বুধবার , ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ |

ক্ষমতাসীন সরকার যখনই কিছু করে, তার একটি কেতাবি ভাষা থাকে। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় চমক থাকে। তার সাথে সাথে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে। রাজনীতিকেরা যেমন বলে থাকেন- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। তার উল্টোটি আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তারা মনে করেন- রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। আর গণতন্ত্র সম্পর্কে আব্রাহাম লিঙ্কনের সেই বহুল উচ্চারিত প্রবাদটি এভাবে বলা যায়- ‘ডেমোক্র্যাসি অব দ্য পার্টি, বাই দ্য পার্টি অ্যান্ড ফর দ্য পার্টি।’ ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা যদি সত্যি হয়, তবে তার সর্বশেষ নমুনা হলো মাদক দমনের নামে দেশব্যাপী তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ বেপরোয়া পাঁয়তারা। এটা যে জনগণকে প্রতারিত করার একটি কৌশল, তা বোঝা যায় মাদকবিরোধী অভিযানের লক্ষ্য ও প্রক্রিয়া দেখে। গাছের গোড়া উপড়ে না ফেলে দৃশ্যমান শাখা-প্রশাখা কেটে নেয়া যেমন নিরর্থক, তেমনি মাদক সেবনকারীদের ধরে ধরে নিধন করাও অর্থহীন। চলমান অভিযানে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গত ১০ দিনে মাদক কারবারিদের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৪১ জন নিহত হয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ মাসের ১৫ তারিখে দুইজন, ১৭ তারিখে তিনজন, ১৮ তে একজন, ১৯ শে তিনজন, ২০ শে চারজন, ২১-এ ৯ জন, ২২ শে ১২ জন ও ২৩ শে সাতজন নিহত হয়েছে। এ কলামে একবার শিরোনাম ছিল ‘বন্দুকযুদ্ধ : যে গল্পের শেষ নেই’, সেই একই গল্প প্রতিদিন নানা রঙে, নানা ঢঙে বয়ান করা হচ্ছে। ২৩ তারিখ রাতের ‘বন্দুকযুদ্ধ’কে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কিছু পুলিশও আহত হয়েছে।

মিথ্যাকে সত্য করার জন্য যদি ১০০ মিথ্যা কথা বলা হয়, তাহলে মিথ্যাটি সত্য হয়ে যায় না। চলমান অভিযানবিরোধী একটি জাতীয় ঐকমত্য ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। ডান-বাম, পূর্ব-পশ্চিমের সব মত ও পথের ধারকেরা একবাক্যে এর প্রতিবাদ করছে। কিন্তু সরকার অন্যসব বিষয়ের মতো এ ব্যাপারেও অনড়। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, আরো ৫০০ জনের নাম রয়েছে হিট লিস্টে। সেই সাথে ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মাদকবাণিজ্য’-এর অভিযোগ বেশ জোরেশোরেই গণমাধ্যমে উত্থাপন হয়েছে। এরা বিরোধী দল ও স্থানীয় অবস্থাপন্ন ব্যক্তিদের হুমকি-ধমকি দিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। তাই বলা দরকার, মাদক দমন অভিযান যেন প্রতিপক্ষ দমন অভিযানে পরিণত না হয়।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বিএনপি মাদকবিরোধী অভিযান চায়; কিন্তু সেটি অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হতে হবে। তাই ক্রসফায়ার নয়, আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার করতে হবে। ২৩ মে ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে তিনি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তাদের নেতাকর্মী হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা খন্দকার মোশাররফ হেসেন অভিযোগ করেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ী, এমনকি উপজেলা পর্যায়ের নেতারাও এই ব্যবসায়ের সাথে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।”
অপর দিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’সহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে মাদকের ভয়াবহতা নিরসনে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি। দলটি বলেছে, যারা বিদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক এনে বিস্তৃত চক্রের মাধ্যমে গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেই উৎসমূল বন্ধ না করে, তাদের বিচারের আওতায় না এনে কিছু চুনোপুঁটি মাদকবিক্রেতাকে হত্যা করে এই মারাত্মক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিবৃতিতে মাদক দমন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সমস্যা সমাধানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সিপিবি পরোক্ষভাবে এক দিক নির্দেশ করলেও জাতীয় পার্টি প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেকটা প্রত্যক্ষভাবেই বলেছেন : ‘মাদক সম্রাট সংসদেই আছে, তাদের ফাঁসিতে ঝুলান।’ সিভিল সোসাইটিতে এ ধরনের নির্বিচার হত্যায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।’ সরকারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথায় রাখতে হবে।’ কমিশন বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড তারা সমর্থন করে না।’
মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে মাদকের ব্যবহার নির্মূল করা সম্ভব নয়। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরূপ মত পোষণ করেন, তবুও কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর ব্যতিক্রম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার ও কারাদণ্ড দিচ্ছে; কিন্তু অভিযানদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা মাদক ব্যবহারকারী ও বিক্রয়কারী সাধারণ মানুষকে হত্যা করাই আসল কাজ মনে করছে।
সাধারণভাবে বোঝা যায়, মাদকদ্রব্যের তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত উৎপাদন, দ্বিতীয়ত সরবরাহ এবং তৃতীয়ত মাদক ব্যবহারকারী। মাদক উৎপাদন বাংলাদেশে হচ্ছে না। প্রতিবেশী মিয়ানমার এর মূল উৎস। ভারত থেকে ইয়াবা না হলেও মদ-ফেনসিডিল ব্যাপক হারে আসছে। তাহলে বোঝা যায়, সরকারের খোলা সীমান্ত নীতি মাদক উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছে। আকস্মিকভাবে দেশের অভ্যন্তরে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও সীমান্তে কঠোরতম ব্যবস্থার কথা জান যায়নি। যদিও মাঝে মধ্যে ছিটেফোঁটা অভিযানের খবর প্রকাশ হয়েছে। এবার আসা যাক সরবরাহকারী, যারা ইয়াবা ও অন্যান্য নেশাদ্রব্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এরা নানাভাবে কারবার করছে। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বলছে, বেশির ভাগ সরবরাহকারী বা কারবারী ক্ষমতাসীন দলের লোক।
ক্ষমতাসীনদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারবার পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি যেসব লোক ধরা পড়েছে, এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। কারো নাম উল্লেখ না করেই বলা যায়, আপনার এলাকায় কারা এর সাথে জড়িত। এ কথার অর্থ এই নয় যে, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নেশাকে অনুমোদন করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচার অনুযায়ী, অপরাধীরা ক্ষমতাসীন দলে নাম লেখায় এবং তাদের সহায়তা পায়। অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়, তাহলে তার সাত খুন মাফ। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তারা চালু করেছে, মাদক কারবারিরা তার ষোলআনা সুযোগ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণের মাদক সম্রাট বদি মিয়ার নাম এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বদির বিরুদ্ধে তথ্য আছে; প্রমাণ নেই। এ কথার অর্থ কি এই সরকার তার বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে অক্ষম? অথচ অসংখ্য ক্ষেত্রে তারা প্রমাণ ছাড়াই মামলা এমনকি হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এমন লোকদের ক্রসফায়ারে দিচ্ছে, যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতসীন দলের বিরোধী। ‘বন্দুকযুদ্ধের’ মুখোমুখি যুবকের পিতা-মাতা তার সন্তানকে নিরপরাধ দাবি করেছেন, এমনকি মামলা করেছেন- এ রকম উদাহরণ বিরল নয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে খবর এসেছে, ৪৫ মাদক গডফাদার ঢাকায়। এর মধ্যে পৃষ্ঠপোষক পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতা ও তিন পুলিশ কর্মকর্তা। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে- এ রকম খবর জনগণ এখনো পায়নি।

অস্বীকার করার উপায় নেই- সরকার যখনই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অতীতে পরিচালনা করেছে, বিরোধী দলের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এর কবলে পড়েছে। জঙ্গিবিরোধী অভিযান, সন্ত্রাস দমন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ- সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীরা পুলিশের অন্যায় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। কী মনে করে রমজান মাসেই এ অভিযানগুলো বেশি পরিচালিত হয়। এ সময় ভালো মানুষ নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরে আর এ সুযোগটি হেলায় হারাতে চায় না সরকার। মানুষ মারার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের জুড়ি নেই। স্বাধীনতার প্রাথমিক সময়ে জাসদ অভিযোগ করেছিল, তাদের ৪০ হাজার নেতাকর্মী হত্যা করেছে রক্ষীবাহিনী। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত যারা এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, তাদের গরিষ্ঠ অংশই আওয়ামী জামানায়। বিশেষ করে এ সময়ে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, স্বাধীনতার বিগত সময়ে একত্র করলেও তত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, তাকে এভাবে হত্যা করা যায় না। কোনো সভ্য সমাজের আইনকানুন তা অনুমোদন করে না। বর্তমানে মাদকপ্রবণ ও মাদক প্রবেশদদ্বার বাদ রেখে যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, তা আইনের চোখে অচল হতে বাধ্য। সমাজতত্ত্ব বলে, এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রতিশোধের হিংসা প্রজ্বলিত হয়। সন্ত্রাস উৎসাহিত হয়। সুতরাং এই অন্যায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য- ১. রাষ্ট্রকে নৈতিক হতে হবে, ২. শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, ৩. মাদক বেচাকেনার পরিবেশের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে, ৪. উৎসমূল : উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, ৫. বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান হতে হবে। আশু ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশি জরিপ নয়, নিরপেক্ষ গবেষণা সংস্থার মাধ্যমে নেশার কারণ, ব্যাপ্তি ও গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করতে হবে। গণমাধ্যম ও শিক্ষক-অভিভাবককে কাজে লাগাতে হবে। রাজনীতি নয়, সমাজকে জাগ্রত করার মধ্যে এর সমাধান খুঁজতে হবে।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ