বুধবার , ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ |

আজব গুজব এবং অর্থের অনর্থ

  সোমবার , ২৯ July ২০১৯

সঞ্জয় দে রিপন

ঢাকা শহরে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বিষয়টি নগড়বাসীর কাছে বাস্তব সত্য কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা বলছেন এটা গুজব। এই গুজবের কারখানা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়। গুজব হচ্ছে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের টাকা সুরক্ষিত আছে। আজব হচ্ছে দরপতনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে শেয়ারবাজারে। আরও আজব হচ্ছে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিরা জামিন পেয়ে যাওয়া। গুজব হচ্ছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়। বাংলাদেশে গুমের সংষ্কৃতি গড়ে উঠেছে এটাও গুজব। আর আজব হচ্ছে নুরুল ইসলাম নুরু এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি। বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহীদুল ইসলাম রাষ্ট্রদ্রোহী! সাংবাদিক সাগড়-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য চলছে! কোনটা গুজব আর কোনটা বাস্তব বাংলাদেশের মানুষ এখন এসব টের পায়না; পেলেও বলতে পারেনা। বললেও সমাধান হয়না। গুজব এবং আজব আর সমাধানের ক্ষমতা বা বিচারিক ক্ষমতা একমাত্র ক্ষমতাসীনদেরই রয়েছে। সুতরাং গুজব, আজব আর ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার অভিযোগ সবকিছুই কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে চিন্তার খোরাক তৈরি করে দিয়েছে।

গুজব কখনই সত্যকে আশ্রয় করে বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনা; মিথ্যার দাবানল দিয়ে যে কোনো প্রচারণাকে গুজবে পরিণত করতে হয়। কিন্তু ঢাকা নগড়ির হাসপাতালগুলোতে শত শত ডেঙ্গুরোগীর চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়টি কোনো ভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।  সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হয়েছে; শুধু বাংলাদেশে নয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবকয়টি দেশেই বন্যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে মশার প্রকোপ বেড়েছে এটা কোনোভাবেই আজব ঘটনা নয়। বরং আজব বিষয় হচ্ছে ডেঙ্গুকে অস্বীকার করা। একবছর আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছিল যে এই বছরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশে ডেঙ্গু রোগ মহামারি আকার ধারণ করবে। এমন একটি তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্র সংস্থা এক বছর পূর্বে দেওয়ার পরেও সরকারের পক্ষ থেকে জনসচেতনা তৈরি এবং প্রতিরোধের কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, এই বিষয়টিই আজব। এবং গুজব হচ্ছে বাংলাদেশে গত এক দশকে কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতিত হয়নি। আজব আর গুজব নিয়ে বাস্তবতার সামনে দাড়িয়ে যদি বিবেচনা করতে হয় তবে একটি বিষয় পরিস্কারভাবে নগড়বাসী বুঝতে পারছে যে গুজব কোন ষড়যন্ত্রের অংশ নয় যারা গুজব শব্দটি ব্যবহার করছেন তারাই নাগড়িকদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। ঢাকা শহরের দুই সিটির মেয়রের মধ্যে এক সিটিতে এখন পর্যন্ত নির্বাচনই হয়নি। অর্থাৎ কমিশনার পদে নির্বাচিত হয়ে এখন মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন বিষয়টি অবশ্যই ভুলে গেলে চলবেনা।


এক বছর আগে জানার পরেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ করার কোনো ধরনের প্রক্রিয়অ শুরু না করা অবশ্যই অপরাধ; দায়িত্বের প্রতি অবহেলা এবং রাষ্ট্রের মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুকির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে যা সত্যিই গুরুতর অপরাধ। এখন সাধারণ মানুষ মনে করছেন মেয়র হচ্ছেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মেয়র আর ডেঙ্গু দ্বারা যেহেতু সকল মতের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে সুতরাং সেটা দেখার দায়িত্ব মেয়র সাহেবদের নেই। মেয়র সাহেবরা শুধুই রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশ অনুযায়ি কাজ করবেন; জনগণের কথা বিবেচনা করার সময় এবং  রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হয়তোবা নেই। এটাই গুজব। আবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন যে “দূর্যোগ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এবং মানবিক সহায়তাসহ যে কোনও প্রতিকূল পরিবেশে দেশের জনগণের নিরাপত্তায় সরকার অঙ্গিকারবদ্ধ’’। ডেঙ্গু রোগীর পাশে দাড়িয়েছে সরকার। তাহলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে বিষয়টি সত্য প্রমাণি করেছে সরকার নিজেই। কিন্তু গুজব হচ্ছে ডেঙ্গু মহামারি আকার নেয়নি। বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এ্যাড রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন “বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যার্থ এবং জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে পদদলিত করে স্বেচ্ছাচারিতার পথ বেছে নিয়েছেন। দেশের মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতাটুকুও এখন আর নেই। গুম, খুন আর অমানবিক সংস্কৃতি চর্চার অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে এই দেশ”

সরকার পক্ষ বলছে উন্নয়নের হাইওয়তে বাংলাদেশ উঠেগেছে এবং সেই গাড়িতে আমরা সবাই রয়েছি কিন্তু ঢাকা শহরে ফিটনেছ বিহীন গাড়ী হরহামেশাই মানুষের উপর দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে এটাও যদি গুজব হয় তবে সত্যি কোনটা। সত্যি হচ্ছে এখনও মন্দিরে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙ্গচুর হয়; মন্দিরের জমি দখল হয়। সত্যি হচ্ছে হবিগঞ্জের রবিদাস সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বেদখল হয়, সত্যি হচ্ছে সিলেটের স্কণ মন্দিরের জমি আওয়ামি প্রভাবশালী নেতার দখলে এই চিত্র সারা বাংলাদেশের। গোপাল গঞ্জ টুঙ্গি পাড়ায় হিন্দু বাড়ি উচ্ছেদ, কোটালী পাড়ায় মনসা প্রতিমা ভাঙ্গচুর এসব সত্যি। রামুর বৌদ্ধ বিহার নিশ্চয়ই আজব ঘটনা নয়; রাতের আঁধারে নাসির নগরে হিন্দু পল্লীতে হামলা, লুটপাট নিশ্চয়ই কোনো আজব ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ঠিকই জানে কোনটা সত্য আর কেনটা গুজব বা আজব।

যাক ডেঙ্গু এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে; এডিস মশার কামড়ে সর্বষাধারণ আক্রান্ত হচ্ছে। সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই; দেশের সবগুলো সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এটাই এখন সত্য।  সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য উদ্দোগ গ্রহণ করতে হবে।
 
রাষ্ট্রকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং দেশের সকল ছাত্র সংগঠনকে বন্যা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে।কারণ, মনে রাখা দরকার, প্রতিদিন এই রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে। এছাড়াও ঢাকা শহরে সিটি কর্পোরেশনের কতকগুলো হাসপাতাল আছে সেগুলো ঠিকমতো চালু নেই। এগুলো কীভাবে জরুরি ভিত্তিতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসকের সঙ্কট রয়েছে।  ডেঙ্গু  চিকিৎসা সেবা দেবার মতো  পর্যাপ্ত সেবিকা আমাদের নেই। যেহেতু ডেঙ্গু এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে সে কারণে সারাদেশের ডাক্তারদের একটি সমন্বয় দরকার। কোথাও কোন ক্রিটিক্যাল রোগী থাকলে তারা যেন পরামর্শ দিতে পারেন।

এই কাজের সহযোগিতার জন্য দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপকে এ মুহূর্তে এগিয়ে আসতে হবে। বন্যা বা মহামারীতে তারা খাদ্য, পোশাক এমনি নানা সামগ্রী ত্রাণ হিসেবে দেন। ছাত্র ও যুব কর্মীদের হাতে বিতরণের জন্য তুলে দিতে হবে ইনসেক্ট কিলার সামগ্রী; যার মাধ্যমে তারা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এডিস মশা মারার ব্যবস্থা করতে পারে। একই সাথে ছাত্র-যুবকদের সকল পাড়ায়, মহল্লায় ও এলাকায় গড়ে তুলতে হবে রক্তদাতা গ্রুপ। তাদের সকলের রক্তের গ্রুপ শনাক্ত করে তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীকে রক্ত দেয়ার জন্য। কারণ, একজন ডেঙ্গু রোগীকে বাঁচাতে অনেক রক্তের প্রয়োজন। একজন মুমূর্ষ ডেঙ্গু রোগীকে বাঁচাতে ১৬ থেকে ২৫ ব্যাগ পর্যন্ত রক্তের প্রয়োজন পরে; সুতরাং রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পৌছানো এই সময়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উদ্দোগ।

রাষ্ট্র যখন ব্যার্থ হয়ে পড়ে তখনই সমাজে ছোট ছোট অসঙ্গতি, সঙ্কটগুলো বিরাট আকার ধারণ করতে থাকে। ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মধ্যযুগের অন্যতম সিদ্ধান্তগুলো নেবার ক্ষমতা পোপদের হাতে চলে যায়। ধর্ম আর ধর্ম এবং ধর্ম এই চিন্তার বাইরে অন্য যেকোন চিন্তা করার সুযোগ রুদ্ধ হয়ে যায়।

সাহিত্য শিল্প এবং বিজ্ঞান চর্চঅর ধারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিকাশের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোকে আজব আর গুজব বলে চালিয়ে দেবার সংষ্কৃতি গড়ে ওঠে। ঠিক সেইসময়েই সাহিত্যিক এবং দার্শনিক পেত্রার্ক বলেছিলেন যে সময়ে নিরপেক্ষ এবং মুক্ত চিন্তা প্রকাশে বাধা দেয়া হয় সেই সময়কাল অবশ্যই অন্ধকারের সামিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভাগবাটোয়ারা করতে গিয়ে ক্ষমতাবানরা জনগণদের অন্ধকার সময়ের মধ্যে নিমজ্জিত করছেন; একই সাথে রাষ্ট্র এখন হয়ে ওঠেছে গুজব আর আজব বিষয়ের মাতৃভূমিতে। এসবকিছু অনতিবিলম্বে বন্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে; বাংলাদেশের মানুষকে নিরপেক্ষ এবং মুক্ত চিন্তা প্রকাশ করার স্বাধীনতাটুকু ফিরিয়ে দিতে হবে। তবেই সকল ভালো কাজ সকলের জন্য অর্থবহ হয়ে উঠবে এবং অনর্থ হবে না।

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ