বুধবার , ২৪ অক্টোবর ২০১৮

শেরপুর প্রতিনিধি :
বিয়ের ১১ বছর পরেই ১৯৯১ সালে স্বামীকে হারান আনোয়ারা বেগম। এসময় সবচেয়ে ছোট সন্তান নয় মাসের কোলের শিশু, মেঝটির তিন বছর আর বড় সন্তানটি ছিল মাত্র ছয় বছর বয়সের। সন্তানের মুখের দিকে তাকালে বুকটা তার (আনোয়ারা) হাহাকার করে ঠেতো। এ তিন সন্তান নিয়ে কিভাবে চলবেন। অনিশ্চয়তার মধ্যে পথ খুঁজতে থাকেন। নিভে যেতে থাকে আশা-ভরসার সব বাতি। তবু ভেঙে না পড়ে তিন সন্তান নিয়েই দুঃস্বপ্নের মতো পথচলা শুরু করেন তিনি। নিজেও জানতেন না এ পথের শেষ কোথায়। সন্তানদের মধ্যেই সমস্ত সুখের ছাঁয়া খুঁজেছেন। নিজের সুখের কথা একবারও ভাবেননি। তাই আর দ্বিতীয় বিয়েও করেননি। একের পর এক লড়াই করেছেন। টাকা-পয়সা সংগ্রহের লড়াই, সন্তানদের মানুষ করার লড়াই। স্বামীর মৃত্যুর পর কোন আর্থিক সঞ্চয় ছিল না তার। কেবল মাথা গোঁজার ৪ শতাংশের একটি ছোট্ট ভিটে ছিল মাত্র। স্বামীর মৃত্যুর পূর্বেই আনোয়ারার বাবা মারা যাওয়ায় বাবার বাড়ি থেকেও সাহায্যের কোন সুযোগ ছিল না। তাই সন্তানদের পড়ালেখা করানোর জন্য টাকা-পয়সা সংগ্রহ করতে বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন, আঙ্গিনায় সবজি চাষ শুরু করেন। কারও সাহায্য না নিয়ে সন্তানদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে  বেসরকারি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে নিজ বাড়িতে ক্ষুদ্র মুদি দোকান শুরু করেন। কিন্তু এগুলো থেকে উপার্জিত অর্থে সংসারই চলে না, কিভাবে সন্তানদের লেখাপড়া করাবেন । দৃঢ় মনোবল ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে  জীবনের সঙ্গী করলেন। পরে মেয়েদের কাপড়, ধান কিনে চাল তৈরী করে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে বিক্রিও করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে অগ্নিকান্ডে বসতবাড়ীসহ সব পুড়ে যায়। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। বাড়ি পুড়ে যাবার পর গ্রামের রাস্তা সংস্কার প্রকল্পের মাটি কেটে সন্তানদের লেখাপড়ার যোগান দেন। গল্পটি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতিবান্দা ইউনিয়নের কবিরাজপাড়া গ্রামের মৃত সালেহ মূসার স্ত্রী  ও সফল জননী  আনোয়ারা বেগমের। 
 দুই ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত জননী আনোয়ারা বেগম। বড় ছেলে মো. আলমগীর হোসাইন শিক্ষকতা ও ছোট ছেলে মো. আনোয়ার হোসাইন বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে  এসএই পদে কর্মরত রয়েছেন। একমাত্র মেয়ে মারিয়াম সালওয়াকে এসএসসি পাশ ও ট্রেইলারিং শিখিয়ে চাকুরীজীবী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তার  তিন সন্তানই নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। 
প্রচ- আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মানসিক শক্তির বলে এই সাহসী নারী জয়ী হয়েছেন। অনেক প্রতিবন্ধকতা, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি একজন সফল গর্বিত জননী। বুধবার (২৪ অক্টোবর ) মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের আয়োজনে তিনি ‘সফল জননী নারী’ ক্যাটাগরির বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন।
এ সম্মানে ভূষিত হওয়ায় আনোয়ারা বেগম বলেন, প্রত্যেক মা তাদের সন্তানদের নিঃশ্বার্থ ভাবে লালন-পালন করেন। কোন কিছু পাওয়ার স্বার্থে নয়। তবুও সরকার আমাকে যে সম্মানের যোগ্য মনে করেছে এ জন্য আমি অভিভূত ও কৃতজ্ঞ। আমি মনে করি এ সম্মান শুধু আমার একার নয়, দেশের সব মায়ের। 

 বিশেষ খবর থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ