বুধবার , ১৬ অক্টোবর ২০১৯ |

আর্ল আর মিলার

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার অংশগ্রহণ করা প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ‘২০১৮-২০২২ মানবপাচার রোধে জাতীয় পরিকল্পনা কর্মসূচির উদ্বোধন’। বাংলাদেশ সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মানবপাচার লাখো মানুষকে মর্যাদা ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে। লঙ্ঘন করে তাদের অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার। মানবপাচার একটি শোষণমূলক অপরাধ। পাচারকারীরা নারী, পুরুষ ও শিশুদের বাণিজ্যিক যৌনতা বা শ্রম কিংবা উভয়টিই করতে বাধ্য করে। পাচারের শিকার ব্যক্তিরা যাতে কারও সহায়তা চাইতে না পারে, সেজন্য পাচারকারীরা জবরদস্তি বা প্রতারণার আশ্রয় নেয়।

গত ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় বিশ্ব মানবপাচারবিরোধী দিবস পালন করেছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল আর পম্পেও ২০১৯ সালের মানবপাচার বিষয়ক প্রতিবেদন ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস- টিআইপি’ প্রকাশ করেন। এই বার্ষিক প্রকাশনায় মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ১৮৭টি দেশের সরকারের প্রচেষ্টা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিশ্বের সরকারগুলোর প্রতি সব ধরনের মানবপাচারের বিষয়ে সম্ভাব্য সবচেয়ে ব্যাপক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ বিষয়ক অ্যামবাসেডর অ্যাট লার্জ জন রিচমন্ড ৪-৬ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করবেন। তিনি বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা এবং নাগরিকসমাজের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়ে একত্রে কাজ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের কথা তুলে ধরবেন।

এই অংশীদারিত্বের চেতনায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস উইনরক ইন্টারন্যাশনালের বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মানবপাচার রোধে গৃহীত কর্মসূচি বিসি/ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) প্রোগ্রাম সমর্থন করে। এই প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশের ২০টি পাচার প্রবণতা সংশ্লিষ্ট শহরে জাতিসংঘের মানবপাচার প্রতিরোধ বিষয়ক নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা আইন সংবলিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে— প্রতিরোধ,সুরক্ষা, পরিচালনা ও অংশীদারিত্ব।

মানবপাচার কিন্তু নিছক এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষ পাচার করার সমস্যা নয়। দেশগুলোকে তাদের সীমানার অভ্যন্তরেও নজর দিতে হবে। সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে মনোযোগ দেওয়াকেই পাচারবিরোধী কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সীমানা দিয়ে মানবপাচার হোক আর না-ই হোক, দেশের সীমান্তের মধ্যে মানবপাচার মোকাবিলার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ এগিয়ে নিতে হবে।

মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার বড় দায়িত্ব জাতীয় সরকারগুলোর।  তবে তারা একা তা করতে পারবে না। নিজ নিজ দেশকে আধুনিককালের দাসের কারবারিদের অপতৎপরতা থেকে রক্ষা করতে আমাদের সবাইকে আন্তর্জাতিক, জাতীয় এবং স্থানীয় স্তরে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বৃহত্তর সরকারি উদ্যোগের সমর্থন নিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক প্রচেষ্টা চালানো অপরিহার্য।

পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা দিতে কমিউনিটিগুলো নিজস্ব ব্যবস্থা নিতে পারে। তারা জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত সব স্তরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে— আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, মানবপাচার থেকে রক্ষা পাওয়া মানুষ ও তাদের সহায়তাকারী এবং কমিউনিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষের সঙ্গে। আর সমন্বয় নিশ্চিত করার অন্যতম সেরা উপায় হতে পারে একটি পাচারবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা।

পাচারের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে কারা, পাচারের শিকার এবং এর ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য বর্তমানে কোন কোন সেবা বিদ্যমান এবং কোন শূন্যতাগুলো পূরণ করতে হবে, ইত্যাদি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য কমিউনিটিগুলো মূল্যায়ন কার্যক্রমও পরিচালনা করতে পারে।

সবশেষে, স্থানীয়ভাবে যথাযথ উদ্যোগ নিশ্চিত করার জন্য মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা যোগাযোগের সম্ভাবনা রয়েছে, এমন বিভিন্ন পেশার মানুষকে (যেমন চিকিৎসক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক) মানবপাচারের সূচকগুলো সনাক্ত করা এবং এ বিষয়ে সহায়তা চাওয়া নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।

এই বিশ্বের কোথাও আর আধুনিককালের দাসত্বের স্থান নেই। যুক্তরাষ্ট্রে তো নয়ই, বাংলাদেশেও নয়। মানুষকে নিয়ে অসাধু ব্যবসা বন্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এই অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের সঙ্গে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাবে।

লেখক: বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত

 সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ