শনিবার , ০৭ July ২০১৮

  --------- আবু হাসান টিপু:
ইতিহাস বা ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী জাতি হিসেবে কোনোকালেই আমাদের সুখ্যাতি ছিল না। ইতোমধ্যে বহু ঐতিহ্যবাহী সৌধ, ভবন, বা শিল্প নিদর্শন অনাদরে অবহেলায় হারিয়ে গেছে। তেমনি, কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার প্রাচীন ও দীর্ঘতম সড়ক এ আজম বা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড। সুপ্রাচীন এই সড়কটি বাংলাদেশ অংশে অস্তিত্ব সংকটে পড়লেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৩টি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এশিয়ান হাইওয়ে হিসেবে। বাংলাদেশে কোথাও কোথাও এটি শের শাহ সড়ক নামেও পরিচিত। চট্টগ্রাম হতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ হয়ে যশোর হতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ও পাকিস্তানের পেশোয়ারের মধ্য দিয়া আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সড়কটি।
মূলত মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনামলে তৈরি হয়েছিল সড়কটি, যা গঙ্গার মুখ থেকে সেই সাম্রাজ্যের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত পযর্ন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ সালের শাসনামলে শের শাহর তত্ত্বাবধানে সেই প্রাচীন সড়কটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে ‘সড়ক এ আজম’ নামকরণ করেন। শের শাহর তত্ত্বাবধানে নির্মিত মোট আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি সেই সময় উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে সংযুক্ত করেছিল এবং প্রধান সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হত। সড়কটি কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন জনপদ, নগর ও ব্যবসা কেন্দ্র।
শের শাহর আমল থেকে এ সড়কটি মূল সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ দীর্ঘ  সড়ক পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক কাজে গতি সৃষ্টি করা। প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিক সামনে রেখে সমগ্র সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি বিধানও এর লক্ষ্য ছিল। এ সড়কের মাধ্যমে রাজধানী আগ্রার সঙ্গে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলকে যুক্ত করা হয়েছিল। মূল পরিকল্পনায় রাজধানী আগ্রাকে পূর্বে সোনারগাঁও, পশ্চিমে দিল্লি ও লাহোর হয়ে মূলতান, দক্ষিণে বোরহানপুর এবং দক্ষিণপশ্চিমে যোধপুরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল। সামরিক সুবিধার পাশাপাশি বাণিজ্যিক উন্নতি, ডাক-যোগাযোগে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সে সঙ্গে কঠোর গুপ্তচর প্রথার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের তথ্যাদি সংগ্রহ করাও সুলতানের উদ্দেশ্য ছিল। সড়ক-ই-আজম নামে পরিচিত এ সড়ককে ঘিরে আরও কিছু কর্মতৎপরতার প্রমাণ মেলে। সরকারি কর্মকর্তাদের যাতায়াত সুবিধা প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ও জনসাধারণের বিশ্রামের জন্য রাস্তার উভয়পার্শ্বে দুক্রোশ অন্তর অন্তর বিশ্রামাগার ও সরাইখানা নির্মিত হয়। সরাইখানাগুলিতে খাবার ও উন্নত আবাসিক সুবিধার ব্যবস্থা ছিল। রাস্তার পার্শ্বে ছায়াদানকারী বৃক্ষও রোপণ করা হয়।
বৃটিশ শাসনামলে সৈন্য চলাচলের সুবিধা এবং ডাক বিভাগের উন্নতির উদ্দেশ্যে সড়কটির সংস্কার করে কলকাতা থেকে পেশোয়ার পযর্ন্ত সম্প্রসারিত করা হয়। এ সময়ই সড়কটির নাম দেওয়া হয় ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’। বৃটিশ শাসনামলের আগে তৎকালীন শাসকেরা এ সড়কটির বিভিন্ন নাম যেমন- শাহ রাহে আজম, সড়ক এ আজম, বাদশাহি সড়ক ও উত্তর পথ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
উল্লেখ্য, শের শাহ ছিলেন ভারতবর্ষের সম্রাট ও শুর বংশের প্রতিষ্ঠাতা। ১৫৩৭ সালে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের সেনানায়ক হিসেবে শের শাহ বাংলা জয় করেন। ১৫৪১ থেকে ১৫৪৫ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচ বৎসরের শাসনামলে শের শাহ মৌর্য যুগের প্রাচীন সড়কটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে কাবুল হতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত এক সুতায় গেথে দেন। 
সমরনায়ক থেকে সম্রাট হয়ে দিল্লির মসনদে মাত্র পাঁচ বছর ছিলেন শের শাহ। ১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ সালের মে। যা কিছু ভালো কাজ, তা এ সময়ের মধ্যেই করতে পেরেছিলেন তিনি। তাঁর আমলে স¤পাদিত প্রশাসনিক সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়ন পরবর্তী মোগল সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি রচনা করেছিল। শের শাহর অমর কীর্তি সড়ক-এ-আজম বা বাদশাহী সড়ক, পরে ব্রিটিশরা যার নাম দিয়েছিল র্গ্যান্ড ট্রাংক রোড। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানজুড়ে এ মহাসড়কের অস্তিত্ব আজও আছে। মূলত এ সড়কটিকে ভিত্তি করেই এ চারটি দেশের মৌলিক সড়ক অবকাঠামোর সূচনা হয়েছে। 

৪৭০ বছর আগে শের শাহর সড়ক-ই-আজম পশ্চিমে আফগানিস্তানের কাবুল, পাকিস্তানের মুলতান, ভারতের আগ্রা, দিল্লি, কলকাতা, বাংলাদেশের যশোর, সোনারগাঁ হয়ে চট্টগ্রাম প্রান্তে এসে শেষ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা এসে আড়াই হাজার কিলোমিটারের এ রাজপথের নাম দিয়েছিল র্গ্যান্ড ট্রাংক রোড। যশোর থেকে চট্টগ্রামের পথে বিভিন্ন জেলা শহরের রাস্তায় এখনো এ নামটি রয়েছে। 
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যেমন শের শাহর সেই সড়ক-ই-আজমের অংশ তেমনি হাজীগঞ্জ হতে শিবু মার্কেট এর উপর দিয়ে ফতুল্লাতে গমনকারী এই সড়কটিও তারই অংশ। অর্থাৎ সড়ক-ই-আজম বা গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড এর অংশ। অথচ প্রাগঐতিহাসিক এই সড়কটির হাজীগঞ্জ থেকে শিবু মার্কেট অংশ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনাদর অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে খাদাখন্দ, ডোবা-জলাশয়ে পরিনত হয়ে যেন মরতে বসেছে।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ