বুধবার , ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ |

নিশম সরকার

রেফুজি হিসেবে বড় হওয়াতে একটা কষ্ট আছে। নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট লাগে, আর সবার থেকে নিজেকে একটু গুটিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। যে ছেলেটার কথা বলবো, তার বেঁড়ে ওঠার বয়েসটা রেফুজি হয়ে। জন্ম এমন সময়ে যখন তার জন্মভূমি স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য, আত্মসম্মান রক্ষার জন্য লড়ছে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সাথে। সে অসম যুদ্ধ চলাকালীন এক বর্ষায় এক পুত্রশিশু জন্ম নেয়, এক অবরুদ্ধ পরিবেশে। গ্রেনেড আর মেশিনগানের ঝনঝনানির মধ্যে জন্মের ঠিক ১৪২তম দিনে শিশুটি নিঃশ্বাস নেয় একটি স্বাধীন দেশে, বাংলাদেশে। শিশুটির নাম জয়, তার নানার দেয়া নাম।’৭৫ এর ১৫ই আগস্টে জয় তার পরিবার ও তার খালা, শেখ রেহানার সাথে ব্রাসেলস থেকে প্যারিস যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, বয়স তখন তার মাত্র ৪ বছর। এ সময় তার বুঝতে পারবার কথা না, তাদের জীবনটা কয়েক মিনিটে কিভাবে বদলে গেলো। শিশুটি তার উদ্বিগ্ন বাবাকে দেখলো, মাকে কাঁদতে দেখলো, কিন্তু বুঝলো না, কী এক অন্ধকারের পথে এক প্রকার বাধ্য হয়ে তারা হাঁটতে নেমে গিয়েছে, যেখান থেকে পেছাবার কোন রাস্তা নেই। বেলজিয়ামে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত যে সানাউল হক কিছুক্ষণ আগেও তাদেরকে আদর আপ্যায়ন করছিলেন, সেই সানাউল হক, কয়েক মিনিট পরেই তাদেরকে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করে বের করে দিলেন ঘর হতে। খুব ছোট বয়স থেকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা টের পাওয়া শুরু করে দিলো ছেলেটি। নানা-নানী, মামারা কেউ নেই, কাছাকাছি বয়েসী রাসেল মামাও বেঁচে নেই, এতোটা নিষ্ঠুরতা এতো কম বয়েসী একটি শিশুর প্রাপ্য ছিলো না।

২৪ আগস্ট জয়, তার মা শেখ হাসিনা, বাবা ওয়াজেদ মিয়া ও খালা শেখ রেহানার সাথে খুব গোপনে ফ্র্যাংকফুর্ট বিমান বন্দর থেকে ভারতগামী একটা বিমানে পাড়ি জমান। তাদের রেফুজি জীবনের সংগ্রামের শুরু সেইদিন থেকে।  জয়কে নৈনিতাল এর সেইন্ট জোসেফ স্কুল এ ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তামিল নাড়ুর কোদাইকানাল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সে পড়াশুনা করে।

জয়ের বাবা ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক পরমানু বিজ্ঞানী, ম্যাকগ্র-হিল থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত eB Fundamentals of Electromagnetics এর লেখক, ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। স্বভাবতই, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি তার ছিলো তুমুল আকর্ষণ। স্কুল-কলেজের পাট চুকিয়ে সে ভর্তি হলো ব্যাংগালোর ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সে। ১৯৯০ সালে ব্যাংগালোরে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বার সময় সে লক্ষ্য করলো, হঠাৎ করেই নীরব, সবুজ ব্যাংগালোর কেমন যেনো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে। কম্পিউটার স্টাডিজ সেখানে জনপ্রিয় হয়ে উঠবার সাথে সাথে সেখানে আস্তে আস্তে গড়ে উঠলো আইটি হাব, ধীরে ধীরে ব্যাংগালোরে গড়ে উঠলো চমৎকার আন্তর্জাতিক আইটি ইন্ডাস্ট্রি। সে সময়, ব্যাচেলর ডিগ্রী নেয়া তরুণ ছেলেটি চিন্তা করতে লাগলো, এমন কিছু কি আমার দেশে করা যায়? আমার বাংলাদেশে? নিজেকে আরও যোগ্য করে তুলতে সেকেন্ড ব্যাচেলর ইন কম্পিউটার সায়েন্স ডিগ্রী নিতে পাড়ি জমালো আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে। আরও শানিত হতে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স করলেন কেনেডি স্কুল অফ গভার্নমেন্ট অ্যাট হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে।

১৯৯৮ সালের দিকে জয় একটি স্টার্ট-আপ কোম্পানি খুলে বসেন, নাম গারড়হ ওহপ. ইনফরমেশন উইক নামের একটি সাইট গারড়হ কে নিয়ে একটা প্রতিবেদন করে ২০০০ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, যাতে বলা হচ্ছিলো ওয়্যারলেস ডিভাইসে ডাটা সার্চ এর নতুন কৌশলের কথা। গুগলের বিগ টেন্ট অ্যাকটিভেট সামিট, নয়াদিল্লি, ২০১৩ তে তিনি একজন কি স্পিকার হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন এই স্টার্ট-আপ নিয়ে কথা বলবার জন্য। ২০০৭ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ২৫০ জন ইয়াং লিডার নমিনিদের একজন ছিলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। জীবনের একটি বড় সময় ভাগ্যের পরিচক্রে দেশের বাইরে থাকলেও, দেশকে, দেশের মানুষকে তিনি কখনোই ভোলেননি। ২০১০-এ রংপুর আওয়ামী লীগে একজন সদস্য হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু। বলা যায়, সে সময় থেকেই শুরু হয়েছে দিন বদলের হাওয়া। ২০০৭-০৮ সালেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বলতে শহরের মানুষজন যেখানে পরিচিত ছিলো ৪-৬কইচঝ স্পীড এর সাথে, আজকে সেখানে ঘরে ঘরে, শহরের বাইরেও দ্রুতগতিসম্পন্ন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, হাতে হাতে ৪জি ইন্টারনেট যুক্ত স্মার্টফোন। এই মুহুর্তে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৪ কোটিরও বেশী। তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ বন্যা কিভাবে সারা দেশকে ভাসিয়ে দিয়ে গেলো? ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে প্রথমবারের মতো একটি প্রবাদ যুক্ত করে, মাত্র দুইটি শব্দের, তা ছিলোঃ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। বিরুদ্ধ শিবিরে এ নিয়ে সে কী উন্মত্ত হাসা-হাসি। অথচ আজ? সেই হাসা-হাসি করা মানুষগুলোসহ, সারা দেশের মানুষ এই সুবিধা গ্রহণ করছে, উন্নয়ন করছে নিজের, উন্নয়ন করছে দেশের। আজকে বাংলাদেশের জাতীয় তথ্যবাতায়নে প্রবেশ করলে আপনি অবাক হবেন, কী নেই সেখানে! কৃষিতে সার ব্যবহার, স্বাস্থ্যকোষ থেকে শুরু করে, পাসপোর্ট এর ফরম, সরকারি চাকুরির আবেদন, বিভিন্ন সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল, টিকিট বুকিং, ইউটিলিটি বিলসহ কী নেই! অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম ফিল-আপ থেকে শুরু করে, মোবাইল ব্যাংকিং কী সুবিধা পাচ্ছি না! ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ই-সেবাকেন্দ্র, ১৪৭টি উপজেলা ও গ্রামীণ ডাকঘরের ই-সেন্টার, ২৫৪টি এগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন সেন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য-পুষ্টি, কৃষি, জন্ম-নিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতাসহ প্রায় সকল সেবা সহজে ও সুলভে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তাদেরকে আইটি সেক্টরে আরও অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বাজেটে কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন টেকনলজিক্যাল পণ্যের ক্রয়মুল্য কমিয়ে একটি তথ্যপ্রযুক্তি বান্ধব বাজেট তৈরী করা হয়েছে, ১৩ হাজার ১১১কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আইটি সেক্টরের উন্নয়নে। বিনামূল্যে আইটি প্রশিক্ষণ এর বিভিন্ন প্রকল্প চলছে, দেয়া হচ্ছে ভাতা।

২ লক্ষ ৬০ হাজার তরুণ-তরুণীদেরকে বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ২০০৮-এ ৩৭ বছর বয়সী আইটি এক্সপার্ট সজীব ওয়াজেদ জয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ আজকে প্রভাবিত করেছে ভারত সরকার প্রধানকে, যে কারণে ২০১৫ সালের ১লা জুলাই ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র ক্যাম্পেইনিং এর ঘোষণা দিয়েছেন। বিনয়ী, স্বল্পভাষী ও বুদ্ধিদীপ্ত এই মানুষটি ভালোবাসেন গিটার বাজাতে, ফটোগ্রাফি করতে। ক্ষমতার কাছে থেকেও কখনও ক্ষমতাকে আঁঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করেননি। আওয়ামী লীগ এর ২০তম কাউন্সিলে তাকে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের পদের জন্য বারবার অনুরোধ করা হলে তিনি অস্বীকৃতি জানান, কারণ হিসেবে বলেন যে, বছরের একটা বড় সময় তিনি দেশে থাকেন না, এই পদের প্রতি সুবিচার তো তিনি করতে পারবেন না। একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে আমাদেরকে বিভোর করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে দেশে সবুজ পাতা নাড়া দিয়ে যায় ঠাণ্ডা হাওয়ায়, সে স্বাধীন দেশের বাতাসে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে এক মহান নেতার নামে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতাকে কেড়ে এনেছিলো আমাদের পূর্বপুরষেরা। স্বাধীনতা এনে দিলেন বঙ্গবন্ধু, সে জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে গেলেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বাবা-মা সবাইকে হারিয়ে একদিনের সেই এতিম, রেফুজি কন্যা আজকে বিশ্বনেত্রী হয়ে বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই একই রক্ত, বঙ্গবন্ধু দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, আমাদের সামনে খুলে দিয়েছেন সম্ভাবনার এক নতুন দ্বার, তথ্য প্রযুক্তির এক নতুন জগত। রক্ত কথা বলে। যে রক্ত দেশের জন্য অকুণ্ঠে খরচ হয়ে যেতে পারে, সে রক্তে দেশের সাথে বেইমানী থাকে না। বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা থেকে সজীব ওয়াজেদ জয়, আমাদেরকে তাই বলে। শুভ জন্মদিন আধুনিক বাংলাদেশের কাণ্ডারি, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, সজীব ওয়াজেদ জয়। শুভ হোক পথচলা।

লেখক: পেশায় চিকিৎসক। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা চিকিৎসা বিজ্ঞান জেলা শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।


 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ