বুধবার , ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ |

বিশ্ববিদ্যালয প্রতিবেদক:
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য। দিগন্তজোড়া কাঁশফুলের মাঠ, সাদা শুভ্র ফুলের মাঠ, যা কল্পনার জগতকে জাগ্রত করে, এখানে আসলে কাঁশফুলের নরম ছোঁয়া পেতে  ইচ্ছে করবে। ইচ্ছে করবে হারিয়ে যেতে।এখানে ছোট ছোট টিলা আছে। এগুলো আকারে অনেক বড় না হলেও খুঁজে  নেয়া যায় পাহাড়ি ফ্লেবার, আরোহন করা যায় নিচ থেকে একেবারে চূড়ায়।মেডিকেল সেন্টারের ঠিক সামনেই আছে ব্রিজ। ব্রিজের পাশে পদ্ম ফোঁটা লেক, হরেক রকম গাছ-গাছালি, নানা রকম প্রাণী, লাল মাটি, উঁচু নিচু রাস্তার কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রাজধানী বলা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে। জাবির লেকগুলোতে ফুঁটে  থাকা লাল লাল শাপলা কিংবা আগাছার ধবধবে সাদা ফুলগুলো যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের মনে আনন্দ যোগায়।হয়তো মাঝে মাঝে আনমনে বলে ওঠে -
"মরু বিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ, ধুলিরে ধন্য করো করুণার পুণ্যে হে কোমল প্রাণ" রবীন্দ্রনাথ নিসর্গের যে সৌন্দর্য নান্দনিকভাবে এঁকে গিয়েছিলেন তা অতুলনীয়। এখানে উচ্ছ্বাস আছে, প্রেম আছে, আধ্যাত্মবাদ আছে, অজানাকে পাবার আকুতি আছে।  কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের ভিতরেই যে উইলিয়াম ব্লেকের “‘সিক রোজ’ এর মতো কদর্য রূপ আছে তা প্রকৃতির শূন্যতা না দেখলে বোঝা যায় না।
প্রকৃতির এই শূণ্যতা যতটা না প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি মানবসৃষ্ট। দূষণের ফলে প্রকৃতি হারায় তার রূপ, গন্ধ, নান্দনিকতা ও নির্মলতা। প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের রয়েছে নানা কারন। প্রাকৃতিক কারনও যে নেহাত কম নয় তা বিভিন্ন তথ্য দেখলেই বোঝা যায়।বিজ্ঞানীরা বলেন, এই পৃথিবী মোট ১৩ বার ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে,ফের জীববৈচিত্রে ভরে গিয়েছে। তবে মানবসৃষ্ট কারন প্রকৃতি পরিবর্তনের প্রধান নিয়ামক। মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটে,আগাছা পরিষ্কারের নামে বন-জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দেয়,প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান নষ্ট করে।ফলে তৈরি হয় কৃত্রিম সংকট। বন্যপ্রাণী, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়ের আবাসস্থল এক ধ্বংস্তূপে পরিনত হয়।   
পরিবেশের এই ধ্বংসের খেলায় পিছিয়ে নেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। নানান অজুহাতে কাটা হচ্ছে গাছপালা, বন-জঙ্গল,ভরাট করা হচ্ছে প্রাকৃতিক জলাশয়।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ঝাড়ুদার ও বহিরাগত দর্শনার্থীরা বেশির ভাগ সময় আগুন দিয়ে থাকেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন সময় এমনটি করে থাকেন। তাছাড়া ঝোপঝাড় কেটে ফেলা ও বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের কারণে অতিথি পাখি কমেছে। এতে ঝোপঝাড়ে থাকা উপকারী কীটপতঙ্গ ও বাস্তুসংস্থান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর এমনটি চলতে থাকলে একসময় ক্যাম্পাসে অতিথি পাখি আর আসবে না বলে মনে করা হয়। 
অতি সাম্প্রতিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়(জাবি) এর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাশ হয়েছে ১৪৪৫.৩৬ কোটি টাকা।তারও আগে কয়েকটি স্থানে নতুন ভবনের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন উপাচার্য ড.ফারজানা ইসলাম। যার জন্য কাঁটা   হচ্ছে গাছপালা, ভরাট করা হচ্ছে জলাশয়। পরিবেশ প্রেমী বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনের ফলে আইবিএ ভবনের জন্য নির্ধারিত স্থানে অবশ্য নতুন করে গাছ লাগানো হয়েছে।
প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের ভূমিকা যেমন ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী, তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য ও সুষম জলবায়ুর প্রয়োজনে একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সংজ্ঞা অণুযায়ী, ২০০৬ সালে অরণ্য চার বিলিয়ন হেক্টর (১৫ মিলিয়ন বর্গ মাইল) বা বিশ্বের জমির প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা জুড়ে ছিল।  বিশ্বব্যাংকের ২০১৩ সালের হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১১ শতাংশ, ভারতে ২৩ দশমিক ৭, পাকিস্তানে ২, নেপালে ২৫ দশমিক ৪ এবং শ্রীলংকায় ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বনভূমি আছে।
পৃথিবীর জীবমণ্ডলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ অরণ্য। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ও বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে পর্যাপ্ত বৃক্ষ থাকা খুবই প্রয়োজন। বৃক্ষহীনতার কারণে পৃথিবীর নতুন নতুন অঞ্চল মরুময় হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বনের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানবজীবন সমস্যায় পড়তে পারে আগামী শতকের মাঝামাঝিতে। তিন দশমিক পাঁচ বিলিয়ন কিউবিক মিটার কাঠ ব্যবহার করে প্রতিবছর আট হাজার বর্গহেক্টর বনভূমি ধ্বংস করছে পৃথিবীর মানুষ। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিমের বহু বন্যপ্রাণী ও সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে।
বনায়ন করা একারণে প্রয়োজন যে, মানুষ ও বৃক্ষের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে এক গভীর সম্পর্ক, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। বিশেষ করে মানুষ ও উদ্ভিদের পরস্পরের দেহাপোযোগী সামগ্রীর জন্য একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। মানুষ কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে (শ্বাস-প্রশ্বাসের সময়) এবং অক্সিজেন গ্রহণ করে। অন্যদিকে উদ্ভিদ অক্সিজেন ত্যাগ করে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে। পৃথিবীতে বৃক্ষের পরিমাণ হ্রাস পেতে থাকলে এক সময় মানুষের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে। এমনকি এটা মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। পরিবেশ ভারসাম্য হারালে আগামী পৃথিবী হুমকির সম্মুখীন হবে।বিশ্ব ব্যাঙ্ক বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত অসুখবিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ। তারা বলছে, দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ভিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এ আশঙ্কায়ই উদ্ভিদ নিধোনকে অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে তুলে ধরেন এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) জীববৈচিত্র ধ্বংসকারী   মানুষ যেমন আছে, তেমনি জীববৈচিত্র  রক্ষাকারী মানুষও আছে।
প্রকৃতির সংরক্ষণের জন্য প্রায়ই আয়োজন করা হয় সভা,সমাবেশ, সেমিনার। এসব সভা সমাবেশে বক্তারা প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এরকমই একটি 
সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাণি-বৈচিত্র্যের প্রতি সংবেদনশীল হিসেবে জাবির স্বতন্ত্র পরিচয় থাকলেও বর্তমানে তা হুমকির মধ্যে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে পরিবেশ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য লিখিত প্রস্তাব দিলেও তাতে কর্ণপাত করেনি। যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ, বৃক্ষ নিধন, বনভূমিতে আগুন, বাণিজ্যিকভাবে জলাশয় ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।'
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম.এ. মামুন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদূরপ্রসারী কোনও পরকল্পনা নেই। প্রশাসন যাচ্ছেতাইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে। এভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।’
দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এ এস এম আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, ‘পরিবেশ-প্রকৃতি ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব অর্থহীন। উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা না থাকলেও বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন অগ্রণী  ভূমিকা রাখছে। প্রতি বছর প্রকৃতি সংরক্ষণে নানারকম মেলার আয়োজন করা হয় এসব সংগঠনের মাধ্যমে।তারই অংশ হিসেবে প্রজাপতি মেলা,পাখি মেলার আয়োজন করা হয় প্রতি বছর । সচেতন নাগরিকেরা যদি তাদের সাহায্যে এগিয়ে না আসে তবে সবুজ ক্যাম্পাস একদিন জীববৈচিত্র শূন্য মরুভূমিতে রুপান্তরিত হবে।বৈচিত্র্য হারিয়ে জলাশয় হবে বালুকাময় আর অরন্যে ঘেরা লাল ইটের হলগুলো হবে গাছপালা শূন্য ।যেখানে পাখিরা আর গান গাইবে না,সকালের কোমল বাতাসে কচি পাতা আর দুলবে না, প্রজাপতিরা আর ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াবে না মধ্যদুপুরে কিংবা পড়ন্ত বিকেলের লাল আলোয়।

নাফিউর রহমান ইমন; স্নাতক শিক্ষার্থী; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়       

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ