে না।

এমন কি ‘মহাপাপ’ বঙ্গবন্ধু করেছিলেন যে সপরিবারে তাকে খুন করতে হবে এবং সেই খুনের বিচারও করা যাবে না দশকের পর দশক? বুঝলাম, কিছু এফএফএফ (ফ্রাইডে ফ্রিডম ফাইটার, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর শুক্রবার ছিল) সেনাসদস্য তাকে খুন করেছিল। কিন্তু বাঙালির অনেকেও তো বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে নিছক অবাক হয়েছিল, এক বিন্দু কষ্ট পায়নি- এটাতো আমার নিজের চোখে দেখা। কত শত অশ্রাব্য গল্প তৈরি করেছিল বঙ্গশত্রুরা, বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির সঙ্গে বেঈমানি করেছেন ইত্যাদি মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা অভিযোগ করে। জাত বেঈমান এবং নির্লজ্জ এই বাঙালিরা যত শিক্ষিত হয়, তত বেশি বেঈমান ও নির্লজ্জ হয়ে উঠে।

যে গুরুদণ্ড বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু আর তার পরিবারকে দিয়েছে, রাসেলের মতো প্রাণভয়ে অস্থির একটা শিশুকে পর্যন্ত রেহাই দেয়নি, শরীরে লজ্জা থাকলে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে তারা নতুনভাবে দোষ খুঁজতে যেতো না। এখনও দেশে-বিদেশে এমন বাঙালি আকছার দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সংবাদে যারা উল্লসিত হন, বঙ্গবন্ধুর বিন্দুমাত্র প্রশংসাও যাদের উষ্মার কারণ হয়। বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার বৃথাচেষ্টায় অনেকে অন্য নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর তুলনা করতে থাকে, প্রয়োজনে ইতিহাস বিকৃত করে বা বিস্মৃত হয়। বঙ্গবন্ধুর উল্লেখমাত্রে যাদের গাত্রদাহ হয়, তাদের বঙ্গশত্রু বলা যায় না কি?

দেশের টাকা যারা বিদেশে পাচার করে, দুর্নীতি দমনের কর্মকর্তা হয়ে মালয়েশিয়ায়, কানাডায় ডলারে উৎকোচ গ্রহণ করে, লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল স্থাপন করে, নিরাপত্তা দেবার কথা যাদের, সেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যারা অসহায় মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, ক্রসফায়ারে ঠেলে দেয় ‘নিরপরাধ’ মানুষকে, ব্যক্তিগত লাভ ও লোভের বশবর্তী হয়ে পারিবারিক ও মানসিকভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ভোল পাল্টে আওয়ামী ভিড়ে মিশে আছেন যে মৌসুমী ‘কাউয়া’রা… এরা সব বঙ্গশত্রু। বঙ্গশত্রুর তালিকায় ভুক্তির সংখ্যা অশেষ। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু হবার শর্তের তালিকা অতি সংক্ষিপ্ত: একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ যারা মনে-প্রাণে-আচরণে কামনা করেন, বঙ্গবন্ধুর মতো, তারাই প্রকৃত বঙ্গবন্ধু।

কিশোর বয়স থেকে সাম্প্রদায়িকতা এবং দাঙ্গার বিরুদ্ধে লড়েছেন বঙ্গবন্ধু। জিন্নার আহুত ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’র দাঙ্গায় তিনি কলকাতার হিন্দু ও মুসলমানদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। বিহারে গিয়ে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমাদের ত্রাণকার্যে অংশ নিয়েছেন। বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা থামিয়েছেন অন্তত দুই বার, যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী থাকাকালে এবং সত্তরের নির্বাচনে জেতার পর। এই দাঙ্গা বাঁধানো ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অন্যতম অস্ত্র। এর কমপক্ষে তিনটি লক্ষ্য ছিল: ১. নিজেদের আযোগ্যতা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো; ২. বাঙালিদের সরকারকে অকার্যকর প্রমাণ করা এবং ৩. সংখ্যালঘুদের জান-মাল-জমি-ইজ্জত লুটপাট করতে দিয়ে পার্টির লোকদের হাতে রাখা। বঙ্গবন্ধু বার বার বলেছেন, দাঙ্গা না করতে, কারণ এর ফলে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল সংখ্যালঘুশূন্য হয়ে যাবে এবং এই অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির জন্যে সেই জনবিন্যাস কখনই ভালো ফল বয়ে আনবে না। কিন্তু দাঙ্গা কিংবা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ছাড়া পাকিস্তান প্রকল্প অচল।

পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যালঘুর সংখ্যা দিন দিন কমেছে, কমছে, এখন সম্ভবত এককের কোঠার একেবারে নিজের দিকে তাদের অবস্থান, যখন কিনা ভারতে সংখ্যালঘুর সংখ্যা প্রায় অটুট (যদিও এর মানে এই নয় যে ভারতে সংখ্যালঘুবিরোধী মানসিকতা কিংবা রাজনীতি নেই)। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু বিতাড়নের উদ্দেশ্যে দাঙ্গার আয়োজন করা হয়, প্রায়ই তাদের ধর্মস্থান আক্রান্ত হতে দেখা যায়, বিভিন্ন অজুহাতে, কিছুদিন বিরতি দিয়ে। উদ্দেশ্য পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো বাংলাদেশকেও সংখ্যালঘুশূন্য করা। বলা বাহুল্য, এটা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি নয়। সংখ্যালঘু বিতাড়নের রাজনীতি যারা করে, তারা অবশ্যই বঙ্গশত্রু।

বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য, ২০২০ মুজিববর্ষ করোনাবর্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে বঙ্গশত্রুরা উল্লসিত। ভুয়া বঙ্গবন্ধুরা এই উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর উপর বইটই প্রকাশ করে টুপাইস কামানোর ধান্দা করেছিলেন। কিছু কিছু অপকর্ম রুখে দেওয়া গেলেও সব কাউয়াদের নিবৃত্ত করা নিশ্চয়ই সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর উপর ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম বইপাড়ায়। পড়ার মতো সেরা বই তিনটি লিখেছেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। বঙ্গবন্ধু যে ভালো লিখতেন, এই প্রশংসাটুকুও বঙ্গশত্রুদের সহ্য হবে না- আমি জানি। তবু মুজিববর্ষে ‘সাহস করে’ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ‘কিছু সত্য কথা বলার’ তাগিদ অনুভব করছি। কথাটা অবশ্য বলেছিলেন গাফফার চৌধুরী, বঙ্গবন্ধুর জীবৎকালে, তার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর কাছে বাঙালি জাতির ঋণ অনেক। একজন বাঙালি হিসেবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম এ বাঙালির প্রতি সেই ঋণের কণামাত্র শোধ করার উদ্দেশ্যে এই মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের একার নয়, বঙ্গবন্ধু আমাদের সবার। গবেষকেরা, আপনারা তার গুণগুলো মুক্তকণ্ঠে বর্ণনা করুন, দোষগুলোকেও বিশ্লেষণ করুন নিরপেক্ষ, নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে। দোষ দেখানো আর কুৎসারটনা এক জিনিষ নয় মোটেই। পুরুষোত্তমের ভুল থেকেও আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু। What, better than his errors, can describe a person?  জীবনের ভুলগুলোর মধ্যে ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র লুকায়িত থাকে। এই অচেনা বঙ্গবন্ধুকে আবিষ্কার করতে হবে নব উদ্যমে, নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে।

বঙ্গবন্ধু আমাদের সময়ের সফল নায়ক। বঙ্গবন্ধুর জীবনপাঠের প্রয়োজন এ কারণে যে বাংলাদেশে যারা বর্তমানে ও ভবিষ্যতের নায়ক হতে চায়, তাদের জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুর (উভয়ার্থে) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী এবং কোন কোন বৈশিষ্ট্যগুলো আচরণে-মননে দৃশ্যমান হলে কোনো ব্যক্তিকে বঙ্গশত্রু বিবেচনা করে পরিত্যাগ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যেক জননেতাকে পরীক্ষিত ‘বঙ্গবন্ধু’ হতেই হবে। বঙ্গবন্ধু গবেষণাকেন্দ্রগুলোর অন্যতম কাজ হওয়া উচিত, এই দুই শ্রেণির বাংলাদেশির চরিত্রবৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা। নিয়মিত ওষ্ঠসেবা এবং কর্তার পাদদেশে ক্রমাগত তৈলমর্দনের সময় বাঁচিয়ে কেন্দ্রপরিচালকরা এ কাজটা করতে পারলে আখেরে জাতি ও রাষ্ট্র উপকৃত হবে।

কে বঙ্গবন্ধু, আর কে বঙ্গশত্রু, সেটা নির্ধারণ করার লিটমাস পেপার হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জীবন। বঙ্গবন্ধুর মতো যারা ভাবে, আচরণ করে, ধর্মনিরপেক্ষ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ যাদের ধ্যানজ্ঞান, আমাদের মধ্যে তারাই শুধু ‘বঙ্গবন্ধু’। যারা এর বিপরীত আচরণ করে, তারা ‘বঙ্গশত্রু’। সাদা আর কালোর মাঝখানে ধূসর এলাকাটিকে আপাতত না হয় হিসেবের বাইরেই রাখলাম আমরা। দুই দলের পার্থক্য যদি জাতির কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রগঠন ত্বরান্বিত হবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশের যাবতীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত হবে এই দুই দল লোকের মধ্যে এবং এই সংঘাত বহুদিন চলবে। পাঠক, বুকে হাত দিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আপনিও: বঙ্গবন্ধু, নাকি বঙ্গশত্রু আমি?

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক রোমান্টিক নেতা, বাংলাদেশের একমাত্র রোমান্টিক নেতা। যাকে তিনি অনুসরণ করতেন, সেই সুভাষ বসুও রোমান্টিক নেতা ছিলেন। অক্ষশক্তি জিতবে কি জিতবে না, জার্মান বা জাপানিরা যে ইংরেজদের তুলনায় নিকৃষ্টতর ঔপনেবেশিক হতে পারে- এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়েই তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আফগানিস্তান-তুরস্ক পার হয়ে হিটলারের সামনে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্যের আবেদন নিয়ে। একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুও হাজির হয়েছিলেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায়। ভাগ্য-স্বভাব-চেষ্টা। স্বভাব ও চেষ্টাতে সুভাষ কিংবা মুজিব, দুজনের কারোরই ঘাটতি ছিল না। সুভাষ বসুর ভাগ্য খারাপ বলে তিনি কোনোমতে ‘নেতাজি’ হয়েছিলেন। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা, ভাগ্য তার প্রতি প্রসন্ন ছিল বলেই।

আচ্ছা বলুনতো, বঙ্গবন্ধু ছাড়া ভারতবর্ষের আর কোন নেতা পারতেন, ৭ই মার্চের পরিস্থিতিতে এক তাৎক্ষণিক ভাষণে কৌশলে নিজের এবং লক্ষ লক্ষ শ্রোতার জীবন বাঁচিয়ে দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিতে? সাপও মারলেন, লাঠিও অটুট রইল। বাকশালের সিদ্ধান্তও বঙ্গবন্ধুর রোমান্টিক চরিত্রেরই প্রতিফলন। সিদ্ধান্ত সঠিক কী বেঠিক, সেটা প্রায় কখনই সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে ভাগ্যের উপর। একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ত্রো সফল হয়েছিলেন। বাকশালের জন্যে বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করা হয়, কারণ সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে ২৫শে মার্চের রাতের সিদ্ধান্তের জন্যে বঙ্গবন্ধুকে দোষ দেওয়া হতো। ভাগ্য প্রসন্ন হলেই শুধু রোমান্টিকেরা জিতে যায় এবং ইতিহাসের নায়কে পরিণত হয়।

ঈশ্বরের বরপুত্র মহাপুরুষেরাও সংকটকালে মাতৃভূমি থেকে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে গোপনে পালিয়ে গিয়েছেন অন্য শহরে, জীবন বাঁচাতে- এমন উদাহরণ আছে ইতিহাসে। তার চেয়েও ভয়ংকর পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘না আমি ৩২ নম্বরেই থাকবো। আমাকে না পেলে ওরা পাগল হয়ে যাবে। লোকজনকে বেপরোয়া হত্যা করবে!’ বলেছিলেন তিনি সিরাজুল আলম খানকে। নিজের জীবনের পরোয়া নেই, সেই সব দেশবাসীর কথা ভাবছেন তিনি চরম সংকটেও, যাদের তিনি চিনেনও না। একজন রোমান্টিক ছাড়া এমন পরিস্থিতিতে, এমনতরো কথা আর কে বলতে পারে, কে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যাতে মৃত্যু নিশ্চিত। অথচ ভারতে যাবার প্রস্তুতি ছিল, সঙ্গীসাথীদের অনেকেই সে রাতেই চলে গেছেন ভারতে। বঙ্গবন্ধুও সপরিবারে ভারতে গিয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু বইয়ের পোকা শেখ মুজিব জানতেন, সিরাজদৌল্লা পালিয়ে গিয়েছিলেন। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুইও পালিয়ে গিয়েছিলেন। শেষ রক্ষা হয়েছিল কি? আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করি:  তখনকার অন্য কোন নেতার সাহস ছিল, ২৫শে মার্চের রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্যে অকুতোভয়ে নিজের অরক্ষিত বাড়িতে অপেক্ষা করার? ভারতবর্ষের আর কোন নেতা এমন সংকটকালে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন? বাংলাদেশের তৎকালীন নেতারা বুঝতেই পারেননি, বঙ্গশত্রুরাতো বটেই, বঙ্গবন্ধুদের মধ্যেও অনেকে আজও বুঝতে পারেন না, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু কী সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একজন বন্দি বঙ্গবন্ধু একজন পলায়নকারী বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী- ইতিহাসে সেটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

পলায়ন নয়, অবস্থান, যা হবার হোক- এই ছিল বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধকৌশল। নিরাপত্তাহীন ৩২ নম্বরেই থেকেছেন বঙ্গবন্ধু আজীবন, বঙ্গভবনের নিরাপত্তার চাদরে নিজেকে ঢাকতে চাননি পরিবারের লোকজনের ক্রমাগত অনুরোধ সত্ত্বেও। ‘দেশবাসীর জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারি না, শুধু নিজের নিরাপত্তার কথা ভাববো কেন?’ এমন কথা বলেছেন তিনি ১৪ই অগাস্ট রাতেও। ইতিহাসের মহাপুরুষদের স্রেফ কৌশল ছিল। বঙ্গবন্ধুর কৌশল ছিল, অভূতপূর্ব সাহস ছিল আর ছিল দেশবাসীর প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও বিশ্বাস। এই ভালোবাসা আর বিশ্বাসই তার কাল হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই উত্তর দেবেন বঙ্কিমের জবানে: ‘তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?’  

বঙ্গবন্ধু বিষয়ক আমার লেখাগুলোকে কিছু পাঠক ‘পার্টিজান’ মনে করছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করছে, এমন কাউকে (তৎপুরুষ অর্থে) মৌসুমী ‘বঙ্গবন্ধু’ মনে করাটা অস্বাভাবিক নয়, বিশেষ করে প্রবাসী যারা বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ওয়াকেবহাল নন, তাদের জন্যে। বাংলাদেশের কোনো পার্টিই আমার ‘জান’ নয়, কোনো পার্টিও আমার মতো অতি সাধারণ শিক্ষককে ‘জান’ মনে করার প্রয়োজন বোধ করে না। বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে ঈষৎ কাছে ভিড়তে গেলেও কুকুর তাড়ানোর ভঙ্গিতে শুনতে হবে: ‘যান, যান!’ এই পরিস্থিতিই ছিল সব সময়, আছে এবং থাকবে এই দেশে, যেখানে, অর্বাচীন সংস্কৃতে বলা যায় ‘ধান্ধাহি কেবলম!’ অর্থাৎ ধান্ধা ছাড়া আর কিছু নেই। নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা এই দেশে ‘হংসমধ্যে বকো যথা!’ পার্টিতে ‘কাউয়া’’র অভাব নেই Ñ সেখানে স্বার্থতাড়িত হংসদের ভিড়ে গোবেচারা ‘বক’ আমরা টিকতে পারার কথা নয়।

গীতায় বলা হয়েছে: ‘জাতস্য হি ধ্রুব মৃত্যু’, অর্থাৎ জন্মেছে যে তাকে মরতেই হবে। কিন্তু যতকাল বাংলাদেশ রাষ্ট্র থাকবে, ততকাল যে বঙ্গবন্ধুও থাকবেন- এই পরম সত্যে সন্দেহ করার কোনো কারণ কি আছে? বঙ্গবন্ধুর বয়সও বাড়বে না, কারণ অকালে হত্যা করে বঙ্গশত্রুরা তার বয়সটাও আটকে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করে, বঙ্গবন্ধু তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। কিন্তু আওয়ামী লীগেও ‘বঙ্গবন্ধু’ নয় সবাই। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন: সুদূর বা নিকট অতীতের কোনো বঙ্গশত্রু কি আওয়ামী লীগে এসে সঙ্গগুনে ‘বঙ্গবন্ধু’তে রূপান্তরিত হতে পারে না? উত্তর হচ্ছে: না। সাধারণত উল্টোটাই দেখা যায়, যদিও ব্যতিক্রমই নিয়মের অস্তিত্বের প্রমাণ।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সিরিয়াস কোনো গবেষণা কি হয়েছে গত পাঁচ দশকে? ওষ্ঠসেবা ও তৈলমর্দন ছাড়া নৈব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তথ্যসমৃদ্ধ লেখালেখি কি দেখেছি আমরা পত্রপত্রিকায়, মুজিববর্ষে, গত এক বছরে? কাঁচা কলমে লেখা তৈলাক্ত সব রচনা দিয়ে পত্রিকার কলাম ভরে ফেলা হচ্ছে। দেখছি এবং দেখে আহত হচ্ছি যে, আওয়ামী লীগের কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে ধারণে সক্ষম হচ্ছেন না। প্রমাণ, বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার খণ্ডিত ভার্সন প্রচার করা হচ্ছে, রেখেঢেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলা হচ্ছে, নিজেদের জন্যে স্পর্শকাতর বিষয়, যেমন সমাজতন্ত্র কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা কৌশলে বাদ দিয়ে। হায় বঙ্গবন্ধু! তোমাকে ইচ্ছেমতো এডিট-ডিলিট করছে ‘বঙ্গবন্ধুরা’ই। এমন হওয়াও অসম্ভব কী যে বঙ্গবন্ধুর ভেক ধরে বঙ্গশত্রুরাই কলকাঠি নাড়ছে ভেতর থেকে? বঙ্গশত্রুদের মুখে ‘শেখা বুলি পাখির মতো’ আওড়ে যাচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু’রা।

সামাজিক মিডিয়ার বঙ্গশত্রুদের একেক জনের একটি অতি ব্যক্তিগত পোস্টও হাজার হাজার বার পঠিত হয়। শত্রু মাত্রেই নিজের শক্তিপ্রদর্শনে, প্রতিপক্ষের ক্ষতিসাধনে সদাতৎপর, সদা জোটবদ্ধ। বন্ধুমাত্রেই অনাগ্রহী, সাবধানী, ভীতুই বলি না কেন? বঙ্গবন্ধুর জীবন চরিত্র বিষয়ক রচনা পড়ে মন্তব্য করতেও বঙ্গবন্ধুরা সাবধানতা অবলম্বন করেন। মনে ভয়, বঙ্গশত্রুরা যদি তাকে চিনে ফেলে! বঙ্গবন্ধুর সাহসের কণামাত্রও হালের ‘বঙ্গবন্ধু’দের নেই। ধান্ধাবাজদের অবশ্য সাহস থাকার কথাও নয়। যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী থাকাকালে বঙ্গবন্ধু রিকশায় চড়ে থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, যখন কিনা শেরেবাংলা, মোহন মিয়া, নান্না মিয়ারা কাঁপছিলেন গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে।

পরিস্থিতি সঙ্গিন। আজ যুদ্ধক্ষেত্রে এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও বঙ্গবন্ধুই একমাত্র আলোকবর্তিকা। ওষ্ঠসেবা নয়, প্রয়োজন তার জীবনের নিবিড় পাঠ ও সচেতন অনুসরণ! আপনারা ‘প্রকৃত বঙ্গবন্ধু’রা যদি বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন না করেন, তবে বঙ্গশত্রুরা সেই আলস্য কিংবা বিস্মৃতির সুযোগ নেবেই নেবে। মূল্যায়ন না করলে বন্ধু মনে কষ্ট পায়, কিন্তু (বঙ্গ)শত্রুদের স্বভাবই হচ্ছে প্রতিশোধ নেয়া। সে প্রতিশোধ কেমন চরম হতে পারে, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যা তার চাক্ষুস প্রমাণ। এত কঠিন প্রতিশোধ নিয়েও কিন্তু তাদের গায়ের ঝাল মেটেনি। সুতরাং সাধু সাবধান!


শিশির ভট্টাচার্য্য অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ