সোমবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

মেজর (অবঃ) আমিন পাটোয়ারী:
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে জাতীয় পরিচয় পত্র একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যাক্তিগত ডকুমেন্ট। গত  ১০ বছর পূর্বেও জাতীয় পরিচয়পত্রের এতটা অপরিহার্যতা ছিলনা যতটা না বর্তমানে। ব্যাংক একাউন্ট খোলা, চাকুরীর আবেদন করা, পাসপোর্ট ও ভিসার জন্য আবেদন, মোবাইল ফোন নিজ নামে রেজিষ্ট্রিকরণ, যানবাহানের ডকুমেন্ট করা, জমির দলিল করা, আয়কর প্রতিবেদন জমা করা ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জন্য আবেদন সহ বহুবিধ কর্মকান্ডে জাতীয় পরিচয় পত্রের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যদিও এই ডকুমন্টেটি প্রত্যেকটি প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের একটি অপরিহার্য বিষয় কিন্তু সে অনুসারে এর প্রাপ্তি কর্তৃপক্ষ সহজ করতে পারেন নাই। পরিনামে নাগরিক গণের জন্য এটা একটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব, আমলা তান্ত্রিক জটিলতা, কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ জনবলের অভাব, ফিংগার প্রিন্ট মেশিন, স্ক্যানার, প্রিন্টারের অভাব, ইত্যাদি। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, এন, আই, ডি, সদর দফতর নির্বাচন প্রশিক্ষন ভবনে (ঞঞও) স্থানান্তর এবং ফিংগার প্রিন্ট মেশিন কিছু কিছু উপজেলা / ওয়ার্ড পর্যায়ে স্থাপনের পর এর কার্যক্রমে কিছুটা গতিশীলতা এসেছে। কিন্তু এই গতিশীলতার পরিমান অতি নগন্য। এ ব্যপারে বিষয়টিকে আরও ‘ক্লাইয়েন্ট ওরিয়েন্টেড’ এবং গণমুখী করতে হ’লে আরও পরির্বতন আনতে হবে। 
এই লিখাটি লিখার পূর্বে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে আগার গাঁওয়ে অবস্থিত এন, আই, ডি পূর্বতন সদর দফতর  (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনের ৬ তলা), বর্তমান সদর দফতর (ঞঞও), কচুক্ষেতে অবস্থিত ওয়ার্ড ভোটার আই,ডি, অফিস, আগারগাঁও পানির ট্যাংকের কাছে অবস্থিত ওয়ার্ড ভোটার আই,ডি, অফিস পরিদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টাফ এবং আবেদন কারীগণের সাথে আলাপ করেছি। আবেদন কারীগণের সাথে আলাপে তাদের ক্রমাগত ভোগান্তির অভিজ্ঞতার বিষয়টিই ফুটে উঠেছে। তাছাড়াও এ সকল অফিস গুলোতে আমার ও আমার পরিবারের সদস্যগণ এবং আত্মীয় সজনের পরিচয়পত্রের ব্যপারে বিভিন্ন সময়ে যেতে হয়েছে।  কোন একজন থানা নির্বাচন কর্মকর্তাকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম আবেদন জমা দেয়ার দিনই অথবা ৭ দিনের মধ্যে পরিচয় পত্র ইস্যু করতে অসুবিধা কোথায়? তিনি আমাকে জানালেন যে, পরিচয় পত্র প্রিন্ট করার তাদেরকে কোন অনুমতি দেয়া হয় নাই, এটা শুধু আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সদর দফতরের এখতিয়ার। এ ধরনের বিশেষ প্রিন্টার তাদেরকে ইস্যু করা হয় নাই। বিষয়টি বেশ আমলাতান্ত্রিক মনে হল। উপজেলা/ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রিন্টার এবং প্রিন্টিং এর অনুমতি প্রদানে কি অসুবিধা আছে তা আমার বোধগম্য হল না। 
এন,আই,ডি, সদর দফতরের একজন মধ্যবর্ত্তী পর্যায়ের  কমকর্তাকে এই প্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসায় তিনি জানালেন যে, এ ধরনের বিষয় উপজেলা পর্যায়ে দেয়া উচিৎ নয়, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। এ বিষয়টি কোন প্রকারেই বোধগম্য হলনা যে, কেন একজন উপজেলা/ওয়ার্ড পর্য়ায়ের আবেদন কারীকে এন, আই,ডি, সদর দফতরে এসে ধর্না দিতে হবে। একজন আবেদন কারী তার আবেদনের কয়েক ঘন্টার মধ্যে কেন তার  পরিচয় পত্র নামক সোনার হরিনটি হাতে ওই একই স্থানে বসে পাবেন্ না তার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ পাওয়া গেল না। যদি  এ ধরনের সেবা কর্তৃপক্ষ না দিতে পারেন তবে ডিজিটালাইজড্ হওয়ার দাবিটি হাস্যকর এবং নাগরিকগণের সাথে প্রতারনার সামিল। এখানে উল্লেখ্য যে, বছরে যদিও ২/৩ বার উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে খোলা মাঠে পরিচয় পত্রের কার্যক্রম করা হয়ে থাকে, কিন্তু পরিচয় পত্রটি আর দেয়া হয়না। আবার  অপরদিকে এ সকল প্রোগ্রামের সময় বিভিন্ন কারণে বহু সংখ্যক লোক হাজির থাকতে পারেন না।
নতুন পরিচয় পত্রের জন্য আবেদন ঃ একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের নতুন পরিচয় পত্রের জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয়তা সনদ, পিতা-মাতার পরিচয় পত্রের কপি, এস, এস, সি, পাশের সনদের কপি, গ্যাস বা বিদ্যুৎ বিলের কপি, ইত্যাদি জমা দিতে হয় - এটা একটু অতিরঞ্জিত মনে হয়। জন্ম নিবন্ধন সনদটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয়তা  সনদ পত্রটি শুধুমাত্র যাদের বর্তমান ঠিকানার সাথে জন্ম নিবন্ধনের ঠিকানার মিল নাই, শুধু তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে। যাদের বর্তমান ঠিকানা ও জন্ম নিবন্ধনের ঠিকানা একই তাদের ক্ষেত্রে জাতীয়তার সনদ পত্রটি অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। তাছাড়া অন্যান্য বাকী সনদপত্রগুলি জমাদান শিথিল করা যেতে পারে।
এটা সকলের জানা আছে যে, বিভিন্ন অফিস হতে এক একটি সনদপত্র সংগ্রহ করতে মাসের পরে মাস লেগে যায়, তারপরে আবার উপরি দিতে হয়। যে সকল পরিবারে একজন বৃদ্ধ/বৃদ্ধা বা বিধবা বা লেখাপড়া জানা লোকের অভাব, তাদের ভোগান্তির শেষ থাকেনা। এক পর্যায়ে আবেদন ইচ্ছুক ব্যাক্তিগণ এত সকল সনদপত্র জোগাড় করতে না পেরে হাল ছেড়ে দেন। হয়তো বা কেউ কেউ তখন বিভিন্ন অফিসের দালালের আশ্রয় নেন। যাদের ক্ষমতা আছে অথবা যারা সমাজের উচ্চ পদে আসীন তারা পরিচয়পত্র হয়ত তাড়াতাড়ী পেয়ে যান।
গেজেটেড অফিসার কর্তৃক সত্যায়ন ঃ বর্তমানে বিশ্বের খুব কম দেশেই গেজেটেড অফিসার নামক ব্যাক্তিটি কর্তৃক সনদ পত্রের সত্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে। সারা বিশ্বে এখন ফটোকপির মাধ্যমে সকল কার্যক্রম করা হয়। তাই এই গেজেটেড অফিসার কর্তৃক সত্যায়নের প্রক্রিয়াটি বাতিল করা যেতে পারে।
বাংলা ও ইংরেজী অক্ষরের জটিলতাঃ আমরা সব সময় বাংলা ও ইংরেজী ভাষার একটি যাতাকলে প্রতিদিন নিষ্পেসিত হচ্ছি। বাংলার প্রতি অবশ্যই আমাদের ভালোবাসা থাকবে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের জনগন যখন লেখাপড়া ও চাকুরির জন্য বিদেশে যান তখন তার সকল ডকুমেন্ট ইংরেজিতে উপস্থাপন করতে হয়। এখানে বাংলা বানানের পরিবর্তনের জন্য আবেদনকারিগণ ভোগান্তিতে পড়েন। উদাহরণ স্বরূপ এস, এস, সি, বোর্ডের সার্টিফিকেটে ইংরেজীতে ‘গড়যধসসধফ প্রায়শই বাংলায় ‘মোঃ’ দিয়ে লিখা হয়। কিন্তু পরিচয় পত্রের জন্য প্রার্থী হয়তো ‘মোহাম্মদ’ পুরোই লিখেছেন সেই প্রেক্ষিতে অফিসে নামের বানানের পরিবর্তনের জন্য যারপর নাই অসুবিধার সন্মুখিন হতে হয়। আবার বাংলা বানানের হ্রস্ব-‘ই’ এবং দীর্ঘ্য ‘ই’ এর ব্যবহার তো আছেই। একবার পরিচয়পত্র একভাবে হয়ে গেলে এটি পরিবর্তন করতে পুনরায় চার / পাঁচটি ডুকুমেন্ট জমা দিতে হয়। শুধু পরিচয় পত্র অফিস নয় এমন কি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কিছু অসাধু স্টাফ এই ভূলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করে থাকেন অনৈতিক লাভের আশায়। যেহেতু আমাদের বাংলা ও ইংরেজী লেখাগত কিছু সমস্যা রয়েছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখাতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ কারও নাম বাংলায় মোঃ ইংরেজীতে গড়যধসসধফ অথবা গঁযধসসধফ হয়ে গিয়েছে। কর্তৃপক্ষ এটাকে মেনে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে শুধু ইংরেজী বানানের উপর গুরুত্বরোপ করা যেতে পারে। যদি কারও নামের ইংরেজী বানান বিভিন্ন সনদে বিভিন্ন রকম থেকে থাকে, তবে অবশ্যই সেটা সংশোধন করতে হবে। 
ক্লাইয়েন্ট ওরিয়েন্টেশনের অভাবঃ ভোটার আইডি/পরিচয় পত্র ইস্যুকারী অফিসের স্টাফগনের আবেদনকারীগণের সাথে ব্যবহারের উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। আবেদনের তারিখ হতে পরিচয়পত্র ইস্যু পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট পিরিয়ড ধার্য্য করা যেতে পারে। আবেদন গ্রহণের তারিখ হতে সর্বোচ্চ ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্ড ইস্যু করতে হবে। এক্ষেত্রে ৭ দিনের ভিতর কার্ড ইস্যূতে ব্যার্থ হলে কারণ সহ লিখিত আকারে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জরুরী ভিত্তিতে জানাতে হবে। এই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন উপজেলা/ওয়ার্ড কর্মকর্তাগণের দক্ষতা ও যোগ্যতা যাচাই কল্পে এই বিষয়কে একটি মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। উপজেলা/ওয়ার্ড নির্বাচনী অফিসার পদোন্নতি  ও বাৎসরিক গোপনীয় প্রতিবেদনে বিষয়টিতে উল্লেখ করা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ ঃ যে উপজেলা বা ওয়ার্ডে সবচেয়ে কম সংখ্যার পরিচয়পত্র প্রদান বাকি থাকবে তাকে দক্ষ হিসেবে বিচেনা করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে তিনি হয়তো তড়িৎ পদোন্নতি পেতে পারেন।
উপজেলা / ওয়ার্ড  নির্বাচনী অফিসের পরিচয় পত্র শাখাকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করণঃ  প্রতিটি উপজেলা ও ওয়ার্ডের পরিচয়পত্র সংক্রান্ত  অফিসগুলোকে ফিংগার প্রিন্ট, প্রিন্টিং মেশিন ও অন্যান্য কার্যাদি সর্ম্পন করার জন্য সকল 
যন্ত্রপাতি ও লোকবল দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে  যাতে কোন আবেদনকারী সশরীরে আগারগাঁও এন,আই,ডি সদর দপ্তরে আসতে না হয়। আবেদন কারীগণ উপজেলা / ওয়ার্ড নির্বাচনী অফিসে এসে সকল ডকুমেন্ট দিয়ে যাবেন এবং ৭ কর্ম  দিবস পরে অথবা ঐ দিনই কয়েক ঘন্টার পরে এসে পরিচয়পত্রটি সংগ্রহ করে সাথে নিয়ে যাবেন। এটাই হবে নির্বচন/ আই,ডি, অফিসগুলোর দক্ষতার মাপকাঠি।
মতামত প্রদান করার সিস্টেম ঃ শিক্ষিত আবেদনকারিগণ পরিচয় পত্র হাতে পাওয়ার অব্যবহিত পর একটি অনলাইন ফরম পূরণ করতে পারেন যা হবে খুবই সংক্ষিপ্ত। সেখানে তিনি তার ভাল ও মন্দ অভিজ্ঞতার মতামত দিতে পারেন। তবে এ বিষয়টি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে তাই শুধু শিক্ষিত আবেদনকারীর (এসএসসি পাশ এবং উর্দ্ধে) জন্য এ বিষয়টি বাধ্যতামূরক করা যেতে পারে। 
উপরোল্লেখিত কার্যক্রমগুলো গ্রহণ করা হলে পরিচয় পত্র প্রাপ্তির ব্যাপারে মানুষের ভোগান্তি অনেকখানি লাঘব হবে। যদিও সবকিছু নির্ভর করে এই অফিসগুলোতে কর্মরত স্টাফগনের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কিন্তু সিস্টেম / পদ্ধতিগুলো এমনভাবে করা যেতে পারে যে একজন স্টাফ যেন নেতিবাচক ভাবভঙ্গি থাকলেও খুব একটা অসুবিধার সৃষ্টি করতে না পারেন। মহাতœা গান্ধী বলেছেন, পদ্ধতীগুলো এমন নিখুঁত হবে যে, লোকেরা ইচ্ছা করলেও যেন অসৎ না হতে পারে। 

লেখকঃ
মেজর (অবঃ) আমিন পাটোয়ারী
প্রাক্তন গবেষনা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পিছ বিল্ডিং সেন্টার  
অবসরপ্রাপ্ত জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা, 
ইমেইলঃ ধসরহঢ়ধঃধিৎু@মসধরষ.পড়স

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

আর্কাইভ