বুধবার , ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ |

রাজনীতি: পেশা না নেশা ?

  রবিবার , ২৫ নভেম্বর ২০১৮

অতীতে রাজ‍্য শাসনের প্রয়োজনে মহামান্য রাজারা যে নীতি বা দর্শন অনুসরণ করতেন তাকে বাংলা অভিধানের ভাষায় বলা হয়ে থাকে রাজনীতি। কালের পরিক্রমায় আজ সে রাজা ও রাজ‍্যের ধারণা ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে। এখন আর আমাদেরকে সেই প্রভাবশালী রাজারা শাসন করছেন না, নিজের মর্জিমাফিক ধমকাচ্ছেন না বা তিরষ্কার করছেন না, হুকুম পালন না করার গুরু অপরাধে দেহ হতে আমাদের ধড়কে আলাদা করে ফেলছেন না। মহাপরাক্রমশালী সেই সব রাজার জায়গা দখল করেছেন হালের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীগণ যাদেরকে বলা হচ্ছে আধুনিক রাজনীতির ধারক ও বাহক।তাহলে দেখা যাচ্ছে, আজকে আমরা যেটাকে রাজনীতি বলছি তার ধারণা আমরা পেয়েছি প্রাচীনকালের রাজা- বাদশাদের কাছ থেকে।এটা বলে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, সে সময়কার রাজা-বাদশাদের পেশাই ছিল রাজ‍্য শাসন করা।আর যেহেতু রাজ‍্য শাসনের পিছনে তাদের একটি বিশেষ নীতি বা দর্শন ছিল, যাকে আমরা বলছি রাজনীতি, সেহেতু সেই বিশেষ নীতিটিই ছিল তাদের পেশা।আরো বিশদভাবে বলতে গেলে, রাজনীতিই ছিল তাদের একমাত্র পেশা। পেশা হলো সেই কাজ যা মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য করে থাকে।আর জীবিকার প্রশ্ন যেখানে জড়িত মানুষ সেখানে কোনরকম ছাড় দেয় না। জীবিকার তাগিদেই তারা বরং সে সমস্ত কাজে আরো বেশি দক্ষ, আরো বেশি পারদর্শী হয়ে উঠতে চায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, একজন ডাক্তার, একজন ইঞ্জিনিয়ার কিংবা একজন শিক্ষক যথাসম্ভব বেশি বেশি আয়-রোজগার করার জন্য তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে বেশি বেশি একাডেমিক ডিগ্রি (যেমন, এফআরসিএস, এফসিপিএস, পিএইচডি,এমফিল,বিএড,এমএড ইত‍্যাদি) অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন। আবার এমন চিত্রও দেখা যায়, কিছু অসৎ ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার কিংবা শিক্ষক ওসবের কোন কিছু সম্পন্ন না করেই তাদের চকচকে ও চটকাদার ভিজিটিং কার্ডের গাঁয়ে সেঁটে দেয়, ড. সম্রাট আকবর (এমবিবিএস, এফসিপিএস, এফআরসিএস) কিংবা প্রফেসর জহির উদ্দিন মোঃ বাবর( এমফিল, পিএইচডি) ইত‍্যাকার পাণ্ডিত‍্যপূর্ণ ভুয়া নাম- পরিচয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, যে ব‍্যক্তি সৎ ও যোগ্য সে সৎ উপায়েই তার পেশার শ্রী বৃদ্ধি করছে, আর যে অসৎ ও অযোগ্য সে শুধুমাত্র তার পেশাটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য  সর্বপ্রকারের অসৎ উপায় অবলম্বন করছে। আরো পরিষ্কার করে বললে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হলো, সৎ কিংবা অসৎ যে উপায়েই হোক সবাই তাদের পেশাটাকে টিকিয়ে রাখতে চায় নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই। এখন, রাজনীতিই যেহেতু ছিল অতীতের  রাজা-বাদশাদের একমাত্র পেশা বা বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেহেতু সেখানে অস্তিত্বহীনতা কিংবা বিলুপ্তির ভয়ও ছিল। তাই রাজা-বাদশাগণ তাদের রাজ‍্য চালানোর পেশাটাকে আরো বেশি সুরক্ষিত ও সুসংহত করতে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত কঠোর হস্তে দমন করতেন। বিদ্রোহী কোন ব্যক্তি, দল বা উপদলকে সমূলে উৎপাটন করতেন যাতে তারা কখনো তার রাজত্বের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।পান থেকে একটুখানি চুন খসলেই কোন প্রজাকে নির্বাসনে দিতেন কিংবা শিরশ্ছেদ করতেন। তাদের কাছে সাধারণ প্রজাদের কোনরকম মূল‍্যই ছিল না। যাকে আমরা বর্তমানে বলে থাকি স্বৈরশাসক বা অগণতান্ত্রিক শাসক। রাজনীতি তাদের কাছে শুধুমাত্র একটি পেশা হওয়ার কারণে জনগণের কাছ থেকে তাদের দুরত্ব তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তা তাদের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কালের বিবর্তনে আজ সেই স্বৈরতান্ত্রিক রাজাদের স্বর্ণখচিত সিংহাসন গণতান্ত্রিক শাসক বা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দখলে যাদেরকে আজ আমরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী,এমপি বলে চিনি। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী জনগণের শাসক নন,সেবক। তার কাজ হলো ব‍্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে জনগণের সেবা করা। কারণ, তিনি যখন দেশ শাসন করতে গিয়ে নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাববেন,সেখান থেকে রুটি -রুজি কামানোর কথা চিন্তা করবেন, তখন আগেকার রাজা- বাদশাদের মতন তার মনেও অস্তিত্বহীনতার শঙ্কা জেঁকে বসবে। অর্থাৎ, দেশ ও জনগণের জন্য সেবা বা রাজনীতি করাটা যদি তার পেশা হয়ে যায়, তাহলে তিনি আর চাইবেন না তার সোনার ডিম পাড়া হাঁসটি প্রতিবেশীর আঙিনায় চলে যাক। পেশা বা জীবিকা হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে তিনি তখন তার আশেপাশের সবাইকে সন্দেহ করতে শুরু করবেন।এই পরিস্থিতিতে তার দ্বারা তার কঠোর সমালোচক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীগণ সবচেয়ে বেশি নিগ্রহ ও নিষ্পেষনের শিকার হবে।অন‍্যদিকে, তার কাছ থেকে পুরস্কৃত হবে ধামাধরা ও তোষামোদকারীগণ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আওতায় থেকেও শুধুমাত্র পেশার প্রশ্নে এখনকার রাজনীতি সেই প্রাচীন কর্তৃত্ববাদী রাজাদের নষ্ট রাজনীতিতেই পর্যবসিত হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনীতি যদি পেশা না হয় তবে একজন রাজনৈতিক নেতা খাবেন কী,পরবেন কী?  প্রশ্নটার উত্তর খুবই সহজ। যেহেতু রাজনীতি একটি জনসেবামূলক কাজ, সেহেতু একজন জননেতা এ সত্যটি জেনেই রাজনীতিতে নামবেন। রাজনীতি অবশ্যই তার জন্য নয় যিনি জনগণের জন্য কাজ করতে গিয়ে ক্ষুদ্র ব‍্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিতে পারবেন না, নিঃসহায় কিংবা অভুক্তের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে গিয়ে নিজে একবেলা অভুক্ত থাকতে পারবেন না। রাজনীতি বরং তার জন্য যিনি সকালে ঘুম থেকে উঠেই মানবসেবায় নেমে পড়তে পারেন নাওয়া খাওয়া সব ভুলে গিয়ে। রাজনীতি বরং ঐ ব‍্যক্তির  জন্য যিনি তার নিজের গাঁয়ের শীতবস্ত্রটি খুলে প্রচণ্ড শীতে কুঁকড়ে যাওয়া একটি অশীতিপর বৃদ্ধের গাঁয়ে জড়িয়ে দিয়ে নিজে শীতে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে রাতের অন্ধকারে জনসেবায় নেমে পড়তে পারেন। রাজনীতি তো সেই মহৎ হৃদয়ের জন্য যিনি তার সাজানো গোছানো সুন্দর জীবন ত‍্যাগ করে নিজে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জনগণকে দুহাতে আগলে রাখতে পারেন। কারণ, একজন সত্যিকারের নেতা কখনো জনগণকে শাসন করতে চাননা, আবার তাদের দ্বারা শাসিত হতেও চাননা। তিনি চান জনগণ সবসময় তার বন্ধু হয়ে পাশে থাকতে। তাইতো খ‍্যাতনামা ফরাসি দার্শনিক আলবার্ট কামু একজন সত্যিকারের নেতার মতন স্বগৌরবে উচ্চারণ করেছেন, Don't walk behind me; I may not lead. Don't walk in front of me; I may not follow. Just walk beside me and be my friend. আবার প্রশ্ন এমনও হতে পারে, রাজনীতি যদি একজন নেতার পেশা না হয় তাহলে আমরা দেশ চালাতে দক্ষ শাসক পাব কেমন করে? কেউ নিশ্চয় জেনেবুঝে একজন আনকোরা পাইলটের পিছনে বসে আকাশ ভ্রমণ করতে চাইবে না, চাইবে কি? এর উত্তরও খুব সহজ ও প্রাঞ্জল। দেশ বা জনগণের সেবাই যখন একজন নেতার একমাত্র ব্রত হয়ে ওঠে তখন সে কাজটি তার কাছে পেশা নয়, নেশা হয়ে দাঁড়ায়। আর জনসেবার নেশা এমনি এক নেশা যা তাকে মানুষের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়।এ নেশা কালজয়ী। এ নেশা সব জরা ভেঙে ফেলে নতুন করে গড়ার।এ নেশা নিজে মরে লক্ষ প্রাণকে বাঁচিয়ে তোলার। রাজনীতি এমনি এক রহস্যময় বিচরণক্ষেত্র যেখানে কেউ কেউ পাপ(হত‍্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি)করেও সফল হয়, আবার অনেকে পুণ্য ( মানবসেবা, স্নেহ- ভালোবাসা, দয়া- দাক্ষিণ্য) করেও খলনায়ক হয়।ভাগ‍্যের এমন একপেশে ও একচোখা নীতিকে তাই কটাক্ষ করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট‍্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, Some rise by sin, and some by virtue fall. বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই অমোঘ নিয়তিকে মেনে নিয়েই যারা রাজনীতির ময়দানে মানুষের জন্য ভালোবাসার টানে ছুটে আসেন, রাজনীতি সেই মহৎ ব‍্যক্তিদের কাছে কখনো পেশা হয়ে ওঠে না, বরং ধীরে ধীরে তা একটি শক্তিশালী নেশায় পরিণত হয়।আর নিশ্চয় সে নেশা ঘুমের নয়, জেগে ওঠার। সে নেশা পঁচে যাওয়ার নয়, সুস্থ ও সুন্দর হয়ে ওঠার।

রেজাউল ইসলাম
শিক্ষক ও কলাম লেখক

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ