মঙ্গলবার , ৩১ July ২০১৮

এরশাদুল হক দুলাল:
বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক বছর আগে থেকে ঘুনকীটে আক্রান্ত হলেও বর্তমান অবস্থা আরও নাজুক। বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদের জন্ম হয়েছিল – যাদের  লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য  সবই ছিল রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। কিন্তু সেই সুন্দর রাজনীতির সংস্কৃতিতে চরম ভাটা পড়েছে বলে আমরা লক্ষ্য করছি। যা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত। যাহোক প্রথমেই সংস্কৃতির ধারনা দেয়া প্রয়োজন। সংস্কৃতি কি? যা কিছু সুন্দর করে এবং সৌন্দর্যমন্ডিত করে সমাজ ও জীবনের বিভিন্ন দিককে সাহিত্যকলায় পরিনত করে তাই সংস্কৃতি।
নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদ রাজনীতিতে ফিরে না আসলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে স্বচ্ছ রাজনীতি ফিরে আসবে না। কৃত্রিম পণ্য যেমন- বাজার দখল করে কুটির শিল্পকে ঢেকে ফেলেছে তেমনি অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ রাজনীতিতে প্রবেশ করে রাজনীতিবিদদের ক্ষতি করেছে। ব্যবসায়ী, হাইব্রীড, আমলা, মাস্তান, ক্যাডার যখন রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয় তখন প্রকৃত রাজনীতিবিদরা বাক রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আর সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে অসহায়। চলে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা। জন জীবন হয় বিপর্যস্থ।
অসাধু রাজনীতিবিদ, অসাধু আইন শৃংখলা বাহিনী, সরকারী ছত্রছায়ায় থাকা কথিত ক্যাডার,  মাদক, চোরাকারবারীরা মাদকের ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা অর্জন করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে। এদের কারণেই সমাজ আজ দূষিত হয়েছে। যুব সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়েছে। আমাদের ইন্টিলিজেন্স দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। দেশ বিদেশে এদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। এদের উচিত দেশ প্রেমিক হয়ে এর প্রতিকারে এগিয়ে আসা।
রাজনীতি সমাজের অন্য সব কার্যক্রমের একটি অংশ মাত্র। সমাজ আমাদের সামগ্রিক জীবন যাপনের পরিধি। সমাজের লালিত আদর্শে আমাদের বেড়ে ওঠা। সামাজের থেকেই আমাদের শিক্ষা গ্রহণ। সমাজ সংস্কৃতিতে আমাদের কর্মজীবন অতিবাহিত।
রাজনীতি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সমাজের সবাইকে মানবিক ও কল্যানকামী হিসাবে গড়ে তোলাই নাগরিক দায়িত্ব। সরকারের ভিত্তি হচ্ছে- জনগণের সমর্থন।
আমি ড. আব্দুল লতিফ মাসুম এর রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক কলামটি পড়ে মোহিত হয়েছি। তিনি তার কলামে উল্লেখ করেছেন- রাজনীতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতার অর্থ শত্রুতা নয়। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনীতিকেরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতাকে শত্রুতা মনে করেন। সে জন্যই আজ রাজনীতি দূষিত হয়েছে। আর দূষিত হয়েছে বলেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব মিথ্যাচার, প্রতারনা, ষড়যন্ত্র, কারচুপি ও কারসজিতে কোন অন্যায়  মনে করেনা। প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারানোর জন্য হামলা-মামলা, জেল-জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার কোন কিছুই বাদ যায় না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের রাজনীতিকেরা  নির্বাচনকে সমাজ বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের একক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে নৈতিকতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বলেই অবাধ ও উদার রাজনৈতিক চর্চার সংকট দেখা দিয়েছে।
আমাদের  ভাবনা শৃঙ্খলিত। যার কথা সে বলবে। সবারই সভা-সমিতি ও সমাবেশ করার স্বাধীনতা থাকবে। ভোট দেয়া এবং ভোটে প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ানোর অধিকার থাকবে। কিন্তু যখন ভোটের কথা আসে বা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলের কথা আসে তখন প্রতিপক্ষকে বাঁধা ও অনুমতি না দেয়া যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্মীরা একে অপরের মতামত ও আশা আকাঙ্খকে মেনে নিতে পারে না। এ নিয়ে পরস্পর বির্তক, বচসা, হাতাহাতি, মারামারি ও খুনা-খুনি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তবর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা এরকম যে  “দল ক্ষমতায়- বুঝবে নেতায়”। “নেতা আছে শহরে, কোপাইতে কইছে আমারে”। কোপা শামছু কোপা। এভাবে নেতার আদেশে কর্মীরা গ্রাম-পাড়ায়, মহল্লা এমনকি নিজ বাড়িতে ঝগড়া-বিবাদ ডেকে আনে। শুধু গ্রাম্য রাজনীতি নয় বরং জাতীয় রাজনীতির কারণে ভাই ভাই মুখ দেখা-দেখি বন্ধ হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। এ বিভক্তি সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। রাজনীতি এমন নোংরা পর্যায়ে এসেছে, যার ফলে এক দলের পান থেকে চুন খসলে আর রক্ষা নেই। যেন চলতে থাকে দিন, মাস এমনকি বছর বছর পর্যন্ত। প্রতিপক্ষ বাড়ী থাকতে হলে  চাঁদা দিতে হয়। আর তাঁদের ব্যবসা বানিজ্য, জমা-জমি, মৎস্য খামার কারণে অকারণে দখল-বেখল হয়ে যায়।  অর্থাৎ যে দল ক্ষমতায় থাকে সবই তাদের রাজত্বে। রাজনীতি এখন সাধারণ জনগণের মধ্যে ঘৃনার জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ রাজনীতি সমাজকে গ্রাস করেছে। সমাজ যেখানে রাজনীতি নিয়ন্ত্রক হওয়ার কথা সেখানে রাজনীতি সমাজের শান্তি, শৃংখলা ও সম্প্রতির পরিবেশ বিষাক্ত করে ফেলেছে। রাজনীতিবিদদের একটি শ্লোগান মনে রাখা উচিত, “রাজনীতি  যার যার দেশ সবার”। এ নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে হারানো সুর আবার ফিরে আসবে। এটা শুধু রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার বিষয়।
রাজনীতি সচেতন মহল রাজনৈতিক ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করে সত্যিকার জনকল্যানে আত্ম নিবেদিত হওয়ার মন্ত্রে উদ্ধুদ্ধ হয়ে দেশ- জনতার কল্যানে  নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার নীতি চর্চা শুরু করতে পারলে শেখ মুজিব, নেতাজী সুভাষ, বল্লব সেন, শেরে-বাংলা, মহাত্মাগান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জগজীবন রায়, জওয়াহেরলাল নেহেরু, ইন্ধিরাগান্ধী, মওলানা ভাসানী, এ পি জে আবুল কালাম আজাদ, গণি খান চৌধুরীর মত বরেন্য নেতাদের জন্ম হবে। তা হলেই দেশ হবে ধন্য।
রাজনীতি মানেই গণতন্ত্রের চর্চা। গণতন্ত্র আমাদের শুভেচ্ছা, সৌন্দর্য ও সহনশীলতা শেখায়। রাজনীতিবিদদের ক্ষমা, ধৈর্য্য, দয়া, দানশীলতা, উদারতা, সহনশীলতা, ন্যায়পরায়নতার মত বিশেষ গুন গুলো থাকা প্রয়োজন। এ গুনের শিক্ষায় শিক্ষিত হলে- সমাজে বা রাষ্ট্রে থাকবে না দূর্নীতি, দুঃশাসন। ফিরে আসবে প্রশান্তি। সমাজ বা রাষ্ট্র হবে শিক্ষায়, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রসিদ্ধ। বিশ্বের বুকে আমরা একটি সুন্দর সভ্য জাতি হিসাবে গর্বের সাথে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারবো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে রাজনীতিবিদদের বিনীতভাবে অনুরোধ করবো- রাজনীতির কু-সংস্কৃতি মাটিচাপা দিয়ে নীতি, আদর্শ ও নৈতিকতার সংস্কৃতির রাজনীতিতে ফিরে আসুন।

পরিচিতিঃ লেখক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ