রবিবার , ১০ সেপ্টেম্বর ber ২০১৭

Under Construction

ব্রেকিং নিউজ

কোথায় মানবতা!

  রবিবার , ১০ সেপ্টেম্বর ber ২০১৭

বাংলাদেশ-মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) সীমান্তের ওপার আর এপারে সৃষ্টি হয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়। আগুনে ধ্বংস হওয়া বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ঘরবাড়ি, জমিজিরাত আর স্বজনদের লাশ পেছনে ফেলে পাগলের মতো ছুটে আসছে রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ, অগ্নিদগ্ধ, বোমায় ঝলসে যাওয়া কিংবা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। অসংখ্য মুসলমান মহিলা এমনকি কিশোরী হারিয়েছে ইজ্জত-সম্ভ্রম। আবার পালানোর পথেও গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তে অসংখ্য স্থল মাইন পুঁতে রেখেছে মিয়ানমার সেনা ও সীমান্তরক্ষী বিজিপি। যাতে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পর কেউ আর ফিরতে না পারে। স্থলমাইন বিস্ফোরিত হয়ে মারা পড়ছে কিংবা পঙ্গু হচ্ছে অনেকে।

হাজার বছর ধরে বসবাসরত আরাকানী আদিবাসী ধর্মপ্রাণ ও শান্তিপ্রিয় জাতিগোষ্ঠী মুসলমান রোহিঙ্গাদের জীবন এবং মহিলাদের ইজ্জত-সম্ভ্রম একেবারেই বিপন্ন। কঠিন সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে সমগ্র রোহিঙ্গা জাতি। নিরীহ রোহিঙ্গাদের একটিই মাত্র অপরাধ তারা মুসলমান। মুসলমানদের সমূলে উচ্ছেদ করে মগবৌদ্ধ শাসকরাই সেখানে কায়েম করতে চায় মগের মুল্লুক! সেনাসদস্যদের নিষ্ঠুরতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে আরাকান। তাদের হত্যার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে গানপাউডার, পেট্রোল ও এই ধরনের আগ্নিবোমা। মুসলমানদের গ্রাম-পাড়াগুলোতে এখনো আগুন ধরিয়ে দেওয়া বাড়িঘরের সঙ্গে মসজিদ, মাদরাসা-মক্তব, পবিত্র কোরআন-হাদিস সমেত লাইব্রেরি ইত্যাদি ধ্বংস করে দিয়ে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলা হচ্ছে। হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশে ঘন ঘন চক্কর দিচ্ছে সেনারা। সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্মী সীমান্তরক্ষী বিজিপি, গোয়েন্দা, পুলিশ, নাডালা বাহিনী এবং চরম উগ্র মগদস্যু যুবকরা।

পাশবিকতার শেষ নেই। যৌথবাহিনী একের পর এক বর্গী স্টাইলে হামলে পড়ছে নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ঘরবাড়িতে। গত ১১ আগস্ট থেকে সীমিতভাবে এবং ২৪ আগস্ট কালরাত থেকে সুসংগঠিতভাবেই চলছে এহেন রোহিঙ্গা নিধন ও দমনাভিযান। হিংস্র হায়েনার মতো তাদের উন্মত্ততা থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। আরাকানজুড়ে মুসলমান বেছে বেছে চলছে সে এক অবর্ণনীয় নারকীয়তা, পাশবিকতা। এহেন বর্বর ও ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা, নিপীড়ন, বিতাড়নে লাখ লাখ নর-নারী শিশু-বৃদ্ধ আজ ঘরছাড়া। চলমান রোহিঙ্গা দমনাভিযানে গত দু’সপ্তাহে অনেক লাশ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিংবা ভেসে গেছে বাংলাদেশ- মিয়ানমার (আরাকান রাজ্য) সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে। দেশটির বন-জঙ্গল, পাহাড়-টিলা, খাল-বিলে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। উত্তর-পশ্চিম আরাকানের সঙ্গে লাগোয়া ২৭১ কিলোমিটারব্যাপী বান্দরবান-কক্সবাজারের ৩০টিরও বেশি স্থল ও নৌপথের সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার অপেক্ষায় আছে এ মুহূর্তে কমপক্ষে আরো দেড় থেকে দুই লাখ রোহিঙ্গা। এ যাবৎ কোনোমতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা পৌনে দুই লাখ হতে পারে। যাদের বেশিরভাগই মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ও আহত।

এদিকে জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পারে তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। তারা দীর্ঘ এক মাস ধরে অনাহারে, রোগে-শোকে এখন ক্লান্ত ও অসাড়-অবসন্ন। তাদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয়, চিকিৎসা এমনকি টয়লটের অবস্থা খুবই নাজুক। যেভাবে দলে দলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে তাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সঙ্কট মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। আর অন্যদিকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের খলনায়িকা অং সান সু চি নির্বিচারে রোহিঙ্গা গণহত্যা-নিপীড়নে অনুতাপের পরিবর্তে সাফাই গাইছেন আর বলছেন, ‘রাখাইনে (আরাকান) সবাইকে আমরা রক্ষা করছি, সেখানে সকল নাগরিক নিরাপদ। বিশ্বের মিডিয়া ভুয়া খবর ও ছবি প্রকাশ করে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিচ্ছে!’ সু চির মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে এখন বিশ্বের দেশে দেশে উচ্চারিত হচ্ছে প্রতিবাদ-ঘৃণা-ধিক্কার।

এদিকে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ ও অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের মতে, আরাকান রাজ্যের পরিস্থিতি অগ্নিকুন্ডের মতোই। কেউই সেখানে নির্যাতন থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। চরম দলন-পীড়নের মুখে যে যেদিকে পারছে সেদিকে ছুটছে। পেছনে তাকানোর পরিস্থিতি নেই। প্রতিদিন তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে অথবা বিক্ষিপ্তভাবে পালিয়ে এসে ঠাঁই নিচ্ছে সীমান্তের দিকে। জিরো লাইনে এখনো অপেক্ষায় আছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। অনাহার-অর্ধাহারে, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের অভাবে তাদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা নেই। রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের টেকনাফের নাইটংপাড়া, লেদা, জাদিমুরা, হ্নীলা, কানজারপাড়া, হোয়াইক্যং, উখিয়ার মনখালী, ছেপটখালী, বালুখালী, রহমতের বিল, আনজুমানপাড়া, ধামনখালী, পার্বত্য বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির আমবাগান, তমব্রু, ঘুমধুম, আশারতলী, দোছড়িসহ ৩০টিরও বেশি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। দিন দিন বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তজুড়ে কড়া টহল দিয়ে যাচ্ছে। এ যাবৎ কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফও) বাংলাদেশ মুখপাত্র দ্বীপায়ন ভট্টাচার্য মিডিয়াকে জানান, জাতিসংঘ কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন যে, ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে আসতে পারে। এখন তারা মনে করছেন এ সংখ্যা তিন লাখে পৌঁছাতে পারে। যারা আসছে সবাই অপুষ্টির শিকার। সম্ভবত এক মাসেরও বেশি সময় যাবৎ তারা প্রয়োজন মতো খাবার পায় না। তাদের ক্ষুধার্ত ও ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা নৌকাযোগে এবং স্থল সীমান্তের অনেক জায়গা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর ন্যূনতম চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে ত্রাণ সংস্থাগুলো।

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ