রবিবার , ১৮ আগষ্ট ২০১৯ |

একুশ শতকে দাড়িয়ে প্রযুক্তি ছাড়া আমরা একটা মুহুর্তও কল্পনা করতে পারিনা। হাতের মোবাইল থেকে শুরু করে ঘরের টেলিভিশন, অফিসের কম্পিউটার থেকে শুরু করে বাড়িতে ফেরার গাড়ি কোথায় নেই প্রযুক্তির ব্যবহার। চিত্ত-বিনোদনেও প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসবকিছু ব্যাখ্যা করার তেমন প্রয়োজন নেই। আজকে আলোচনার বিষয় হচ্ছে “প্রযুক্তি এবং গণমাধ্যমে শিল্পকলা” যা ইতিহাসের আলোকে ব্যাখা করার আগ্রহ রয়েছে।
  
আমাদের জীবন বাস্তবতার সাথে প্রযুক্তির সম্পর্কটা সেই প্রাচীন যুগ থেকেই। যখন মানুষ জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য প্রথম হাতিয়ারটি নির্মাণ করেছেন সেখানেও ছিলো মানুষের ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞান অর্থাৎ সর্বপ্রথম প্রযুক্তি আর সেই হাতিয়ারটিই সর্বপ্রথম শিল্প। আর ফ্রান্সের যে প্রগৈতিহাসিক গুহাচিত্রগুলোই সর্বপ্রথম তাদের ভাষা সভ্যতার সকল মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে , তাইতো সভ্যতার সর্বপ্রথম গণমাধ্যম সেই সকল গুহাচিত্র সমূহ।   

গণমাধ্যম  
গণমাধ্যম সেটাই যা সরাসরি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত এবং গণমানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে। গণমাধ্যমে পণ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানুষ। নানামুখি চিন্তা-দর্শন, তথ্য-উপাত্ত প্রকাশের মাধ্যমে নাগরিক সমাজবোধ টাকে উজ্জিবীত করে। গণমাধ্যমে মূল লক্ষ্য হচ্ছে সামাজিক এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অবস্থান থেকে কাজ করা। আবার শিল্পেরও সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। একজন শিল্পীও যেহেতু সমাজের অভ্যন্তরেই বেড়ে ওঠে সুতরাং তাঁর সমস্ত চিন্তা ও বোধের ধারণা সমাজ এবং সমাজ বাস্তবতা থেকেই প্রাপ্ত। সুতরাং শিল্পের এবং গণমাধ্যমের চেতনাগত ও অভিজ্ঞতালব্ধ উৎস একই এবং প্রকাশের লক্ষ্য, উদ্দেশ্যও একই।     
‘গণমাধ্যম’ এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বহুল ব্যবহারে গণমাধ্যম শব্দটির ভিন্নার্থ দাড়িয়ে যাচ্ছে;  কিন্তু জনমানুষের মিথস্ক্রিয়া এবং মাধ্যমের যাবতীয় কাজকর্মে জনমানুষের সম্পৃক্ততা থাকলেই কেবল কোনো মিডিয়া নিজেকে গণমাধ্যম বলে দাবি করতে পারে। বর্তমান সময়ে ব্লগ যে চরিত্র ধারণ করেছে, তাতে গণমাধ্যম হিসেবে বিকশিত ও প্রতিষ্ঠা পাবার অনেক সুযোগ রয়েছে। যেখানে সত্যিকার অর্থেই মানুষ নিজেদের বিষয় নিয়ে কথা বলবে। নিজের কথা অপরের মুখ দিয়ে বলানোর চেয়ে নিজের কথা বলবে নিজেই। নিজেদের চিন্তাভাবনা অন্যের সঙ্গে নিজেই শেয়ার করবে এবং পরস্পরের যুক্তিতর্কগুলো উঠে আসবে সরাসরি। ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তাভাবনা পণ্যের প্রভাবে প্রভাবিত না হয়ে নিজস্ব প্রয়োজনে আবর্তিত হবে। 


প্রযুক্তি ও শিল্পকলা

প্রযুক্তি কিন্ত বিজ্ঞানের বাইরে কিছু নয়। প্রযুক্তি হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞান এবং শিল্পকলার মূল লক্ষ্য কি? মূল লক্ষ্য হচ্ছে সত্যকে অনুসন্ধান করা। এই অনুসন্ধান হচ্ছে জীবন দর্শনের অনুসন্ধান, এই অনুসন্ধান হচ্ছে প্রকৃতির মাঝে নিরন্তর লড়াই সংগ্রামে টিকে থাকার মাধ্যম অনুসন্ধান, সভ্যতার যুগে উত্তরণের অনুষঙ্গ অনুসন্ধান। অর্থাৎ সত্যকে জীবন বাস্তবতার আলোকে সৃষ্টির সাথে সন্নিবেশিত করাটাই শিল্প এবং প্রযুক্তির একমাত্র লক্ষ্য। 
ঐতিহাসিকভাবেও কিন্ত প্রযুক্তি এবং শিল্পকলার উৎস হচ্ছে জীবন ও বাস্তবতা।
একধরণের আকাঙ্খা এবং প্রয়োজন থেকে পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সিদ্ধান্ত তৈরির নিমিত্তেই এ-দুইয়ের সৃষ্টি হয়। আদিম পর্বে শিকারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে শিল্পকলার জন্ম আবার গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে মধ্যাকর্ষণ সূত্রের আবিস্কার হয়েছে। আবার ফুটন্ত জলের কেটলি থেকে উর্ধ্বমুখি বাস্প দেখে স্টিম ইঞ্জিন তৈরির ভাবনার উদয় হওয়া এসব কিন্ত হাজার হাজার বছর ধরেই ঘটে চলেছে। অর্থাৎ প্রকৃতি এবং জীবন বাস্তবতার চেতনাগত জ্ঞানের মধ্য দিয়েই প্রযুক্তি ও শিল্পকলা কালে কালে বিকশিত হচ্ছে। 
প্রযুক্তি কার্যকারন খুঁজে বের করে  আর শিল্পকলা সেই সময়টাকে ধারণ করে প্রকাশিত হয়। যা সময়ের ঘটনা প্রবাহের দলিল হয়ে থাকে। প্রযুক্তি বা বিজ্ঞান সত্যের প্রমাণ চায় এবং সত্যের উৎসকে মানব কল্যানে প্রয়োগ করার উপায় আবিস্কার করে থাকে আর শিল্পী সত্যকে অনুভব করে চেতনার অবয়বটাকে রূপায়িত করে।   
শিল্পী নির্মাল্য নাগ বলেছেন --------“ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন শিল্পকলাকে সমৃদ্ধ করেছে নানাভাবে, তেমনি শিল্পকলাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীনযুগ থেকে আধুনিকযুগ পর্যন্ত শিল্পের যে সমস্ত উপকরণ, তা প্রায় সবই বিজ্ঞানের অবদান।আবার শিল্পের টেকনিক বা আঙ্গিকগত যে অগ্রগতি তা প্রায় সবই শিল্পীর বিজ্ঞান মনস্কতারই ফলশ্রুতি।”
বিশিষ্ট শিল্পতাত্তিক নির্মাল্য নাগের কথায় একটি বিষয় বেশ পরিস্কার আর তা হচ্ছে শিল্পকলায় প্রযুক্তির ব্যবহার অনস্বীকার্য।

গণমাধ্যম ও শিল্প   
ভাষা যে মাধ্যমে গণমানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে তাকেই আমরা গণমাধ্যম বলে থাকি। গণমাধ্যমের কাজ কি? এর কাজ হচ্ছে মানুষের কথা গণমানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া। মানুষের জীবন বিধৌত সঙ্গতি, অসঙ্গতি, সঙ্কট, ঊত্তরণের উপায় নানাবিধ বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। সংবাদ অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠতা বা সত্যকে পরিবেশন করাটাই গণমাধ্যমের কাজ। 
আমাদের দেশের গণমাধ্যমের মধ্যে ছাপা মাধ্যম অর্থাৎ দৈনিক পত্রিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি দৈনিক পত্রিকার কাজ হচ্ছে মানুষের কাছে সংবাদ উপস্থাপন করা। এখন আলোচনার বিষয় হচ্ছে এই মাধ্যমে শিল্পটা কোথায়। শিল্পটা থাকে সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই। শিল্পটা থাকে তথ্য উপাত্ত বিন্যাসের মধ্যে; শিল্পটা থাকে সংবাদের দৃশ্যায়নে। আবার একটি আলোকচিত্র হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ। আবার কখনও কখনও পত্রিকায় ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হয় যা পুরোমাত্রার একটি বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ বা ব্যাঙ্গচিত্র নিজেই একটি ফিচার। একটি ব্যাঙ্গচিত্র পত্রিকার একটি বাস্তব দৃশ্যকল্প তৈরি করে দেয়। 
একটি পত্রিকার প্রত্রিকার প্রথমপাতার মাষ্টহেড থেকে শুরু করে শেষপাতা পর্যন্ত একজন শিল্পীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি যে কথাটা বলতে হয় যে শিল্পের কার্যকারিতা ছাড়া গণমাধ্যমের পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব নয়। 
একটি ছবিতে কিন্তু সংবাদ থাকে; থাকে গল্প, কবিতা অনেক কিছুই।  যেমন পিকাসোর গুয়ের্নিকা চিত্রকর্মটি ১৯৩৭ সালে আঁকা। অথচ আজও বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও তৎপরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপট এই ছবিতে চিত্রিত করা হয়েছে। একটি চিত্রকর্মে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সার্বিক সংবাদ ধারন করে রাখা হয়েছে-এটাই কিন্ত পাঠযোগ্য অর্থাৎ সেই সময়ের পৃথিবীব্যাপী হাজার হাজার গুণ বেশী শক্তিশালী সংবাদ উপস্থাপন করে চলেছে পাবলো পিকাসোর এই চিত্রকর্মটি। তাহলে আমরা বলতে পারি যে পিকাসোর এই শিল্পকর্মটি যেহেতু সময়কে ধারণ করে মানুষের কথা বিশ্বব্যাপী গণমানুষের কাছে নিয়ে এসেছে সুতরাং এই চিত্রকর্ম নিজেই একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। 


অষ্টাদশ শতাব্দীতে যন্ত্রসভ্যতার ব্যাপক উন্নতির মধ্য দিয়ে অর্থনীাতির সাথে মানুষের সার্বিক কর্মকা-ের সম্পর্ক বাড়তে শুরু করলো। সৃজনশীল কর্মপরিকল্পনাও এই ধারার বাইরে আর থাকলো না। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনার ব্যাপক অগ্রগতি ঘটলো; শুরু হয়ে গেলো 
পণ্য প্রতিযোগীতা
এবং বাজার দখলের প্রতিযোগীতা।
সবকিছু মিলিয়ে গণসংযোগ বা গণমাধ্যমের বিকাশের দিকে মানুষের বিশেষ গুরুত্ব প্রকাশ পেলো। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপে ই-াষ্ট্রিয়াল আর্ট
এপ্লায়েড আর্ট
কমার্শিয়াল আর্ট
এ্যাডভার্টাইজিং আর্ট ইত্যাদির উদ্ভব ঘটেছিলো। 
প্রাচীনযুগ থেকেই প্রচারের মাধ্যম হিসেবে শিল্পের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো এবং আধুনিক সভ্যতাতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। আধুনিকযুগে এসে যা ঘটেছে তা হচ্ছে প্রচারের ক্ষেত্রে শিল্পের সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি। এসময়কালে শিল্প শব্দটির সাথে বাণিজ্যিক শব্দটি যুক্ত হয়ে গেলো। উনবিংশ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী এই কালপর্বে এসে বাণিজ্যিককলা বা ফলিত কলার অর্থ পাল্টে যেতে থাকলো। এবং শুধুমাত্র বাণিজ্যিক স্বার্থেই শিল্পের ব্যবহারবিধি পরিবর্তিত হয়ে এর গুণগত পরিবর্তন ঘটলো এবং আর্টের সাথে যুক্ত হলো কমার্শিয়াল শব্দটি অর্থৎ কমার্শিয়াল আর্ট বা এ্যাড আর্ট। যা পরবর্তীতে গ্রাফিক ডিজাইন নামে নতুন একটি প্রায়োগিক শিল্পমাধ্যমের জন্ম দিলো।এই আর্ট থেকে কমার্শিয়াল আর্ট, কমার্শিয়াল আর্ট থেকে গ্রাফিক আর্ট এই সবকিছুই প্রযুক্তি ও গণযোগাযোগের ফলাফল। যেখানে যোগাযোগটা গুরুত্বপূর্ণ সেখানে প্রযুক্তির ছোয়ায় শিল্পমানসের পরিবর্তন ঘটছে প্রতিমুহুর্তে এবং শিল্পীর সৃজনীস্বত্বার সাথে পরিচয় ঘটছে বিশ্বময়তার।  

 তথ্য প্রযুক্তি থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ