মঙ্গলবার , ২০ এপ্রিল ২০২১ |

মুজিববর্ষ-স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

বাংলাদেশ ভারতের কূটনৈতিক ৫০ বছরে মোদীর আগমন

রাজ্জাক হোসাইন রাজ   বৃহস্পতিবার , ২৫ মার্চ ২০২১

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরজন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের ১০ দিনের উৎসব শুরু হবেসেদিন থেকে। এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে একের পর এক আসছেন ৫ দক্ষিণ এশীয় শীর্ষ নেতা। প্রথম দিনে আসছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ।পর্যায়ক্রমে আসবেন শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালেরপ্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি,ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিংএবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এদের মধ্যে সবার চোখ মোদির সফরেরওপর।ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারআমন্ত্রণে ২৬-২৭ মার্চ বাংলাদেশ সফর করবেন। তিনি মুজিববর্ষ উদযাপন, বাংলাদেশেরস্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের যৌথ উদযাপনউপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই সফর

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে বাংলাদেশেরসুবর্ণজয়ন্তী কিংবা ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষে ঢাকাসফরের সাথে তার এই সফর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে হিন্দুত্ববাদীদের মনোবলচাঙ্গা করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার চেষ্টাও অন্যদিকে-মোদির সফর বাতিলের জন্যহেফাজতে ইসলাম সহ কয়েকটি বাম সংগঠন ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। যদিও সরকার বলছে ১৭থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত কোনও বিক্ষোভ বিশৃঙ্খলা তারা সহ্য করবে না। আমার মনে হয়মোদি যখন রাষ্ট্রীয় সফরের সঙ্গে তার রাজনৈতিক কর্মসূচিও মাথায় নিয়ে ঢাকায়আসছেন, তখন যারা নরেন্দ্র মোদির সফর নিয়ে প্রতিবাদ করতে চান তাদের এটামনে রাখতে হবে যে নরেন্দ্র মোদি বিজেপির নেতা হিসেবে শুধু বাংলাদেশ সফর করছেন না, তিনিভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফর করছেন•••বাংলাদেশের অত্যন্তবন্ধুপ্রতিম একটি রাষ্ট্রের সরকার প্রধানের বাংলাদেশ সফরের সময় এমন কোনওবিশৃঙ্খলা যাতে না হয়, যেটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে এবং বিশ্বের কাছেআমাদের মাথা নত হয়।

 

আমার মনে হয় আধুনিক বিশ্বে এসব বিষয় গুলোর চাইতে দুইদেশের সার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং দিপাক্ষীক সম্পর্ক উন্নয়নের কথা চিন্তা করারসময় এখন আমাদের। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড়গণতন্ত্রের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসছেন এটি খুবইগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়।আমরা আশা রাখছি বঙ্গবন্ধুরজন্মশতবার্ষিকী আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে  আসবেন নরেন্দ্র মোদি।মনে করা হচ্ছে, এইসফরে তাঁর সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্মত হওয়া আগের ইস্যুগুলোর অগ্রগতিনিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলতে পারেন। ভারত প্রতিবেশীকে ছাড় দেয় না- এটা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেমিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিক চুক্তিঅর্থনৈতিক উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে। দুই পক্ষ লাভবান হচ্ছে সমঝোতা স্মারকে। শেখহাসিনার প্রচেষ্টায় দুই দেশের অনেক দিনের সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে এবং নরেন্দ্রমোদির সফরের মধ্য দিয়ে আরও হতে যাচ্ছে। আর এজন্যই ২৬ মার্চ নরেন্দ্র মোদির এদেশসফর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

 

কেবল মোদি নন এদেশে একইসময় উপস্থিত থাকবেন মালদ্বীপেররাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মুহাম্মদ সলিহ,শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দারাজাপক্ষে, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী ও ভুটানেরপ্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং। অন্যদিকে সরাসরি যোগ দিতে না পারলেও চীনের রাষ্ট্রপতি, ফ্রান্সেররাষ্ট্রপতি ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী ভিডিও আকারে বক্তব্য পাঠাবেন। তবে চীনেররাষ্ট্রপতির বার্তা নিয়ে দেশটির একজন মন্ত্রী ঢাকায় আসবেন বলে জানা গেছে। তাঁর এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতেরকূটনৈতিক সম্বন্ধের দিগন্ত এখন অনেক প্রসারিত

 

মোদি যখন বাংলাদেশে তখন পশ্চিমবঙ্গসহ ৬ রাজ্যেবিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হবে। এই নির্বাচনে ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজ্যেতিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে নিজের দল বিজেপির পক্ষে প্রচারাভিযানে সংযুক্তহয়েছেন। তবে তাঁর কাছে বিষয়টি এতো দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। কারণ ২০১৯ সালের মেমাসে শুরু হওয়া নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার মেয়াদ ২০২৪ সালে শেষ হবে। মনে করাহচ্ছে, তখন তাঁর দেশ ভারত চীনকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশেপরিণত হবে, আবার এই দেশটি হবে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিরদেশ।আর একারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক গুরুত্ব বহন করে।

 

বলাবাহুল্য,মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের আন্তরিকসমর্থন ও সহযোগিতার জন্য দেশটির সরকার এবং ভারতের জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতাও ধন্যবাদ জানানো আমাদের সবসময় দায়িত্ব। তবে ২০২০ ও ২০২১ সাল মহামারির জন্যঅত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে এরমধ্যেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভালসহযোগিতামূলক লেনদেন গড়ে উঠেছে।ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আছে।নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অংশীদারিত্ব এগিয়ে যাচ্ছে। স্থল সীমান্ত বাণিজ্যে সমস্যাকমানো গেছে, কানেক্টিভিটি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন নতুন জিনিসযোগ হয়েছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে,দুদেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ়হয়েছে।

 

উল্লেখ্য-সফরের দ্বিতীয় দিন, ২৭মার্চ সকালে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ পরিদর্শন করেশ্রদ্ধা জানাবেন। তার অনুরোধে সফরসূচিতে সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে দুটি মন্দিরপরিদর্শন রাখা হয়েছে, যেখানে তিনি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিসরেমতবিনিময় করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সফরে মোদি যাতে গোপালগঞ্জ জেলায়মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান ওড়াকান্দি গ্রাম দর্শনে যেতেপারেন, সে জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে ভারত। তবে অনেকের মতে নরেন্দ্র মোদির এই প্রস্তাবিত ওড়াকান্দি সফরেরতাৎপর্য অবশ্য পুরোপুরি রাজনৈতিক। সেই কারণে ভারতীয় পত্র পত্রিকাগুলোর সংবাদ ওঅনুযায়ী বাংলাদেশ মোদির দল বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রেসহযোগিতা করছে কিনা? প্রশ্নটি যুক্তিযুক্ত হলেও মোদির অনুরোধ উপেক্ষা করাওবাংলাদেশের জন্য ছিল বিব্রতকর। ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এরকমঅনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন।

 

ভারতের কংগ্রেস,বিজেপি সব দলই বাংলাদেশের সরকারেরসঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতিভারতীয় নেতারা খুবই আস্থাশীল। কিন্তু বিব্রতকর বিষয় হচ্ছে, এইআস্থার মধ্যেও কোনও কোনও রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য হজম করা কঠিনহয়ে যায়। নরেন্দ্র মোদি যখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলেন তখনতার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপির নেতৃত্বস্থানীয় নেতা অমিত শাহের লাগামহীনকথাবার্তা দুই দেশের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানকারস্থানীয় নেতাদের বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তাসম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করার আরেকটি কারণ। তাদের হিন্দুত্ববাদী কার্যক্রম এবংবাংলাদেশ সম্পর্কে লাগামহীন কথাবার্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতেও উত্তেজনার প্রভাবফেলে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে চলমানকরতে চাইলেও এসব নেতার কথাবার্তা সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করে। সে কারণে ভারতীয়নেতাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে কথাবার্তায় লাগাম দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

 

যাহোক-বাংলাদেশ ও ভারত এই দুটি নিকট প্রতিবেশী দেশবহুমাত্রিক পারস্পরিক স্বার্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ। এর শুরুটা হয়েছিল ঘোরদুর্দিনে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সে সময় ভারতেরসর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি,রাজনীতি ও নিরাপত্তার বিবেচনায় দুটিদেশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে,এটাই বাস্তবতা। এ সম্পর্ক বাংলাদেশেরজন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ভারতের জন্যও। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতিআছে অনেক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরজন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও ভারত বাংলাদেশের কুটনৈতিকসম্পর্কের ৫০ বছরে দুই দেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে সেই প্রতিক্ষায়-

 

লেখক : সদস্য-বাংলাদেশ আওয়ামীস্বেচ্ছাসেবক লীগ

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ