মঙ্গলবার , ২৩ July ২০১৯ |

যশোর প্রতিনিধি :
যে বস্তুকে মানুষ বর্জন করতে চায়, সেটাই বর্জ্য। এই বর্জ্য মোকাবেলায় এখন পরিবেশ রক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে একটি সুখবর দিয়েছে যশোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।  এক সময় যশোরের যে স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় নাক-মুখ রুমাল দিয়ে চেপে ধরতে হতো। নাম শুনলে বমি আসতো, ভুল করেও কেউ ওদিকে তাকাতেন না। যশোরের সে স্থানটি এখন হয়ে উঠছে অনেক গুরুত্বপুর্ণ। ময়লা খানা হিসাবে পরিচিতি সেই স্থানে এখন আর দুর্গন্ধ নেই। নেই আগেরমত ময়লা আবর্জনাও। সেখানে গড়ে উঠছে নানা স্থাপনা। সেই ময়লা খানা থেকে এবার উৎপাদন হবে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ কাজটি করছে যশোর পৌরসভা।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রথম ময়লামুক্ত পৌরসভায় পরিণত হতে চলেছে যশোর। এ ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট। শহরের নানা বর্জ্য দিয়ে জৈব সার, বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস তৈরি করা হবে। পৌরসভার সব নাগরিককে সম্পৃক্ত করে শিগগিরই ময়লামুক্ত যশোর পৌরসভার ঘোষণা দেয়া হবে বলে মনে করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের প্রাচীনতম পৌরসভা যশোর। ১৪ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার আয়াতনের এই পৌরসভার চার লাখ মানুষের বসবাস। পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ৫৭টি ডাস্টবিন ছিল। কিন্তু এর বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে নাগরিকরা বাধ্য হয়ে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে আসছিলেন। এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এরপর নগর অ ল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৪ কোটি ৫৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯শ’ ৭ টাকা ব্যয়ে শহরতলীর ঝুমঝুমপুর ময়লাখানায় পৌরসভার নিজস্ব জায়গায় নির্মাণ করা হয় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট। প্লান্টের শতভাগ কাজও শেষ। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়নি।
শহরের সব ময়লা আবর্জনা এই প্লান্টে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে কম্পোস্ট সার ও বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে। এটিই দেশের প্রথম আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন যশোর পৌরসভার মেয়র জহুরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু। এ ব্যাপারে পৌর মেয়র বলেন, দেশের প্রথম ময়লামুক্ত পৌরসভা হিসেবে যশোরকে ঘোষণা করতে যাচ্ছি। এ জন্যে পৌরসভার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে। প্রতিটি নাগরিককে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করে পুরো পৌর এলাকাকে ময়লামুক্ত করা হবে। মডেল পৌরসভা হিসেবে যশোর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট বা ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন হবে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ। বর্জ্য থেকে শহরে যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায় এ জন্যে ময়লা আবর্জনা ফেলতে চালু করা হচ্ছে ঢাকনাযুক্ত কন্টেইনার ডাস্টবিন। 
এ প্রকল্প চালু হলে শহরের সব আবর্জনা ঢাকনাযুক্ত স্থানে ফেলা হবে। তারপর এই বর্জ্য নেয়া হবে শহরের ঝুমঝুমপুরের ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থানে।  পৌরসভার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শহর পরিস্কার রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্যে ৯০টি কন্টেইনার ডাস্টবিন ব্যবহার করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ে ১০টি ডাম্পিং ট্রাক ওই স্থান থেকে ময়লা অপসারণ করবে। প্রকল্পের কাজের জন্য একটি বুলডোজার ও একটি এক্সেভেটর ব্যবহার করা হবে।
এ প্রকল্পের জায়গার চারপাশ ১৫-২০ ফুট উঁচু প্রাচীর দেয়া হয়েছে। প্রাচীরের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে কম্পোস্ট প্লান্ট, প্রি-ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, বায়োগ্যাস ডাইজেস্টার, কন্ট্রোল ল্যান্ড ফিল সেইভ ও ইন্টিগেট স্যানেটারি ল্যান্ড ফিল সেইভ। পাশাপাশি সেখানে অফিস, স্টাফ কোয়ার্টার, ট্রাক রাখার শেডও নির্মাণ করা হয়েছে। পাঁচটি পুকুর খনন করা হয়েছে। সেখানে ফেলা হবে প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রের ডাস্ট। প্রাথমিক পর্যায়ে ময়লা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রে ২০ থেকে ৩০ টন বর্জ্য ডাম্পিং করা হবে।
শুধু যশোর পৌরসভার নয়, নওয়াপাড়া, বেনাপোল, বাঘারপাড়া ও ঝিকরগাছা পৌরসভাসহ নিকটবর্তী শহর সংলগ্ন এলাকার বর্জ্যও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে নেয়া হবে। ১০ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পে পর্যায়ক্রমে ডাম্পিং করা হবে ৪৫ টন বর্জ্য। প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আবর্জনা থেকে উৎপাদন করা হবে বিদ্যুৎ। উৎপাদিত এ বিদ্যুৎ দিয়ে পরিচালিত হবে প্লান্টের নানা কাজ।
এছাড়া সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য থেকে উৎপাদন করবে পরিবেশবান্ধন জৈব সার, যা বাজারজাত করা হবে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে উৎপাদিত হবে বায়োগ্যাস। যা পাইপ লাইনের মাধ্যমে আশপাশের এলাকার বাসাবাড়িতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরবরাহ হবে বলেও পরিকল্পনা রয়েছে। ময়লা রাখান জন্যে ঝুমঝুমপুরে ১৩ দশমিক ২৫ একর আয়তনের ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে।
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আহসান বারী জানান, ২০১৬ সালের শেষের দিকে প্রকল্পটি হাতে নেয় যশোর পৌরসভা। এরপর মে মাসে প্রস্তাব পাঠান হয় এডিবিতে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে ৫০ কোটি দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর থাকলেও পরে তা দু’বছর করা হয়। কাজ এখন শেষ। খুব শিঘ্রই উৎপাদন শুরু হবে। তিনি জানান, ময়লা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রের নির্মাণকালীন কারিগরি কাজের তদারকিতে রয়েছে ওয়েস্ট কনসার্ন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সরকার ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি ও যশেঅর পৌরসভা। এ প্রকল্পে খান এগ্রো নামে একটি প্রতিষ্ঠান সার উৎপাদন করবে।
যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু জানান, পৌর নাগরিকরা সুযোগ-সুবিধা থেকে চিরদিন বি ত ছিল। মেয়রের উদ্দেশ্য শহরকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, মাদকমুক্ত শহর গড়া, আলোকিত করা ও জলাবদ্ধতা দূর করা। এসব ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়েছেন তিনি। পৌরবাসীর সহযোগিতা পেলে আরও অনেক কাজ করতে পারবেন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন,  মডেল পৌরসভা হিসেবে যশোর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

 সারা বাংলা থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ