মঙ্গলবার , ২০ এপ্রিল ২০২১ |

বাংলাদেশের ইতিহাসে শতাব্দির শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃতির মতোই আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাথে বহমান।তাঁরসৃষ্টির ছোঁয়ায় আমরা একটি মানচিত্র পেয়েছি,পেয়েছি স্বাধীন একটি দেশ,যারনাম বাংলাদেশ।পেয়েছি লাল সবুজের পতাকা ।

আশ্চর্যের বিষয় এই স্বাধীন বাংলাদেশের উৎপত্তি একটিতর্জনীর ইশারা একটি মুখের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর থেকে। যদিও এদেশের স্বাধীনতার জন্য রজবআলী,সূর্যসেন,প্রিতিলতা,কল্পনাদত্ত,তিতুমীর,খুদিরাম,শেরে বাংলা,সোহরাওয়ার্দী,ভাষানী সহ অনেকেই বুকের রক্ত দিয়েছে স্বাধীনতা কারওহাতে আসেনি ।টঙ্গীপাড়ার খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেই ছেলেটির হাতেই এসেছে স্বাধীনতা••••সে অনেক কথা অন্য আরেকদিন লিখবো সেসব।

 

হ্যা দিনটি ছিল ৭ মার্চ ১৯৭১ সাল। ঢাকার রেসকোর্সময়দানে লাখো লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন একটি মানুষের মুখ থেকে উচ্চারিতকিছু শব্দাবলী বিচ্ছুরিত হয়ে একটি দেশের মুক্তিকামী মানুষদের করেছিলে উদ্বেলিত,নিরস্ত্রবাঙ্গালী স্বপ্ন দেখেছিলে একটি স্বাধীন দেশের।৯ মাস ১ সমুদ্র রক্ত দিয়ে কেনা এদেশটি-বাংলাদেশ । যে দেশটি এখন পৃথিবীর বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েআছে।যে দেশটি এখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ।

 

অথচ এই ভূখন্ডের পূর্বসূরী রা ছিলো ২ হাজার বছরপরাধীন।পদ্মা মেঘনা যমুনা বিধৌত এই পলি ভূমিতে আর্য-মৌর্য-গুপ্ত সাম্রাজ আমাদের এইভূখন্ড দখল করে সেই সপ্তম শতাব্দী থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলো পরাধীন।পাল বংশ,সেনবংশ একের পর এক শোষক দল শাসনের নামে করেছে শোষন।অথচ এ দেশটির জন্ম হয়েছিল উর্বরপলিতে।সে অনেক ইতিহাস।

 

যা হোক তলিয়ে যাওয়া রক্ত নদীর প্রবাহ বোমার আঘাতেঝলসে যাওয়া আগুনের কুন্ডলি থেকে এত এত রক্ত,এত এত মানুষের আত্মবলিদানে অর্জিত যে স্বাধীনবাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা আজ বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আমরাউড়তে দেখি সেই পতাকার মর্মর ধ্বনিতে আজও বেজে ওঠে •••আমাদের কেউ দাবাইয়া রাখতেপারবানা।

 

কী ছিল সেই জাদুর ভাষণে?

যার প্রতিধ্বনি আর আঙ্গুলের ইশারায় সাতকোটি নিরস্ত্রবাঙালি চোখের নিমিষে ঝাঁপিয়ে পড়লো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সামনে! যে ভাষনশুনে মানুষ নিজের জীবনকে হাতে নিয়ে এগিয়ে চললো নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে।

বস্তুত,ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকেঅনুধাবন করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে।

১৯৪৭ সালে যখন ভারত পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্রে ভাগহয়ে যায়। আর ভৌগোলিক মানচিত্রের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানদুটি আলাদা জনপদের সমন্বয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয়।কিন্তু এইরাষ্ট্রের যাবতীয় শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতেই রয়ে যায়।পূর্ব বাংলারলোকেরা প্রতিটি পদে পদে তাদের অধিকার বঞ্চিত হতে থাকে।

এমনকি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুতে পরিণতকরার প্রস্তাব করা হয়।সেই থেকে পূর্ব বাংলার মানুষ অনুভব করতে পারে পাকিস্তাননামক রাষ্ট্রটি তাদেরকে কেবল দাসত্ব বানিয়ে রাখতে চায়।

 

তারপর ১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের মাতৃভাষারদাবিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে গর্জে উঠলো। আর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী নির্বিচারেগুলি চালালো ছাত্র জনতার ওপরে।রফিক,শফিক, সালাম,জব্বার ও বরকতের তাজা রক্তে ছেয়ে যায় ঢাকার রাজপথ।তার দুই বছর পরে ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় আইনসভার নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুলভোটে বিজয় লাভ করে,তবুও বাংলার মানুষ তাদের অধিকার বঞ্চিত থাকে।১৯৬৬ সালেপিতা মুজিবের ঐতিহাসিক ছয় দফার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণাঙ্গ  স্বায়ত্বশাসন তুলে ধরা হয়।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের কাছে ক্ষমতাহস্তান্তর না করে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর নানান অভিযোগ এনে বাঙালিদের ওপরেঅত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।সেই অন্ধকার সময়ে একজন বঙ্গবন্ধু উপলব্দিকরেছিলেন স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালি জাতির মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়।তারপর এলো সেইঐতিহাসিক দিন ৭ই মার্চ ১৯৭১।

বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যময়একটি দিন।ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে অনেকগুলি দিক পরিলক্ষিত হলেও বস্তুত সেইভাষণের মধ্যে দুটি দিক খুবই গুরুত্ব বহণ করে। একটি হলো ধৈর্য,আরেকটিদিক হলো সাহস। বঙ্গবন্ধু সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তেও তাঁর ভাষণে বলেছিল-শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারলে ভাই ভাই হিসেবে এদেশে বাস করার সম্ভাবনা আছে।এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেবার অনেক কিছুই আছে।যেকোনো ঝগড়া বিবাদ,সহিংসতামোকাবেলা করতে গেলে প্রথমে মানুষকে ধৈর্যশীল হতে হয়।ধৈর্য হারিয়ে ফেললে সবকিছুএলেমেলো হয়ে পড়ে।তাছাড়া যে কোনো পরিস্থিতির সমাধান করতে গেলে প্রথমে দেখতেহয় শান্তিপূর্ণ দিকটাকে।যদি শান্তিপূর্ণভাবে কোনোকিছুর সমাধান সম্ভব হয় তাহলেসেখানে যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই। কেনন যুদ্ধ মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। তাই তোবঙ্গবন্ধু সেই উত্তাল অবস্থার ভিতর দাঁড়িয়েও তিনি শান্তির বার্তাছড়িয়েছিলেন।কিন্তু তখনকার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল।বর্বর পাকিস্তান শান্তিকামীবাঙালির এই সংস্কৃতিকে আমাদের দুর্বলতা ভেবেছিল।তাই তো বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিশাসকদের এই মনোভাব বুঝতে পেরে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।

যখন মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায় তখন যুদ্ধই হয়েওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন,তখন মানুষকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেহয়।তাই তো সাত কোটি বাঙালি সেদিন এক প্রকার খালি হাতেই পাক বাহিনীর ওপরেঝাঁপিয়ে পড়েছিল।এটাই সাহস। কতটুকু সাহস প্রাণে সঞ্চারিত হলে মানুষ মরতেও ভয়পায় না।সেই সাহসের প্রবাহ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের মধ্যে ঢেলেদিয়েছিলেন।যার প্রতিফলন আমরা ২৬শে মার্চের পরে দেখেছি যখন ২৫ মার্চের কালরাত্রিতেবঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ যেনবিশাল মহাসমুদ্রে এক খণ্ড ভাসমান কাঠের টুকরায় পরিণত হয়েছিল।

এদেশে তখন নেতা বলতে মানুষ একজনকেই চেনে,একজনকেইজানে যার নাম-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।সেই নেতাই তখন এদেশের মাটিতে ছিলেন নাতিনি বাঁচবেন কি মরবেন,কোনোদিন ফিরবেন কিনা তাও কেউ জানত না।এদিকে দেশেযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা শহরসহ প্রতিটি গ্রামেগঞ্জেঢুকে নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে মারছে,বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।কী হবে এখন? কিকরে মুক্তি মিলবে ওই পাকিস্তানি হায়েনাদের থেকে?কে এখন সাহস যোগাবে? সবাইকি তাহলে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলির নিচে নিজেকে সঁপে দেবে? নাকিসবাই তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে?

না, এসবের কিছুই সেদিন হয়নি। হয়নি তার কারণ বাংলার আকাশেবাতাসে তখন ধ্বনিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। তোমাদের যা কিছু আছে,তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে; মনেরাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো;তবুও এদেশের মানুষকে মুক্ত করেছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম- আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারেরসংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম

সেই ভয়াল মুহূর্তগুলোতে বঙ্গবন্ধু ছিল না। কিন্তুতাঁর সেই বজ্রকণ্ঠ প্রতিটি মানুষের প্রাণে গাঁথা হয়েছিল।তাইতো বঙ্গবন্ধুরঅনুপস্থিতিতে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ,মো.মনসুরআলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিব নগরে স্বাধীন বাংলাদেশসরকার গঠন করেন।এই সরকারের অধীনেই সেদিন আমাদের মুক্তিযোদ্ধ সংগঠিত হয়।অতঃপরলাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা।

 

আজ মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে।৭১র সেই ভগ্নদশা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ জাতির জনকের কন্যাজননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে উন্নত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছে। এই এগিয়ে চলারমাঝেও আছে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের ইতিহাস। দেশ স্বাধীন হওয়ার চার বছর পরই বাংলাদেশেরবুকে ঘটে যায় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টস্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়।যেদিন দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবংশেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এদেশে শাসনভার পেয়ে যায় দুঃষ্কৃতিকারীস্বৈরশাসক গোষ্ঠী। তারপর যখন ১৯৮১ সালে ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখহাসিনা দেশে ফিরে আসেন, তখন থেকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটু একটু করে বদলেযেতে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ তখনও থামেনি। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৯০ সালে রাজনৈতিকআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে বাধ্য করা হয়।

কিন্তু ২০০৪ সালের ২১শে আগষ্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখহাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে ছোড়া হয় গ্রেনেড। অনেক নেতা কর্মী সেদিন জীবন হারালেওপ্রাণে বেঁচে যান জননেত্রী শেখ হাসিনা।এভাবে প্রতিটি পদে পদেই যুদ্ধ এবংষড়যন্ত্রের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তবুও বাংলাদেশ কখনও দমেনি, থেমেথাকেনি।কারণ এই বাংলার মাটিতে একজন বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন।যিনি তাঁর ৭ই মার্চেরভাষণে বাঙালি জাতি লড়াই করার মন্ত্র দিয়ে গেছেন।এই মন্ত্র যতদিন আমরা আঁকড়েথাকতে পারবো ততদিন বাংলাদেশ পথ হারাবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে চলবে দুরন্ত দুর্বারগতিতে।

 

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা ৭ইমার্চের সেই ভাষণ কতটা প্রভাবিত করে সেই আলোচনা বিশদ। তবে এটাই নির্মম সত্য যে- যেদিন আমাদের রাজনীতির মঞ্চে বঙ্গবন্ধুরভাষণ থেমে যাবে, যেদিন আমাদের ভিতর থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুছে যাবে, সেদিনইআমাদের রাজনীতি অন্ধকার সমুদ্রে নিমজ্জিত হবে।

জানি,সেইদিন এদেশের বুকে কোনোদিনও আসবে না।কেননা নদীমাতৃকএই দেশে যতদিন রবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বহমান

ততদিন রবে কীর্তি তোমার

•••শেখ মুজিবুর রহমানের



 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ