রবিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

এ পৃথিবীতে আমার আর কেউই রইল না’

  রবিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

টেকনাফের হোয়াইক্যং লম্বাবিল এলাকার একটি রাস্তা। সেখানে কথা হয় জরিনা বেগম (২৭) নামে এক রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে। তিন মাসের কন্যাশিশুকে নিয়ে গত শুক্রবার শাহপরীর দ্বীপ ভাঙ্গা নামক স্থান দিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। গতকাল শনিবার সকালে শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন লম্বাবিল এলাকার একটি তাঁবুর পাশে। তার চোখে-মুখে অনিশ্চয়তা। ফুটফুটে মায়াবি এ শিশুকে নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ফুটপাতে; পাশে একটি তাঁবু। কোথায় যাবেন কিছুই জানেন না ওই নারী। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘এ পৃথিবীতে আমার আর কেউই রইল না। মা-বাবা ও স্বামীকে সেনাবাহিনী গুলি করে মেরেছে। সাত দিন সাগর-জঙ্গল-পাহাড় অতিক্রম করে সন্তানকে বুকে নিয়ে এ দেশে এসেছি। যেদিকে মানুষ যাচ্ছে, সেদিকে যাচ্ছি। গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছি। কী করব, কোথায় যাব, কার কাছে যাব—কিছুই জানি না। শিশুটা কিছুক্ষণ পরপর কান্না করে। শুক্রবার দুপুর থেকে খাবার জোটেনি। খাবার জুটলেও গলা দিয়ে নিচে নামবে না। কীভাবে নামবে, স্বামী-বাবা-মা কেউ-তো আর বেঁচে নেই!’

জরিনা বেগমের মতো এ রকম হাজারো মানুষ এখন টেকনাফ-উখিয়া সড়কের দুই ধারে অপেক্ষা করছেন। গতকাল সকালে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার ঘোলার চর, মাঝেরপাড়া ও পশ্চিমপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, একের পর এক ট্রলারে করে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর প্রবেশমুখেই স্থানীয়রা তাদের বাংলাদেশে আসতে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন।

গতকাল সকালে শাহপরীর দ্বীপ মাঝেরপাড়ায় আসেন আমিনা খাতুন (৫০)। তিনি বলেন, মিয়ানমারে এখনো বর্বর নির্যাতন চলছে। তার স্বামীকে সেখানকার সেনাবাহিনী চোখের সামনে হত্যা করেছে। প্রাণভয়ে তিনি চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। বাংলাদেশে আসতে তার তিন দিন সময় লেগেছে।

গতকাল শাহপরীর দ্বীপ পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, পুড়িয়ে মারা ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর এবার রোহিঙ্গাদের জমিগুলো দখল করে নিচ্ছে মিয়ানমারের বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। রাখাইন রাজ্য থেকে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়ে তাদের জমিগুলোতে ইতোমধ্যে স্থাপনাও নির্মাণ শুরু করেছে মিয়ানমারের বাহিনীরা। এ ছাড়া আরো অনেক নতুন নতুন গ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যেতে সেনাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

গতকাল সকালে নৌকা নিয়ে নাফ নদ পার হয়ে মিয়ানমার থেকে শাহপরীর দ্বীপে প্রবেশ করেন আলী আহমদ (২৫)। মংডুর সাহেবপাড়া গ্রামে তার বাড়ি। তারা একসঙ্গে ২৩ জন একটি নৌকা নিয়ে প্রবেশ করে টেকনাফে। এর মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি। আলী আহমদ বলেন, ইতোমধ্যে শতাধিক গ্রাম রোহিঙ্গাশূন্য হয়েছে। এসব গ্রামে এখন কোনো বাড়িঘরের চিহ্ন নেই। চারদিকে আগুনে পোড়ার চিহ্ন। তার গ্রামেও সব ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে রোহিঙ্গাশূন্য গ্রামগুলো বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনীর ব্যাপক বিচরণ দেখা গেছে। বাড়ি নির্মাণের জন্য অনেক সরঞ্জামও মজুদ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের কাজও চলছে।

মংডু থানার আদ্দুইল্লা পাড়া গ্রামের সুফিয়া খাতুন (৪২)। তিনিও গতকাল সকালে আলী আহমদের সঙ্গে নৌকায় করে শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছান। তিনি বলেন, নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না। একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নতুন নতুন এলাকায় ঢুকে পড়ছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। রোহিঙ্গাদের ঘর জ¦ালিয়ে দিচ্ছে। অনেকে বাড়ির ভেতর পুড়ে গিয়ে নির্মম মৃত্যু হয়েছে। তবু নিজ দেশ ও গ্রাম ছেড়ে এ দেশে (বাংলাদেশে) আসতে চাননি সুফিয়া খাতুনসহ অনেকে। কিন্তু তাদের পাশের চান্দুপাড়া পুড়িয়ে দিয়েছে সেনারা। শুক্রবার দিনভর চান্দুপাড়া গ্রাম পুড়ছে। রাতেও গ্রামে আগুন জ¦লছে। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে সাত সন্তান নিয়ে শনিবার ভোরে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে সুফিয়া খাতুন।

মিয়ানমারের নিলম্বা পাড়া গ্রামের সারা খাতুন (২৫) বলেন, সেনাদের টহল নজরে পড়লে যেন মৃত্যু দ্রুত পৌঁছে যায় এমন আতঙ্ক। এ সময় আল্লাহর জিকির ছাড়া আর কোনো ঢাল নেই। পথে পথে মৃত্যুর ভয়, আতঙ্ক, ঝুঁকি আর লাশের গন্ধ। এভাবে প্রতি মুহূর্ত আতঙ্ক ও মৃত্যুর ভয় নিয়ে হাঁটার পর অবশেষে শুক্রবার রাতেই মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া সীমান্তে পৌঁছান। সেখানে আরো ১৭ জনের মতো রোহিঙ্গার দেখা হলে তাদের সঙ্গে গতকাল ভোরে নৌকা নিয়ে নাফ নদ পার হয়ে শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছান সারা খাতুন, তার সন্তান মিরাজ (১), আবদুুল্লাহ (৩), ইয়াছমিন (৫) ও স্বামী দেলোয়ার।

গত শুক্রবার ও শনিবার প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে বলে জানা গেছে। গতকাল আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর মিডিয়া সমন্বয়কারী ক্রিস লোম জানিয়েছেন, উখিয়া, টেকনাফ ও তুমব্রু সীমান্তের জিরো পয়েন্টে দিয়ে এ পর্যন্ত তিন লাখ ৯১ হাজার রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে অব্যাহত রয়েছে অনুপ্রবেশ। অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ষাট শতাংশ শিশু ও নারী। তারা ঝুপড়িতে বসবাস করছে। আর তাদের সহায়তায় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কাজ করছে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আইওএম, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও আইএসসি। পাশাপাশি কাজ করছে বিভিন্ন এনজিও। তিনি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের আসার স্রোত অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়াতে পারে।

 সারা বাংলা থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ