রবিবার , ০৭ অক্টোবর ২০১৮

রিয়াদ ইসলাম, ঈশ্বরদী (পাবনা)

ঈশ্বরদীতে ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ করার জন্য শত শত গাছপালা, বেশ কিছু বসত বাড়ি ও আবাদী জমির ক্ষতি হলেও সেই ক্ষতিপূরণ না দিয়েই চলছে ‘ঈশ্বরদী-রূপপুর ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন’ নির্মান কাজ। উল্টো ক্ষতিগ্রস্থ সাধারণ মানুষকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসবের প্রতিকার এবং ক্ষতিপুরণের দাবীতে একাট্টা হয়ে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করেছেন গ্রামের শত শত নারী ও পুরুষ। ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের বসতবাড়ী, আবাদী জমি ও গাছপালা নষ্ট করতে দিবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা। শনিবার ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর মল্লিক পাড়া গ্রামে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এসব কথা জানানো হয়।

এলাকাবাসী জানায়, জয়নগর পিজিসিবি থেকে রপপুর প্রকল্প পর্যন্ত ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য প্রায় এক বছর পূর্বে জয়নগর মল্লিক পাড়া গ্রামে ক্ষতিপূরণের প্রাথমিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সে সময় হাই ভোল্টেজের সঞ্চালন লাইন যে সমস্ত জায়গা দিয়ে যাবে আর কি পরিমাণ ক্ষতি হবে তার একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হয়।

সম্প্রতি সেই ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হলে স্থানীয় এলাকাবাসী বাধা দিয়ে তাদের ক্ষতিপূরণ দাবী করেন। এতে চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হন কাজের সাব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান লিমিটেড। তারা গ্রামবাসীকে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ না দিয়েই নির্মান কাজ চালিয়ে যেতে থাকলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশকে গোপনে ‘ম্যানেজ’ করে গ্রামবাসীকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হয়।

সরকারী কাজে বাঁধা দিলে গুলি করার নির্দেশ রয়েছে বলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এরপরও ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামবাসী তাদের ক্ষতি পুরণের দাবীতে অনড় থাকলে প্রতিদিনই ঈশ্বরদী থানা থেকে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করছে। কাজে বাঁধা দেওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্থ জাহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ইয়াবা দিয়ে চালান দেওয়ার হুমকি দেন ঈশ্বরদী থানার একজন উপ-পরিদর্শক।

সে সময় তার গলা ধরে বেশ কয়েকটা চড়-থাপ্পরও মারেন তিনি। এমন অভিযোগ করেন গ্রামের অসংখ্য মানুষ। তারা অভিযোগ করেন পুলিশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষমতার দাপটে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণ না দিয়েই অন্যায়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে সার্ভে করা এলাকায় যে সমস্ত গাছপালা কেটে ফেলা হবে তার চিহৃ করে গেছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।

অথচ তাদের কোন ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। বিষয়টি নিয়ে চরম অসন্তোষ চলছে ওই গ্রামে। তারা আরও অভিযোগ করেন তিন জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বাড়ির উপর দিয়ে এই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুতের লাইন টানা হচ্ছে। এছাড়াও তাদের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন অসংখ্য লিচু গাছ কাটা পড়লেও তাদের কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে না।

ক্ষতিগ্রস্থ আলহাজ্ব আতিয়ার রহমান মাল্লিক নামের এক ব্যক্তি জানান, ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি টানা হচ্ছে তার শত বছরের বসত বাড়ির উপর দিয়ে। আর তিনটি টাওয়ার নির্মান করা হবে তার নিজস্ব মালিকানাধীন জমির উপর। এজন্য কাটা হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক’শ গাছ। অথচ তাকে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না।

তার ছেলে আলহাজ্ব বাবুল মল্লিক জানান, জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের কথা বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার তা না দিয়েই অবৈধ ক্ষমতার দাপটে নির্মান কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যেখানে বলা হয়- বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চালুর পর হতে লাইনটি হাইভোল্টেজ বিদ্যুতায়িত অবস্থায় থাকবে।

দূর্ঘটনা এড়াতে জনসাধারণকে উক্ত সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারে আরোহন, গবাদি পশু বাঁধা, রশি বেঁধে কাপড় শুকানো প্রভূতি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হতে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। একই সঙ্গে সকলকে ১৩২ কেভি লাইন ও টাওয়ার থেকে নিরাপদ লাইনের উভয়পার্শ্বে ১৫ মিটার দুরুত্বে থাকতে হবে।

বাবুল প্রশ্ন রাখেন তাহলে- “আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে যে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ১৩২ কেভি লাইনটি টানা হচ্ছে তাহলে আমাদের ক্ষতি হলে আমরা কোথায় যাবো?” তিনি অবিলম্বে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মান কাজের দাবী জানান।

অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখেন ঈশ্বরদী উপজেলা ধান-চাউল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মজিবর রহমান মোল্লা, আলহাজ্ব আতিয়ার রহমান মল্লিক, আলাউদ্দিন বিশ্বাস, শামসুল আলম, মাহারুল ইসলাম, নূর মোহাম্মদ, খবির মল্লিক ও আবান মল্লিক প্রমূখ।
ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মকলেছুর রহমান মিন্টু বলেন, পিজিসিবির নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্থরা যেন বঞ্চিত না হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এটি সরকারের উন্নয়ন মূলক কাজ। তাই এলাকার কৃষকদের ক্ষতিপূরণের টাকা ঠিকাদারদের প্রদান করার জন্য তিনি আহবান জানান।

এসব বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল লতিফ জানান, সলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর গ্রাম কৃষি সমৃদ্ধ এলাকা। এখানে লিচুর আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়, এছাড়াও অন্যান্য ফল ও ফসলের চাষাবাদ রয়েছে। কৃষি জমির উপর দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নিয়ে যাওয়ার আগে কৃষি অফিসের কোন মতামত নেয়া হয়নি। তার ধারণা যে এলাকার উপর দিয়ে হাই ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন যাবে সে এলাকায় কৃষির চাষাবাদ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী অরুন সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য রূপপুরে বিদ্যুতের একটি উপকেন্দ্র নির্মান করা হচ্ছে। জয়নগর গ্রিড থেকে ওই উপকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য ১৩২ কেভি লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। যে এলাকা দিয়ে বিদ্যুৎ লাইন যাবে সেই এলাকার মানুষদের তারা ক্ষতিপূরণ দিতে চান। কিন্তু তাদেরকে মৌখিক ভাবে একাধিকবার বলার পরও তারা যোগাযোগ করছেন না।

এসব বিষয়ে তাদের কাছে কাগজও পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এটা সরকারী কাজ, এই কাজে সকলকে সহযোগীতা করা উচিত। পুলিশ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামবাসীদের হয়রানীর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, পুলিশ হয়রানী করবে কেন। কাউকে হয়রানী করার খবর তিনি পাননি। তিনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের নির্দেশ দিয়েছেন সকলের সাথে ভাল ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করতে।

সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বাবলু মালিথা জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন, তবে তার কাছে কেউ কোন অভিযোগ করেননি। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থরা যাতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পান সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্থরা অবশ্যই ক্ষতিপূরণ পাবেন।

 সারা বাংলা থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ