বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর ২০১৮

নিজাম সিদ্দিকী,  চট্টগ্রাম অফিস:
কথা ছিল পাহাড় পাদদেশে ঝঁকিপূর্ণভাবে  বসবাসরতদের সরিয়ে স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আর সেখানে হবে বনায়ন। কিন্তু এর কোনো কথাই রাখা হলো না। বরং এখানে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় অবৈধ বসতিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস আর পানির বৈধ সুবিধা পেয়ে দিন দিন বাড়ছে এখনকার বাসিন্দার সংখ্যা। 
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আর ঝড়-ঝঞ্চার সময়ে জোর তৎপরতা চলে এদের উচ্ছেদের এবং নিরাপদ স্থানে যাওয়ার তাগিদ। কিন্তু এসবই সাময়িক, এরপর আবারো চলে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। 
একইভাবে সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় তিতলি’র আঘাত মোকাবেলায় ভূমিধসের শঙ্কায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত লোকজনকে সরাতে নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রাখে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। মাইকিং কার্যক্রমের পাশাপাশি লোকজনকে সরিয়ে নিতে পাহাড়ে অভিযানও পরিচালনা করা হয়। 
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত ১০ বছরে চট্টগ্রাম শহর ও আশেপাশের এলাকায় পাহাড় ধসে ২৩১জন নিহত হয়েছে। এভাবে প্রাণহানির পরও দিনদিন বাড়ছে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম শহরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে ৩০টি। ১২টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬৮৪টি পরিবার বসবাস করছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা  গেছে।
গত ২০০৭ সালে ভয়াবহ পাহাড়ধসের পর গঠন করা শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বছর বছর বাড়ছে বসতি। প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই আবার ফিরে যায় বসবাসকারীরা। নতুন করে নেয়া হয় বিভিন্ন সেবা খাতের সংযোগ। 
শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগর, সীতাকু- ও জঙ্গল সলিমপুরে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে ৩০টি। এসব পাহাড়ে কম ও অধিক ঝুঁকিতে বসবাসকারী লোকজনের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ। বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের।
বিশেষজ্ঞদের মত, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানোর স্থায়ী উদ্যোগ নিতে হবে। অস্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে পাহাড়ধসে প্রাণহানি এড়ানো যাবে না।
গত ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের বড় ঘটনায় মারা যায় ১২৭ জন। এরপর শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পাহাড়ে মৃত্যু ঠেকাতে ৩৬ দফা সুপারিশ দিয়েছিল। একই ঘটনার পর প্রকৌশলগত প্রতিরোধ কমিটি আরেকটি প্রতিবেদন  দেয়। এতেও দুর্ঘটনা এড়াতে সুপারিশ করা হয় ৩০ দফা। 
সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, পাহাড় দখলমুক্ত করে বনায়ন, ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসন, পাহাড়কাটা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া এবং পাহাড় ইজারা ও দখল বন্ধ করা। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে প্রশাসন বারবার অস্থায়ী উদ্যোগ নেয়। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে এসব ঘর নির্মাণের পেছনে রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁরা নিম্ন আয়ের লোকজনকে কম ভাড়ার কথা বলে বসবাসের প্রলোভিত করেন।
সূত্র মতে, ২০১২ সালে ২৬ জুন নগরীর চার স্থানে পাহাড় ধসে ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই নগরীর লালখান বাজার এলাকার ট্যাংকির পাহাড় এলাকায় পাহাড় ধসে মা-মেয়ের মৃত্যু ঘটে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে খুলশী থানাধীন ইস্পাহানী মোড় এলাকায় পাহাড় ধসে এক গৃহবধূর মৃত্যু ঘটে। গত ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বৃষ্টির সময় নগরের বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে পাহাড়ধসে তিনজন নিহত হয়। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মা- মেয়ে মারা যায়। অথচ এ দুটি পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় ছিল না। 
প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও টিলার মধ্যে ১১টিতে সবচেয়ে বেশি ৬৬৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করে আসছে। এর মধ্যে লালখান বাজার এলাকায় একে খান মালিকানাধীন পাহাড়ে ১৮৬ পরিবার, ইস্পাহানী পাহাড়ে দক্ষিণ পাশে ৫টি পরিবার, লেকসিটি এলাকায় ১২টি পরিবার,  কৈবল্যধাম বিশ্বকলোনী এলাকায় ২৭টি পরিবার, আকবর শাহ আবাসিক এলাকার পাহাড়ে ২২টি, সিটি কর্পোরেশনের পাহাড়ে ১১টি, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকার কাছে পাহাড়ে ৯টি, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট একাডেমির উত্তরে মীর মোহাম্মদ হাসানের মালিকানাধীন পাহাড়ে ৩৮টি, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৩টি, জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩টি, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ৩২০টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।  
প্রশাসনের উদ্যোগে ২০০৭ সালের ২১ জুন নগরীতে পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং এতে বসবাসকারীদের ব্যাপারে জরিপ চালানো হয়।  সে সময় নগরীর ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও টিলাকে চিহ্নিত করে এতে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় প্রশাসনের উদ্যোগে নগরীর বিত্তশালী লোকজন থেকে অর্থ সহায়তাও গ্রহণ করা হয়। জেলার হাটহাজারী, জ্বালানিহাট এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে পর্যায়ক্রমে পাহাড়ের পাদদেশে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী পরিবারসমূহকে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও আর বস্তিবাসীদের সরিয়ে নেয়া এবং পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
গত ২০১১ সালে বাটালী হিল এলাকায় ভূমিধসের ফলে দেয়ালের নীচে চাপা পড়ে। তখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন  মেয়র এম মনজুর আলম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের  ঘোষণা দেন।  সেই হিসেবে ওই এলাকায় ৭তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়। সেখানে ১৩৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করে স্বল্প আয়ের লোকজনের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।  





 








 নগর-মহানগর থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ