রবিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সংকট ঘনীভূত হচ্ছে

  রবিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

যতই দিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট বেশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে। এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো ততটা জোরালো ভূমিকা পালন না করলেও মিয়ানমারের পক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত ও চীন। পাশাপাশি মিয়ানমারকে পরোক্ষভাবে সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও। যদিও জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নিপীড়ন বন্ধে আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু সেটিতেও সাড়া দিচ্ছে না শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চির মিয়ানমার।

জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব মতে, ইতোমধ্যে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। তবে এ হিসাব আরো বেশি হতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের দেওয়া তথ্য বলছে, এই সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রেখেছে মিয়ানমার। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার এসব প্রতিবাদে কর্ণপাত না করে তাদের মতো করেই কাজ করে চলেছে।

এদিকে গত দুই সপ্তাহ ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চলা সঙ্কট নিয়ে আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো যে একেবারেই নিশ্চুপ, তাও নয়। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক অঙ্গন এ ঘটনায় বেশ উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়তে লিখা হয়েছে, ‘একটি দুষ্ট শাসকের সহানুভূতিহীন প্রতিমা হিসেবে অং সান সু চি আবির্ভূত হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।’

রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান ঘটনায় অং সান সু চির প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও ব্যক্তিদের। দাবি উঠেছে সু চির নোবেল পুরস্কার বাতিল করারও। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউরোপিয়ান মিডিয়া ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু স্ট্র্যোলাইনসহ অনেক মানবাধিকার কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এই দাবি তুলেছেন।

এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার জন্য এবং তাদের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মাসুদি। এবার একই ইস্যুতে বাংলাদেশে এসেছেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি পরাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসোগলুর। এর আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পাশে থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করবে তার দেশ। একইভাবে ইন্দোনেশিয়াও রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে। পরিশেষে জাতিসংঘও আশ্বাস দিয়েছে।

এদিকে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের শত্রুতা আবার চীনের সঙ্গেও। এবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা শত্রুতা ভুলে মিত্রের বেশ ধারণ করে একজোট হয়ে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়ানোটা বাংলাদেশের জন্য একটি সঙ্কেত বলেই মনে হচ্ছে। তাদের এভাবে একজোট হওয়া মানেই বাংলাদেশের দিকে বিপদ ধেয়ে আসার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করছে বা করবে, সেটি এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাদের সাম্প্রতিক আচরণে।

সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের প্রতি প্রতিশোধ নিতে চাইবে পাকিস্তান, ব্যাপারটি অস্বাভাবিক নয়। তবে চীন আর ভারত কেন বাংলাদেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে চাইবে? সব থেকে বড় কথা হচ্ছে ভারত তো আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাহলে তাদের স্বার্থ কী? এমন প্রশ্ন অনেকের মাঝেই ওঠানামা করছে এবং করাটাও স্বাভাবিক। বাংলাদেশ যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে সামনের দিনগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ রকম হতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকেই। বিশেষ করে মিয়ানমারের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম যে তথ্য সংবলিত খবর প্রকাশ করেছে এতে করে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশের দিকে ভয়াবহ বিপদ ধেয়ে আসতে শুরু করেছে!

মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) রোহিঙ্গা ইস্যু সৃষ্টির নেপথ্যে। ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম মিজিমা তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ‘রাখাইন রাজ্যের চলমান সহিংসতার জন্য দেশটির সেনাবাহিনী দায়ী নয়। এ বর্বরোচিত হত্যাকান্ড-দমননিপীড়নের পেছনে হাত রয়েছে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের।’

সংবাদ মাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সামরিক শাখার প্রধান হাফিজ তোহারের ফোনে আসা তিনটি কলের সূত্র ধরে ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ২৩ ও ২৪ আগস্ট ৩৪ মিনিট, ২৮ মিনিট ও ১৪ মিনিট সময়ব্যাপী পৃথক তিনটি ফোন কলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার ব্যাপারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্সের (আইএসআই) কর্মকর্তা আশফাক এবং ইরাকের একজন আইএস কর্মীর সঙ্গে হাফিজ তোহারের আলোচনা হয়। এই আলোচনার পর ২৫ আগস্ট অন্তত ২০টির ওপর তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালানো হয়। মূলত এই সূত্র ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে।

অনেকেই মানবতার দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। বিপরীত এই হত্যাযজ্ঞ, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পুশইন বন্ধে আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোর অবস্থান ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো। আবার বাংলাদেশও কেবল আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ মিয়ানমার কোনো আলোচনার যোগ্য নয়, সেটি তারা বারবারই প্রমাণ দিয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে করা ১৯৭৮ সালের চুক্তি ভঙ্গ করে। এমনকি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে এই দেশটি ১৯৯২ সাল থেকে নানা ধরনের নাটকের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। এরপরও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এর সুষ্ঠু সমাধানে যাওয়া যাবে (?) সেই ধারণা কীভাবে পোষণ করা যায়!

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামানের মতে, ‘মিয়ানমারের নিজস্ব অনেক সম্পদ রয়েছে। এছাড়া চীন তাদের পক্ষে জাতিসংঘে ভেটো দেয়। তাদের যে সামরিক কর্তৃত্ব, সত্তর বছর ধরে তারা বল প্রয়োগ করে দেশটাকে এক করে রেখেছে। যার কারণে তারা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর আহ্বানকে সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না। তবে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া আর তুরস্ক মিলে একটি সামরিক জোট করতে পারে।’

আমরাও মনে করি, এমন একটি জোট গঠনের মাধ্যমে মিয়ানমারকে সরাসরি হুশিয়ারির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে, তাহলে দেশটির সামরিক নেতারা এই ভাষা ঠিকই বুঝবে। তারা অন্য কোনো ভাষা বুঝবে না। কেননা, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে অনেক বছর ধরেই কূটনীতিকভাবে বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সঙ্কট সমাধান তো হয়নি বরং আরও প্রকট হয়েছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে আন্তর্জাতিক মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছে সেটিও এই সঙ্কট সমাধানে যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করেছে। তবে চলমান এই সঙ্কটে বড় ঝামেলাটা বাংলাদেশকেই পোহাতে হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ এক বা দুই বছর ধরে ঝামেলা পোহাচ্ছে না। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু। সে সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সময়ে এ দেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। বর্তমানে সরকারি হিসাব অনুসারে তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে মাত্র সাতাশ হাজারের মতো! বাকিরা মিশে গেছে বাংলাদেশের মূল ¯্রােতে। কেউ আবার বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। যাদের অনেকেই নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

বর্তমানে বানের জলের মতো রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে এ দেশে। তারা কক্সবাজার টেকনাফসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মিশে যাচ্ছে, বসতি গড়ছে। আমাদের মনে রাখা দরকার, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেই সঙ্কট সমাধান হবে না। বরং আমাদের নিরাপত্তা সুরক্ষায় জন্য রোহিঙ্গাদের স্রোত ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে এখানে যারা আছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে তাদের ফিরিয়ে নিতে। এবং খেয়াল রাখতে হবে রোহিঙ্গা জোনগোষ্ঠী কোনোভাবেই যেন এ দেশের মূল স্রোতে মিশে যেতে না পারে।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ