বুধবার , ১৬ অক্টোবর ২০১৯ |

রেজা সেলিম


গত বৃহস্পতিবার, আগস্টের ১ তারিখে মহামান্য হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সরকারের প্রতি একটি রুল জারি করে শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, সেই সঙ্গে শিশুবান্ধব ইন্টারনেট চালুর নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়েছেন। এ ছাড়া শিশুদের জন্য ক্ষতিকর, অশ্লীল, আপত্তিকর ওয়েবসাইট বন্ধ এবং বা ভুতুড়ে ও নিষ্ঠুর গেম বন্ধে নির্দেশনা কেন দেয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। আগামি চার সপ্তাহের মধ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সচিব, আইন মন্ত্রণালয় সচিব ও মোবাইল অপারেটর গ্রামীণ ফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেলসহ সংশ্লিষ্ট ১৫ জনকে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। জনস্বার্থে করা এক রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে শিশুদের জন্য ইন্টারনেট তদারকিতে কর্তৃপক্ষ গঠন করার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।

ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য এ রকম একটি নির্দেশনা দিতে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হলো, এটা খুব সুখকর বিষয় নয়। ২০ মে ২০০৬ সালে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সি-মি-উই চতুর্থ প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যখন আমাদের অবাধ ইন্টারনেট প্রাপ্তি সহজ হলো তখন দেশে কোন ইন্টারনেট বিতরণ নীতিমালা ছিল না। আমরা বহু বলে কয়েও তৎকালীন সরকারকে এটা বোঝাতে ব্যর্থ হই যে, আইডিবি থেকে এত টাকা ঋণ করে আমরা এই সংযোগ নিলাম কিন্তু কে, কীভাবে, কতটুকু ব্যবহার করবে আর কত টাকা খরচ করবে তার জন্যে একটি উপযুক্ত নীতিমালা থাকা দরকার। শেষমেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি কমিটি করে দিলে আমরা সবাই মিলে একটি খসড়া তৈরি করে দেই যা যাচাই-বাছাই করে একটি অর্ডিনেন্স আকারে ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলে এই নিয়ে আমরা দেনদরবার করি। ৮ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে শেখ হাসিনা যখন নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের’ রূপকল্প উপস্থাপন করলেন আমরা এই ভেবে আশান্বিত হলাম যে- আমাদের বহুল কাক্সিক্ষত নীতিমালাগুলো এখন আলোর মুখ দেখবে। কারণ দেশে যে তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা ২০০২ থেকে চালু ছিল তা ছিল একটি ইচ্ছে তালিকা। এ রকম নীতিমালা থেকে দেশের জন্য কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব ছিল না। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ সরকার একটি জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন করে। ২০১৩ সালের ১১ মার্চ সংশোধনীসহ নীতিমালাটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে তা কিছু অনুশাসনসহ মন্ত্রিসভা ফেরত পাঠায়। শেষে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কিছু পরিমার্জনসহ এই নীতিমালা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়। ২০০৯ সালের এই নীতিমালাটির লক্ষ্য ছিল ২০১৬ সালের মধ্যে স্বল্প, ২০১৮ সালের মধ্যে মধ্যম ও ২০২১ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। এতে ১০টি উদ্দেশ্য, ৫৪টি কৌশলগত বিষয়বস্তু ও ২৩৫টি করণীয় উল্লেখ রয়েছে যা ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। যদিও তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা দুই দফা তৈরি হয়েছে কিন্তু সেই ইন্টারনেট ব্রডব্যান্ড নীতিমালা আজও হালনাগাদ হয়নি। অথচ এই দুটির সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ ও পরিপূরক। ওই যে নীতিমালা যেটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশে জারি করেছিল, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে তা সংসদে গ্রহণ করে কিন্তু ২০১৫ সালে সেটি তামাদি হয়ে এখনও বিটিআরসির ওয়েবসাইটে শোভা পাচ্ছে।

যা হোক, ২০০৯ সালের তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় বর্ণিত কৌশলগত বিষয়বস্তু ১.৫-এ লিখিত রয়েছে ‘ক্ষতিকর ডিজিটাল বিষয়বস্তু থেকে শিশুদের রক্ষাসহ শিশু সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় সর্বসমক্ষে উপস্থাপন।’ এই কৌশলগত বিষয়বস্তুর করণীয় উল্লেখ আছে মোট ৩টি (করণীয় ১৭, ১৮, ১৯)। করণীয় ১৭ হলো— ‘প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে শিশুতোষ ডিজিটাল বিষয়বস্তু উন্নয়ন উৎসাহিতকরণ’ (দায়িত্ব- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো), করণীয় ১৮ হলো- ‘ওয়েবসাইট এবং টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক বিষয়াদি ফিল্টার করা সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন করা’ (দায়িত্ব- মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়) এবং করণীয় ১৯ হলো— ‘শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক ওয়েবসাইটসমূহে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা (দায়িত্ব- ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও বিটিআরসি)।

২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর আর একটি হালনাগাদ তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালার গেজেট প্রকাশিত হয় এবং ২০১৫ সালের নীতিমালাটি রহিত হয়। এই নীতিমালায়ও ৩টি মেয়াদ স্থির করা হয়, স্বল্পমেয়াদী ২০১২ সাল, মধ্যমেয়াদী ২০৩০ সাল ও দীর্ঘমেয়াদী ২০৪১ সাল। ৫টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই নীতিমালায় ১টি রূপকল্প, ৮টি উদ্দেশ্য ও ৫৫টি কৌশলগত বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০১৮ সালের এই নীতিমালায় কৌশলগত বিষয়বস্তু ২.৪-এ বলা হয়েছে ‘সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ সকল ডিজিটাল মাধ্যমে অনাকাক্সিক্ষত ও ক্ষতিকর বিষয়বস্তু থেকে নারী ও শিশুসহ সকলের সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ।’ এর করণীয় ২.৪.১ হলো- ‘সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনাকাক্সিক্ষত ও ক্ষতিকর কন্টেন্ট উপস্থাপনে প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ডেটা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ সেল প্রতিষ্ঠা এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ (দায়িত্ব দেয়া হয়েছে- ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে) করণীয় ২.৪.২ হলো— ‘অভিভাবক সচেতনতা কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ (দায়িত্ব দেয়া হয়েছে- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে) এবং করণীয় ২.৪.৩-এ বলা আছে— ‘শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক ওয়েবসাইটসমূহের প্রবেশ দেশের অভ্যন্তরে বন্ধকরণ’ (দায়িত্ব— ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিটিআরসি এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের)।

মহামান্য হাইকোর্ট যে রুল জারি করেছেন আমার বিশ্বাস সরকারের কাছে সেসবের যথাযথ জবাব আছে। কিন্তু আমাদের জানা দরকার— আদৌ প্রথম নীতিমালার করণীয়গুলো অর্জনের কোন অগ্রগতিপত্র ও সঙ্গে মূল্যায়নপত্র সরকার তৈরি করেছিল কিনা। যেহেতু ২০১৮ সালের নীতিমালা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ২০০৯-২০১৫ সালের নীতিমালাটি রহিত হয়েছে কিন্তু তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি না জেনে কি দ্বিতীয় নীতি বাস্তবায়ন করা যাবে? বিশেষ করে শিশুদের জন্য এখন যে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে ও চারদিকে জোর দাবি উঠেছে সে ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয় কি কি পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো অভিভাবকদের জানা জরুরী। মাননীয় হাইকোর্ট বা জানতে চেয়েছেন যে, এসব ক্ষতিকর কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণের জন্য তদারকি কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রসঙ্গে, প্রথম নীতিমালায় সে রকম কিছু উল্লেখ ছিল না কিন্তু দ্বিতীয় নীতিমালায় তা যুক্ত হয়েছে একটু ভিন্নভাবে (সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনাকাক্সিক্ষত ও ক্ষতিকর কন্টেন্ট উপস্থাপনে প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ডেটা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ সেল প্রতিষ্ঠা)। কিন্তু লক্ষণীয় যে, ২০১৮ সালের এই নীতিমালায় ‘সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনাকাক্সিক্ষত ও ক্ষতিকর কন্টেন্ট উপস্থাপনে প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ডেটা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ সেল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও শিশুদের জন্য ক্ষতিকর গেমস, ভুতুড়ে বা হরর সাইট, পর্নোসাইট ইত্যাদি এই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ সেলের আওতায় আসবে কি-না তা সুস্পষ্ট হওয়া দরকার।

অভিভাবকদের জন্য একটি ‘প্যারেন্টাল গাইড’ বা শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য করণীয় নিয়ে শিক্ষামূলক পারিবারিক নির্দেশনা দুনিয়ার সব দেশেই আছে। হুবহু সে রকম কিছু বাংলায় অনুবাদ করে আমাদের দেশে তার প্রয়োগ সঠিক হবে না। তাছাড়া আমাদের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে ইন্টারনেট বিতরণ ও প্রাপ্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। কার কী পরিমাণ কী কাজের জন্য ইন্টারনেট নিতে হবে সে রকম কোন নির্দেশনা আমাদের দেশে নেই। যে যে রকম খুশি ইন্টারনেট নিতে পারে। ফলে আপাত দৃষ্টিতে মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট সস্তা মনে করে সেটাই ব্যাপক প্রচার করে শিশু-কিশোরদের সর্বনাশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড প্রকল্পগুলো যেভাবে সাজানো হয়েছে তাতে সবাই ভাবছে এটা সরকারের জন্য; তা শহরে হোক আর গ্রামে হোক, সাধারণের জন্য মোবাইল ফোনের ইন্টারনেটই যথেষ্ট। ফলে অভিভাবকরা কোন নির্দেশনা ছাড়াই শিশুদের ইচ্ছে পূরণ করে চলেছেন।

এ রকম মিশ্রিত পরিস্থিতি থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্পকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। দেশের মানুষ সবাই ইন্টারনেট পাবে তাদের প্রয়োজন আনুযায়ী। সে প্রয়োজন কি তা বোঝার আগেই হারিয়ে গেছে মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপনের বাহারী প্রচারে। ১৩ বছর হলো আমরা সাবমেরিন কেবল লাইনের সংযোগ পেয়েছি, ১০ বছর আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছি কিন্তু মানুষের ঘরে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছাতে পারিনি। যে কিশোর বা যুবা স্বপ্ন দেখছেন তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প বাস্তবায়নের একজন গর্বিত অংশীদার হবেন তাকে বলা হচ্ছে তার স্বপ্নটা যেন ইংরেজীতে উপস্থাপন করা হয়। নীতিমালার সঙ্গে বাস্তবের ফারাক কি ও কোথায় তা না বুঝে আমরা একটি শিশুকে হত্যাকা-ের গেম খেলতে দিচ্ছি। নেপালের মতো দেশ মাস ছয়েক আগে ‘পাবজি’ গেম তার দেশে নিষিদ্ধ ও ব্লক করে দিল আর আমাদের দেশে শিশুরা বলছে বন্ধ করে দিলে আমরা ভিপিএন করব! অন্যদিকে তরুণদের উৎসাহ দিচ্ছি গেম বানাতে। বিশ্বমানের বানাতে হলে তাকে যা পাওয়া যায় তা-ই অনুসরণ করতে হয় আমরা তা লক্ষ্য করছি না। কিন্তু বুদ্ধির গেম খেলতে একটা প্রতিযোগিতাও আমরা আয়োজন করিনি। বছর বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে ঢাকায় পাঁচতারা হোটেলে মেলা করি কিন্তু সেগুলো বেশিরভাগই প্রদর্শনী, বিপণন ও প্রচারের জন্য, শিক্ষার জন্য নয়, তাহলে সেগুলো আয়োজন হতো ঢাকার বাইরে।

আশার কথা, মাননীয় হাইকোর্ট একটা উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন যদি নীতিমালা আর বাস্তবের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়!

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ