সোমবার , ১৯ আগষ্ট ২০১৯ |

আমীন আল রশীদ

জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের যে মিয়ানমার ফেরত নেবে না, সে বিষয়ে সম্ভবত এখন আর কারোরই সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও আন্তর্জাতিক চাপ এড়ানোর কৌশল হিসেবে তারা নিয়মিত বিরতিতে নানারকম পদেক্ষেপ নেয়। যার অংশ হিসেবে গত ২৭ জুলাই কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছে দেশটির একটি প্রতিনিধি দল। তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে এবং তাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে যৌথ আলোচনায় রাজি বলে জানায়।

এরকম বাস্তবতায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া কিংবা তাদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ দেওয়া। ২০১৭ সালে বড় পরিসরে রোহিঙ্গা নিধন শুরুর পর বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি আলোচনায় এলেও তা হালে পানি পায়নি। মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ ছাড়া তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে নমনীয় হবে না এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। প্রশ্ন হলো, তারা কোনো চাপকে আদৌ পাত্তা দেয় কি না বা যতক্ষণ চীন তাদের পক্ষে থাকবে ততদিন জাতিসংঘ এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের উপর চাপ দিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে কি না? তাছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী এমন বাণিজ্যিক বা কূটনীতিক স্বার্থ আছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করবে? রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় পরিচয়টিও এখানে একটি বড় অন্তরায়। গণমাধ্যমের খবর বলছে, ২৭ জুলাই কক্সবাজারের কুতুপালং এক্সটেনশন-৪ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর সেখানে রোহিঙ্গাদের সাথে বৈঠক করে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল। বৈঠকে রোহিঙ্গা নেতারা বরাবরের মতো তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরলে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে বলেন, মিয়ানমার সরকার এসব বিবেচনা করছে। তারা (মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল) রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এসেছেন বলেও মন্তব্য করেন। বলেন, রাখাইনে তাদের জন্য ঘরবাড়ি, স্কুলসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সঙ্গত কারণেই তাদের এই কথায় আশ্বস্ত হতে পারেননি রোহিঙ্গা নেতারা।

পরদিন বিকালে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন এবং রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের প্রধান জানান, শর্তসাপেক্ষে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমার রাজি। তবে সেটি ১৯৮২ সালের মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী। এছাড়া যারা দাদা, মা ও সন্তান এই তিনের অবস্থানের প্রমাণ দিতে পারবেন, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। একইভাবে ন্যাশনাল ভ্যারিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) অনুযায়ী যারা কাগজপত্র দেখাতে পারবেন, তাদেরও নাগরিকত্ব দেয়া হবে। মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গা সংকট নতুন কিছু নয়। দশকের পর দশকে ধরে ঝুলে থাকা এবং মিয়ানমারের তরফে এটি একটি মীমাংসা করতে না চাওয়া আঞ্চলিক বিষফোঁড়া। সুতরাং সে দেশের একটি প্রতিনিধি দল এসে কক্সবাজার ঘুরে গেলো আর কাল থেকেই দলে দলে নাফ নদী পার হয়ে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফেরত যাবে, এমন দৃশ্য বোধ হয় কোনো উন্মাদনও কল্পনা করেন না। তাহলে এই প্রতিনিধি দল কেন এলো? তারা এসেছে কারণ আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। ফলে সেখানে আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা এড়াতে বা ওই ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিজেদের আন্তরিকতা প্রমাণে মিয়ানমার এই প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। মিয়ানমার যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি নানারকম শর্তের বেড়াজালে ঘুরাবে এবং এটা নিয়ে একধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলবে, সেটি জাতিসংঘও জানে। কথা হচ্ছে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল যে বলছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায়, তো রোহিঙ্গারা ফেরত গেলে কোথায় থাকবে? তাদের বাড়িঘর তো জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের ভিটেমাটিতে মিয়ানমার সরকার উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করেছে। সুতরাং অন্য এলাকায় তৈরি ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গারা কেন থাকবে? বাংলাদেশেও তো তারা ক্যাম্পেই আছে। একটি নিরাপদ কাম্প ছেড়ে তারা কেন তাদের আত্মীয়-স্বজনের হত্যাকারী ও ধর্ষকদের বন্দুকের নলের মুখে আরেকটি অনিরাপদ ক্যাম্পে যেতে রাজি হবে?

মিয়ানমার কি তাদের নাগরিকত্ব দেবে? বিবিধ শর্ত পূর্ণ করে আখেরে কতজন নাগরিকত্ব পাবেন। যারা পাবেন তারা কি সেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা পাবেন? সেখানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর উগ্রবাদী লোকদের হামলার হাত থেকে মিয়ানমার সরকার কি কাদের সুরক্ষা দিতে পারবে? ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে জাতিগত নিধনের জন্য দায়ী সামরিক ও বেসামরিক লোকদের কি বিচার হবে? যারা স্বামী সন্তান স্ত্রী পরিজন হারিয়েছেন, ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, মিয়ানমার সরকার তাদের সেই ক্ষতিপূরণ দেবে? এই সব প্রশ্নের জবাবই হচ্ছে ‘না’। সুতরাং মিয়ানমার সরকারের এই প্রতিনিধি দলের সফর এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার আশ্বাস যে একধরনের পরিহাস, তাতে কারো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
তাহলে সমাধান কী? অনেকেই বলেছেন যে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাখাইন অঞ্চলে বা মিয়ানমার অংশে নাফ নদীর তীরবর্তী এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য একটি সেফ জোন বা নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তোলা একটি সমাধান হতে পারে। সেটিও একধরনের শরণার্থী শিবির যেখানে জীবনধারনের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা, পড়ালেখার সুযোগ ও কাজের সুযোগ থাকবে। তবে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদী সমাধান তাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে মিয়ানমারের নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দেয়া। মিয়ানমার সরকার যে সেটি করবে না বা করার উদ্যোগ নিয়েও সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা তার বিরোধিতা করবে, তাতে সন্দেহ নেই। সুতরাং তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন। সেটি হতে পারে রাখাইন অঞ্চলেই। মাহাথির মোহাম্মদও সেই প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমার সেটি কি মানবে? যে অঞ্চলে তারা এরইমধ্যে চীনের সহায়তায় নানারকম উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে সেই জায়গা তারা কেন ছাড়বে? বস্তুত মিয়ানমার তাদের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করেছে। সুতরাং রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনে মিয়ানমার যে রাজি হবে না, তা স্পষ্ট।

আরেকটি বিকল্পের কথা অনেকেই বলেছেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের ভাগ করে নিয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর অসংখ্য দেশ আয়তনের তুলনায় জনগোষ্ঠী কম। সেসব দেশ তাদের শরণার্থী হিসেবে নিয়ে কৃষিসহ নানারকম কাজে লাগাতে পারে। তাতে একদিকে রোহিঙ্গাদের নিজেদের জীবন যেমন নিরাপদ হবে তেমনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও উপকৃত হবে।
বলা হচ্ছে, মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ ছাড়া তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে নমনীয় হবে না এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। প্রশ্ন হলো, তারা কোনো চাপকে আদৌ পাত্তা দেয় কি না বা যতক্ষণ চীন তাদের পক্ষে থাকবে ততদিন জাতিসংঘ এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের উপর চাপ দিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারবে কি না? তাছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী এমন বাণিজ্যিক বা কূটনীতিক স্বার্থ আছে যে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করবে? রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় পরিচয়টিও এখানে একটি বড় অন্তরায়। সুতরাং এখন মিয়ানমার তাদের দূত পাঠিয়ে বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেও বস্তুত রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে তারা যে মোটেই আন্তরিক নয় বা নেবে না, তা মিয়ানমার নিজে যেমন জানে, তেমনি বাংলাদেশ জানে এবং জাতিসংঘও জানে। ফলে এই ১১ লাখ মানুষের বোঝা হয়তো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকেই বইতে হবে। মিয়ানমার খুব বড় কোনো চাপে পড়লে বড়জোর হাজার পঞ্চাশেক লোক হয়তো ফেরত নিতে পারে। কিন্তু সেটিও কতদিন ধরে বা কোন প্রক্রিয়ায়, তার চেয়েও বড় কথা, নাগরিকত্ব এবং বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা না পেলে রোহিঙ্গারা আদৌ সেখানে যেতে রাজি হবে কি না, এবং তারা যেতে না চাইলে জোর করে পাঠানো যাবে কি না ?  তবে এই অনিশ্চয়তার ভেতরেও মাহাথির মোহাম্মদের মতো লোক যে প্রস্তাব দিয়েছেন, বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোও রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র বা সেফ জোন গঠনের দাবি তুলতে শুরু করলে হয়তো এই সংকট সমাধানের একটা নতুন পথ বেরিয়ে আসতে পারে।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।


 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ