মঙ্গলবার , ২০ এপ্রিল ২০২১ |

বিজয় দেখার দিন

মোহাম্মদ ইস্তাক হোসেন   মঙ্গলবার , ১৫ ডিসেম্বর ২০২০

১৯৭১ সালে স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছি। বছরের প্রথম দিকে ক্লাসে প্রতিদিনই যেতাম। নতুন বইপড়ার আনন্দ কেবল পেতে শুরু করেছি। নতুন বইয়ের সবগুলো পাতাউল্টিয়ে দেখার সুযোগ হয়নি। হঠাৎ আমরা দেখলাম আমাদের  স্কুলের মাঠে কারা যেন দখল করে আনাগোনা শুরুকরে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চ মাসের প্রথম দিকে আমাদের স্কুলে পাকিস্তানি সৈন্যদের ক্যাম্প গেড়ে বসেছে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আমরাচারতলা থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের শারিরীক কসরৎ ও খোলা মাঠে বড়বড় রুটি বানানোর মহড়া দেখতাম। যেন তারা খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই সে কাজগুলোকরে যাচ্ছিল। কিন্তু খুব বেশি দিন তাদের সেসব কসরৎ দেখতে হয়নি। স্কুল বন্ধহয়ে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

আমরা থাকতাম বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরবাড়ির কাছাকাছি। পায়ে হাঁটাদূরত্বে। স্কুল বন্ধ। সকাল-বিকাল আমিবঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে হাজির হতাম। ঘোরাঘুরি করতাম। রাজনৈতিকবিষয়ে সবার মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুনতাম। তাঁর বাড়ির সামনেসব সময়ই মিছিল- স্লোগান হতেই থাকতো। একদিন লম্বা গড়নের একজন লোক আমাদের সামনে এসে বলল,এই পোলাপাইন চল স্লোগান দেইঃ আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, আমার ভাই তোমার ভাই শেখ মুজিব শেখ মুজিব,জেলেরতালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো। দশ-বারো জন আমার বয়সী ছেলেদের সাথে লম্বা ছেলেটি৩২ নম্বর ও চারপাশের রাস্তায় ঘুরেঘুরে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিল আর স্লোগান দিচ্ছিলঃ আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, আমার ভাই তোমার ভাই শেখ মুজিব শেখ মুজিব,জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো। আমার খুব ভালো লাগছিল মিছিলে থেকে স্লোগান দিতে। মিছিলের সেইলম্বা ছেলেটি ছিল আমাদের বঙ্গবন্ধু জাতির পিতার ছেলে শেখ কামাল। সেদিনছিল আমার বিজয় দেখার প্রথম দিন।

প্রতিদিন সকাল-বিকাল এরকম মিছিলেযাওয়া ও স্লোগান দিতে দিতেএকদিন দেখলাম ৩২ নম্বর বাড়ির সামনেঅন্য দিনের চেয়ে বেশি ভীড়। ছোট হওয়ায় কাছে যেতে পারিনি। দূর থেকেদেখলাম বঙ্গবন্ধু উপরে দাঁড়িয়ে থেকে হাত নেড়ে সবাইকেকিছু বলছেন। দূরে থাকায় কিছু শুনতে পাইনি। কেবল মনে হল সেদিন আমি বিজয় দেখছি।

মার্চ মাস। স্কুল বন্ধ। চারদিকে সবারমধ্যে উৎকন্ঠা।  মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে কোন একদিন আমাকে ও আমার ছোট ভাইকেআমাদের ছোট চাচা গ্রামের বাড়িতে রেখে এলেন দাদা-দাদীর কাছে। চাচা ঢাকাগেলেন আমার বাবা-মা, অরো দুই ভাই,দুই বোনকে নিয়ে একসাথে গ্রামের বাড়িতেআসার জন্য। পঁচিশে মার্চের পৈচাশিক হত্যাকান্ড শুরু হয়ে গেছে, কিন্তুতারা বাড়ি এলেননা। তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল লোকমুখের কথা। আমরা তাদেরকোন খবরই পাচ্ছিলামনা। অজানা আশঙ্কায় মন উৎকন্ঠায় ভরা ছিল। একসপ্তাহ পরে একদিন শোনা গেল আমার মা-বাবা,চাচা, ভাই-বোন সবাই নদীর ঘাটেএসেছেন। দৌঁড়ে গেলাম সবাই। তারা সবাই সাত দিন সাত রাত হেঁটে ঢাকা থেকেবরিশাল আমাদের গ্রামের বড়ি এসে পৌঁছান। সেদিন দেখেছি আরেক বিজয়।

গ্রামের বাড়ি, ঘুরেবেড়াই। এটা দেখি, ওটা ধরি,সেটা ছিঁড়ি। কত আনন্দ! এর আগে এত দিনএকসঙ্গে গ্রামের বাড়ি বেড়ানো হয়নি। অনেক দিন কেটে গেছে। আমাদের গ্রামে এখনোঅনেক অজানা লোক আসে। কেউ ঢাকা থেকে,কেউ অন্য শহর থেকে, কেউসন্ধ্যা-রাতে আসে। বাড়ির সব ঘরথেকে ভাত-ডাল তুলে সবাইকে খাওয়ানোরকাজে আমিও থাকি। একাজে অন্য রকম তৃপ্তি। পরে শুনেছি, সন্ধ্যা-রাতেযারা আসতেন, আমাদের বেড়ে দেয়া ভাত-ডাল খেতেনতারা  বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি, অকাশবাণী কোলকাতার খবর এবং কোন কোন মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনে মনে হত বিজয়আমাদের খুবই কাছে।

ষোলই ডিসেম্বর এলো। গ্রামের বাড়িতেনদীর পাড়ে লোকে লোকারণ্য। সবাইউল্লাস করছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।কী যে আনন্দ! আমাদের বিজয় হয়েছে। এ বিজয় আমাদের বিজয়। মুক্তিকামীমানুষের বিজয়। জানুয়ারিতে বাবার সাথে আমরা বড় দুইভাই ঢাকা এলাম। চারদিকে তখনো বিজয়ের আনন্দ। তবে আনন্দ যেন পরিপূর্ণতা পাচ্ছেনা। সবাই ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে জড়ো হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ছাড়াআনন্দ লাগছে না। ১০ জানুয়ারি ফিরলেন বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে। এআনন্দ মন ভরা আনন্দ। এ আনন্দ বিজয়ের আনন্দ। অমি সেদিনও বিজয় দেখেছি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা আমাদের প্রধানমন্¿ী শেখ হাসিনা। তিনি বঙ্গবন্ধুরঅর্জিত বিজয়কে ধরে রেখেছেন। দেশ পরিচালনায়,দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়তাঁর বিজয় আজ দেখার মতো। দেশের অর্থনীতি,শিক্ষা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, কূটনীতি, বিশেষকরে করোনাকালে অর্থনীতি সচল রাখা, সর্বোপরি সকল ক্ষেত্রে আমাদের বিজয় আজদেশ-বিদেশের সকলের চোখে পড়ার মতো। স্বপ্নের পদ্মা সেতুআজ সকলের বিজয়ের চিহ্ন হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আজ বিজয় চারদিকে। 

এত বিজয় আমাদের, এতবিজয় বাঙ্গালির। এ বিজয় ধরে রাখতে হবেই। এ বিজয়আরো বিজয় অর্জন করতে আমাদের নিরন্তর উৎসাহ দিয়ে যাবে। আমরা বিজয় দেখেই যাবো। বিজয়, শুধু বিজয়।।

সাবেক মহাপরিচালক, ডিএফপি ।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ