শুক্রবার , ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নিজাম সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে নির্মাণাধীন প্রায় ২৭০ টি প্রকল্প হস্তান্তর বা নির্মাণ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। যার কারণে শিল্পটি বর্তমানে চরমভাবে আর্থিক ও সমাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 
এ প্রসঙ্গে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) চট্টগ্রাম রিজিওনাল প্রেসিডেন্ট আবদুল কৈয়ূম চৌধুরী বলেন, আবাসন খাতের অবস্থা ভালো নয়। ব্যাংক সুদের হার কমানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এখনো ব্যাংকগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কিছু কিছু ব্যাংক সুদের হার কমালেও এখনো বেশিরভাগ ব্যাংক কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এটা খুবই প্রয়োজনীয়। সামগ্রিকভাবে আবাসন খাতের জন্য সরকার একটি ফান্ড সৃষ্টি না করলে এ সেক্টর ঘুরে দাঁড়াবে না। দিন দিন এ সেক্টর খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গক্রমে রিহ্যাব চট্টগ্রামের প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া কমিটির আহবায়ক ও ইস্ট ডেল্টা হোল্ডিংস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম আবদুল গফ্ফার মিয়াজী দৈনিক দেশকালকে বলেন, আবাসন খাত এখন আস্তে আস্তে সমস্যা থেকে উত্তোরণের পথে এসেছে। আবাসন খাতকে রক্ষা করতে হলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য অবিলম্বে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে রয়েছে। এ ছাড়া আবাসনশিল্পে অন্যান্য দেশের মতো শিল্পঋণ সুবিধা প্রচলন, নগদ ও খুচরা পণ্য ক্রয়ে ভ্যাট ও উৎস কর বন্ধ, রেজিস্ট্রেশন ব্যয় ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, সেকেন্ডারি মার্কেটে রেজিস্ট্রেশন ব্যয় আরো কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
রিহ্যাব সূত্র মতে, চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসায় রিহ্যাবের প্রায় দেড় শতাধিক কোম্পানি (ঢাকার কোম্পানিসহ) ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে। চট্টগ্রামে এ খাতে মোট বিনিয়োগ ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হস্তান্তারযোগ্য এবং নির্মাণাধীন প্রায় ২৭০ টি প্রকল্প হস্তান্তর বা নির্মাণ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। 
বর্তমানে এসব কোম্পানির অধীনে প্রায় দশ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। যার মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট সমস্যাগ্রস্ত। সমস্যাগ্রস্ত এসব অ্যাপার্টমেন্টের অধীনে ভূমির মালিককে প্রতিমাসে ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫ কোটি টাকা। ফ্ল্যাট গ্রহীতাকে মাসিক ভাড়া দিতে হচ্ছে ২০ কোটি টাকা। তাছাড়া মাসিক ব্যাংকের সুদ দিতে হচ্ছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। সমস্যাগ্রস্ত এসব অ্যাপার্টমেন্টে বিদ্যুতের মোট চাহিদা রয়েছে ৬০ হাজার কিলোওয়াট এবং গ্যাসের সংযোগের প্রয়োজন রয়েছে সাড়ে ৬ হাজারটি।
রিহ্যাব চট্টগ্রামের কো-চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. দিদারুল হক চৌধুরী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। বর্তমান সরকার আসার পর অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সরকার আবাসন খাতের প্রতি মনোযোগী হওয়ায় ব্যবসা কিছুটা চাঙ্গা হলেও ঘুড়ে দাঁড়াতে পারেনি। আবাসন ব্যবসা শুধু বড় মানুষের জন্য নয়। সাধারণ মানুষ যাতে ফ্ল্যাট কিনতে পারে সে চেষ্টায় গ্রামে-গঞ্জেও ব্যবসা ছড়িয়েছে। সরকার রেজিস্ট্রেশন খরচ কমালে এবং ব্যাংক লোন সহজ করলে আবাসন খাত আবার চাঙা হবে।
চট্টগ্রামের আবাসন খাতের উত্থান ছিলো ২০১০ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে রিহ্যাবের বাইরেও শতাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে চট্টগ্রামে। তখন প্লট ও ফ্ল্যাটের চাহিদা ও দাম বেড়ে যায়। ২০১৩ সাল পর্যন্ত জমজমাট থাকে আবাসনের বাজার। ২০০৬ সালে মাত্র ১৮ টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আবাসন খাতের সবচেয়ে বড় সংগঠন রিহ্যাবের চট্টগ্রাম রিজিওনাল অফিসের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ক্রমান্বয়ে সদস্য সংখ্যা বেড়ে ২০১৩ সালে হয় ১০২ টি। তবে ২০১৪ সালে আবাসন ব্যবসায় মন্দার কারণে রিহ্যাবের সদস্য সংখ্যাও কমতে শুরু করে। ২০১৪ সালে ৯৮ টি, ২০১৫ সালে ৯২ টি এবং ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ৮৭ টি প্রতিষ্ঠান রিহ্যাবের সদস্যপদ নবায়ন করে। আবাসন ব্যবসায় মন্দার কারণেই মূলত রিহ্যাবের প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্যপদ নবায়ন করা থেকে বিরত থাকে। গত কয়েকবছরে মধ্যবিত্তদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়া ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার ঘোষণা অনুযায়ী সিঙ্গেল ডিজিটে না নামার কারণেই আবাসন খাতের এমন অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে সামনে আরো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। মূলত রিহ্যাবের সদস্য নয় এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার কারণে এ শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস শিল্পটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

 অর্থ-বাণিজ্য থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ