বুধবার , ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

জীব বৈচিত্রে ভরা গোপালগঞ্জে চান্দার বিল

  বুধবার , ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : ১০হাজার ৮৯০ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তিৃত চান্দার বিল জীব বৈচিত্র্যে ভরা এক বিশাল জলাভূমি । এর পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত  মধূমতি বিলরূট ক্যানেল । গোপালগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী চান্দার বিল আজ থেকে প্রায় ৪হাজার বছর আগে উচুঁ বনভূমি ছিল বলে জানা যায় । এখানে তখন জনবসতি ছিল না, ছিল বন্যপশুর অবাধ বিচরন । ভূমিকম্পের ফলে ঐসব বনভূমি দেবে গিয়ে বিশাল জলাভূমিতে পরিনত হয় । বিগত ৩শ’বছর আগে  চান্দার বিল এলাকা ঘিরে মানুষের বসতি গড়ে উঠে । গোপালগঞ্জ জেলার সদর, মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৩৪ টি মৌজা নিয়ে আজকের যে চান্দার বিল তার মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার লোকের বসবাস । এখানে সব সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস। শতকরা ৭০ভাগ লোক কৃষিকে প্রধান পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন । যাদের অনেকেই বছরের বেশীর ভাগ সময় কৃষি কাজ এবং বাকী সময় মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে । খন্ডকালীন মৎস্য শিকার ছাড়াও অনেক জেলে সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে যাদের কেবল মাছ ধরাই পেশা । এখানে এক সময় এত বিপুল পরিমান প্রাকৃতিক মাছ ছিল যে চান্দার বিল বৃহওর ফরিদপুর জেলার মাছের অভয়ারন্য হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠে । মাছের প্রাচুর্যের জন্য এ বিলকে এখনও বলা হয় গোপালগঞ্জের মৎস্য কেন্দ্র । চান্দার বিলে সাড়ে ৫ হাজার মাছের কুয়ায়/পুকুরে সারা বছরই মাছ ধরা হয় । এখন মাঘ মাসে শেষের দিকে ও ফাল্গুন মাস ধরে প্রকৃতিক পুকুরগুলোর পাম্প মেশিন দিয়ে পানি সেচের মাধ্যমে প্রচুর পরিমানে দেশি ধরা হয়। যা গোপালগঞ্জ জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় পাইকার ব্যবসায়ীরা এ মাছ বিক্রির জন্য নিয়ে যায়। এছাড়াও অনেক বড় বড় পুকুর আছে যা পানি সেচ দেওয়া যায়না সেগুলো জাল দিয়ে বেড় দিয়ে প্রচুর মাছ ধরা হয়। এভাবে মাছ ধরার ফলে ক্ষুদে পোনা এবং মাছের ডিম পর্যন্ত বিনাশ হয়ে যায় । চান্দার বিলে মাছের পাশপাশি রয়েছে বিপুল পরিমান শামুক । বিগত ৭/৮ বছর যাবৎ এ শামুক ব্যাপক ভাবে নিধন করা হচ্ছে । 
এখানকার শামুক চিংড়ির খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় । প্রতিদিন প্রায় ৫০টি ট্রলার ও শতাধিক ডিঙ্গি নৌকা করে মানুষ শামুক ধরায় ব্যস্ত থাকে। অসংখ্য দরিদ্র নারী ও পুরুষ শামুক ধরাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে । জেলাসহ দক্ষিনাঞ্চলে যেখানে চিংড়ি চাষ হচ্ছে সেখানে এগুলো নিয়ে যাওয়া হয় । এলাকায় কর্মরত বেসরকারি পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা বি,সি,এ,এস-এর এক জরিপের তথ্যে জানা যায়, প্রতি মাসে চান্দার বিল থেকে গড়ে ২ হাজার টন শামুক ধরা হয়। এভাবে শামুক নিধন অব্যাহত থাকলে চান্দার বিল থেকে এক সময় শামুক বিলীন হয়ে যাবে বলে আশংকা প্রকাশ করা হচ্ছে । যা পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে । প্রায়১৫০০জন লোক কুচিয়া ধরে চান্দার বিলের জলজ প্রানীর নিধন করছে। যার মধ্যে কুচিয়া অন্যতম । কুচিয়া দেখতে সর্পাকৃতি এক ধরনের মাছ বিশেষ । এ বিলে কি পরিমান কুচিয়া আছে তা নিরূপন করা সম্ভব নয় । কার্তিক, মাস থেকে জৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কুচিয়া ধরার উপযুক্ত সময় । সম্প্রতি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও শেরপুর এলাকার খ্রীষ্টান উপজাতি এবং রংপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন চান্দার বিলে কুচিয়া ধরতে আসে । একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপে জানা গেছে, প্রায় দেড় হাজার লোক কুচিয়া ধরতে আসে এই বিল এলাকায় । প্রতিদিন একজন শিকারী ৫ কেজি থেকে ১০কেজি পর্যন্ত কুচিয়া ধরে বলে জানা যায়। প্রতি কেজি কুচিয়া স্থানীয় বাজারে ১০০টাকা থেকে ১২০টাকায় বিক্রি হয় । শিকারীরা জানায়, এসব কুচিয়া ভারত ,নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করা হয় । কুচিয়া ঐসব দেশের একশ্রেনীর মানুষের প্রিয় খাদ্য । আমাদের দেশেরও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ কুচিয়া মাছ খায় । চান্দার বিলের খনিজ সম্পদ পিট কয়লা এ বিলের আরেকটি সম্পদ । নদীর তীরে মাঠ-ঘাঠ কিংবা বিল অঞ্চলের ৩/৪ হাত মাটি খুড়লে বেরিয়ে আসে পিট কয়লা । কোদালের সাহায্য মাটির নিচ থেকে এ কয়লা উওোলন করেছে । উওোলনকারীরা নৌকা নিয়ে এসব কয়লা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে । মাঝারি সাইজের এক নৌকা পরিমান পিট কয়লা তারা৩০০ টাকা থেকে ৪০০টাকায় বিক্রি করে থাকে । ওই এলাকায় রান্নার কাজে জ্বালানী হিসাবে পিট কয়লা ব্যবহার করা হয় । বিল চান্দা গ্রামের বেশ কয়েক জন গৃহবধুকে পিট কয়লা দিয়ে রান্না করতে দেখা গেছে । এই পিট কয়লার রান্না খাবারে কিছুটা গন্ধ অনুভূতি হয় বলে তারা জানান। পিট কয়লায় রান্না খাবার খেলে গ্যাষ্ট্রিকসহ নানা রকম রোগ ব্যাধি হয় বলেও জানান এলাকায় লোকজন। যে কারনে অনেক গৃহবধূ জ্বালানী সংকট সত্বেও কয়লায় রান্না করেন না । অতিথি পাখির আগমন চান্দার বিলে এখনো অতিথি পাখি আসে । কিন্তু আগের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে না । বিল এলাকার গ্রাম কৃষ্ণ নগরের ৭০বছরের বৃদ্ধ শ্রীধাম কীর্ওনিয়া জানায়, স্বাধীনতার আগে শীতকালে যেভাবে ঝাকে ঝাকে হাজার হাজার পাখি চান্দার বিলে দেখা যেত তা আর এখন দেখা যায় না । কয়েক বছর আগেও শীতকালে বেশ কিছু অতিথি পাখির আগমন ঘটতো । শিকারীদের উৎপাতে অতিথি পাখির আগমন  হ্রাস পেয়েছে । শীতকালে হাতে গোনা কিছু অতিথি পাখি আসলে ও স্থানীয় শিকারীরা ফাঁদ ও বিষ প্রয়োগ করে এগুলেকে হত্যা করে । শিকারীদের হাত থেকে রক্ষা পায় না দেশী পাখিরাও । সারা বছরই দেশীয় পাখিদের মৃত্যু ঘটে শিকারীদের হাতে । তারপরও চান্দার বিলে পাখি আসে পাখি যায় । পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী কৃষক গৌর চন্দ্র বৈরাগী বলেন, আগের মতো বিপুল পরিমান পাখি এখন আসে না বটে । কিন্তু শীতকালে কিছু অতিথি পাখি এবং সারা বছর নানা প্রজাতির দেশী পাখি চান্দার বিলে দেখা যায় । শিকার বদ্ধ করা করা সম্ভব হলেই চান্দার বিলে পাখি বিচরন বাড়বে বলে সচেতন এই কৃষক তার অভিমত ব্যক্ত করেন । দেশে অতিথি পাখিসহ দেশী পাখি শিকার নিষিদ্ধ রয়েছে এ ব্যাপারে জানা আছে কিনা জিজ্ঞসা করা হলে তিনি জানান, শুনেছি এ সংক্রান্ত আইন রয়েছে কিন্তু এ বিশাল বিলে কোন দিন এর প্রয়োগ দেখিনি । 
পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ডে চান্দার বিলের হাজার হাজার জীব বৈচিএ এখন হুমকির মুখোমুখি। সম্প্রতি এ প্রতিবেদক চান্দার বিল এলাকার সরেজমিন পরিদর্শন করতে গিয়ে জলাভূমির করুন হাল দেখেন । যদিও চান্দার বিলের চিরন্তন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হুমকির মুখোমুখি হয়ে তার ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে । তথাপি বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভান্সড ষ্টাডিজ (বিসিএএস) এর তৎপরতা কিঞ্চিৎ আলোর পথ দেখাচ্ছে । সংস্থা চান্দার বিলের পরিবেশের উপর নাটক, সেমিনার, আলোচনা সভা, র‌্যালী সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনসাধারনকে সচেতন করার কাজ চালাচ্ছেন । সময়ই বলে দেবে তারা কতটুকু সফলতা অর্জন করেছেন। টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচীর অধীনে আইডউসিএন-এর  প্রকল্প হিসাবে মধুমতির প্লাবন এলাকায় জীব বৈচিএর উপর বিসিএএস কাজ করে আসছে । এই প্রতিষ্ঠানটি চান্দার বিল এলাকার জনগনকে বিভিন্ন মুখী প্রকল্পের মাধ্যমে সচেতন করে এই জলাভূমির জীব বৈচিএ্য রক্ষার প্রয়াস চালাচ্ছেন।  প্রাকৃতির বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অভয়ারন্য গড়ে তোলার অভিমত দিয়েছেন সচেতন মহল।

 

 ফিচার থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ