বৃহস্পতিবার , ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ইস্যু নয়, বিপদসংকেত

  বৃহস্পতিবার , ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

নিজ দেশে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা প্রাণবাঁচাতে আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গারা আজ এক অমানবিক পরিস্থিতির শিকার। বিপর্যয়ের হাত থেকে রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বাংলাদেশ অনেক উদারতার পরিচয় দিয়েছে। তবে কেউ কেউ মনে করেন রোহিঙ্গা কোনো ইস্যু নয়, এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বিপদসংকেত। অবাক করা বিষয় হলো, মিয়ানমার সরকার এই রোহিঙ্গাদের নাগরিত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে। সে দেশের সরকার, কোনো রাজনৈতিক দল এমনকি নিরীহ অহিংসতার আদর্শধারী বৌদ্ধ জনগণও রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। তারা সর্বতোভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি মুসলিম হিসেবে দাবি করে বারবার ছুতো তৈরি করে অত্যাচার নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের প্রকারান্তরে বাংলদেশের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে। এখন বাংলাদেশ সরকার, বিরোধী দল ও সর্বোপরি জনগণ যদি এই সামান্য রাজনীতিটি বুঝতে ভুল করে বা শুধু ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগায়, তবে আমাদের জন্য হয়তো খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে অদূর ভবিষ্যতে। মিয়ানমারের একটি বৌদ্ধ জনগণও রোহিঙ্গাদের পক্ষে নেই। এই অমানবিক নির্যাতনের জন্য কোনো অনুতাপ বা সহানুভূতিও নেই তাদের।

চলমান ঘটনার বাস্তবতায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া উপপরিচালক ফিল রবার্টসনকে উদ্ধৃত করে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্তমান অভিযানের নীতি ও কৌশল সম্পর্কে বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যে অভিযানের ধরন থেকে এটা স্পষ্ট যে, তারা জাপান যুদ্ধের ‘সানকো সেইসাকু’ বা ‘কিল অল, বার্ন অল’ অর্থাৎ ‘সবাইকে হত্যা কর, সবকিছু পুড়িয়ে ফেল’ নীতি অবলম্বন করছে। আসলেই তা-ই হচ্ছে। নিউইয়র্কে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ মিয়ানমারে শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন, সেফ জোন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। জানা গেছে, আরো পাঁচটি মুসলিম রাষ্ট্র শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিকজান্তা এই বিষয়ে নির্বিকারভাবে বিশ্ব মতকে অবজ্ঞা করে যাচ্ছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলা সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবশেষে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে, নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।

প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গারা আরাকানের একমাত্র ‘ভূমিপুত্র’ জাতি। ১০৪৪ সালে কট্টর বৌদ্ধ বর্মীরাজা ‘আনাওহতা’ আরাকান রাজ্য দখল করলেও ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ‘স্বাধীন রাজ্য’ ছিল। ১৭৮৫ সালে বর্মী রাজা ‘বোদাওফায়া’ এই রাজ্য দখল করার পর পুনরায় বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ২০১৫ সালে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের সংঘাতকে কেন্দ্র করে নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ ও অসংখ্য বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই বছরের পর বছর এই জাতিগত নিধনের নীতি পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটের দিকে ধাবিত করছে। মূলত রাখাইন ভূমি দখল করে রোহিঙ্গাদের চিরতরে বিতাড়িত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করবে ইতিহাস। তথ্য বলছে মিয়ানমারে মুসলমানদের ইতিহাস প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এই রোহিঙ্গারাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, সেই রোহিঙ্গাদের চরম দুঃসময়ে বাংলাদেশই সবচেয়ে বড় মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ একটি মানবিক রাষ্ট্র। দেশটি স্বাধীনতা অর্জনের পরও পরাজিত পাকিস্তানের নির্মমতার প্রতিশোধ না নিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা শীর্ষ স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়েও শান্তিপ্রিয় এবং ধর্মীয়ভাবে সংহতি-সম্প্রীতির সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকায়।

যথেষ্ট প্রতিকূলতা পেরিয়ে মানবীয় কঠোরতায় দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশ যখন উন্নত দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বিশ্বের মাফিয়ারা সুযোগ সন্ধান করছে দেশটিকে পিছিয়ে দিতে। বিগত চার দশকে তারা তাই করে এসেছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ খুবই আবেগ ও উসকানিপ্রবণ। ধর্মীয় অনুভূতি অযাচিতভাবে আমাদের খুবই স্পর্শকাতর করে তোলে। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিষয়েও তেমনটিই পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের এই আবেগ সংবরণ করতে হবে। কারণ রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমাদের ইস্যু নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইস্যু। আমাদের আবেগকে পুঁজি করে কোনো অবস্থাতেই যেন অন্য দেশ বেনিফিশিয়ারি না হয় সেদিকে আমাদের মনোযোগ থাকা চাই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে যেভাবে জোরালো বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশকে, সেভাবে মিয়ানমারের প্রতি অমানবিক নির্যাতন বন্ধের জন্য জোরালো ভূমিকা নেই। খুবই রহস্যজনক ব্যাপার। কেউ কেউ বাংলাদেশকে বাহবা দিচ্ছে। কিন্তু এই প্রশংসার ঝুলি নিয়ে কী করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয় ও সেবাদানের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি ঠিক আছে। অপরপক্ষে এও ভাবতে হবে যে, কত লাখ রোহিঙ্গাকে আমরা নিরাপদে ঠাঁই দিতে পারব। তাদের থাকার ব্যবস্থা, খাদ্য, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান—এসব চাহিদা কত দিন পূরণ করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে।

আমরা যদি মুসলিম হিসেবে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিকতার কথা বলি, তাহলে আমাদেরও বিবেক দিয়ে বিবেচনা করতে হবে, আমার দেশে কত মুসলিম খেয়ে না খেয়ে জীবনযাপন করছে। হাওর ডুবেছে, পাহাড় ধসে মরেছে, বন্যায় তলিয়ে গেছে, তাদের আমরা কতটা সহযোগিতা করতে পেরেছি। আমরা কি ধর্মীয় নির্দেশ মেনে জাকাত আদায় করি! পরিপূর্ণভাবে আমরা এসব কিছুই করি না। বাস্তবিক পক্ষে হয়তোবা পুরিপূর্ণতা সম্ভবও নয়। সর্বতোভাবে সজাগ থাকতে হবে সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও। আমরা যেন রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতা দেখাতে গিয়ে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে না আনি। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, ক্রমাগতভাবে আগত রোহিঙ্গাদের থাকা, খাবার, নিবন্ধন বিশৃঙ্খলভাবে বা খুব সীমিতভাবে করছে বাংলাদেশের সরকার। তাদের প্রতি প্রশ্ন, বাস্তবতা আসলে কী। সরকার কি প্রস্তুত থাকবে যে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা আসতেই থাকবে আর আমরা তাদের জন্য অপেক্ষা করব। তা না করে আমরা বরং রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এবং বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে এককণ্ঠে আওয়াজ তুলি। প্রচারণা চালাই। আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করি। এটা আমাদের জন্য অন্যতম বড় কাজ। ধর্ম-কর্ম জ্ঞান তপস্যার বিষয়, কখনোই তা দুর্বলতা হতে পারে না। আবেগ নয় বিবেক দিয়ে ভাবতে হবে আমাদের দেশের জনগণকেও।

রোহিঙ্গারা যেভাবে দেশে আসছে এই স্রোত ভয়ঙ্কর। এত মানুষের ভার বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নিতে পারে না। সে সক্ষমতা নেই আমাদের। তাছাড়া তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নেই মিয়ানমারের। বরং তারা বরাবরের মতো ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের অত্যাচার নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশমুখী করে আরাকান রাজ্যকে রোহিঙ্গা শূন্য করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আমরা কি সেই ফাঁদে পা দেব, নাকি আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করব। তা ভাবতে হবে দেশের সরকার, বিরোধী দল ও জনগণকে। আরেকটি ব্যাপার ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে দেশের জনগণের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মিয়ানমারে পুশব্যাকের ভয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী তাদের জন্য নির্ধারিত গন্ডি ছেড়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করেছে। রোহিঙ্গাদের সহায়তার নামে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মানুষ নতুন বাণিজ্য ফেঁদে বসেছে। দালালরা তাদের নিকটাত্মীয় পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কর্মব্যস্ত শহরে শ্রমজীবী মানুষের ভিড়ে তাদের মিশিয়ে দেওয়ার অপতৎপরতায় মেতেছে। এতে পুরো দেশ নতুন করে নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রতিফল ভালো হবে না। এটা বিপুল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কর্মবাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে। আবার এদের ব্যবহার করে দেশের মাফিয়ারা নেশাদ্রব্য, অস্ত্র, চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী তৎপরতা এমনকি জঙ্গিবাদকে উসকে দিতে পারে।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ