বুধবার , ১৬ অক্টোবর ২০১৯ |

ঝাড়ু দিয়া লজ্জা দিবেন না

  রবিবার , ১১ আগষ্ট ২০১৯

আহসান কবির

রবীন্দ্রনাথ শুধু শুধু বিশ্বকবির তকমা পাননি। উনি প্রায় একশত বছর আগে ধারণা করেছিলেন শত বছর পরে বাংলাদেশে কী কী ঘটতে পারে। তাই তিনি আগাম লিখে গিয়েছিলেন-
করিতে ধুলা দূর/জগৎ হল ধুলায় ভরপুর…..এমনি সব গাধা/ধুলারে মারি করিয়া দিল কাদা! (প্রিয় পাঠক ‘জুতা আবিষ্কার’কবিতাটা পড়েছি অনেক আগে। ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমাপ্রার্থী। জুতো না পরে রাস্তা পরিষ্কারের নামে ঝাড়ু– দিলে মানুষের পা আর জগতের কী অবস্থা হয় রবীন্দ্রনাথ ব্যঙ্গ করে সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন) ঝাড়ু দিয়ে এডিশ মশা মারা যায় না। রবীন্দ্রনাথ একালে জন্মালে নির্ঘাত লিখতেন-
ঝাড়ু দিয়া করিতে ডেঙ্গু দূর/ দেশটা করিল ধূলায় ভরপুর….ঝাড়ুর গোলক ধাধা/ঝাড়ুদার সব গাধা/ঝাড়ু দিবেন ধুলা নিবেন না?/ঝাড়ু দিয়া লজ্জা দিবেন না!

জুলাই আর আগস্টের দিনগুলোতে (২০১৯) ডেঙ্গু নিয়ে বাংলাদেশ তোলপাড়। কেউ বলছে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বলছে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব। কেউ বলছে ডেঙ্গু মহামারি! আসলে কোনটা?

মহামারির রূপ ছিল ভিন্ন। মানুষ তখন একালের মতো সচেতন ছিল না কিংবা রোগ সম্পর্কে আগাম ধারণা পেত না। ছিল না বিভিন্ন মিডিয়ার ‘মহামারিময়’ প্রচারণা। চৌদ্দ শতাব্দীতে ভয়াবহ এক মহামারির নাম ছিল ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ’। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বানিজ্যের মাধ্যম ছিল কৃষ্ণসাগর। জাহাজে করে মালামাল আনা নেয়া হতো। ডেঙ্গুর জীবাণু পরিবাহক যেমন এডিস মশা তেমনি জাহাজের ইঁদুরদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তো প্লেগ। ১৩৪৭ সাল থেকে ১৩৫২ সালের ভেতর ইউরোপের কয়েক কোটি মানুষ মারা যায় প্লেগে। ইদানীং কেউ কেউ এই মহামারি ইবোলা ভাইরাসের জন্য ঘটেছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন। প্লেগের কারণে প্রায় তিনকোটি লোকের মৃত্যুর ইতিহাস আছে ৫৪০ সালে। মিশর এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং এই রোগের বাহক ছিল ইঁদুর। সর্বশেষ উনিশ শতকে প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল চীন, আফ্রিকা, ইকুয়েডর ও আমেরিকায়। এক থেকে দেড়কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল এই মহামারিতে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯১৮ সালের শেষে ও ১৯১৯ সালের শুরুতে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সারা বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয় ইনফ্লুয়েঞ্জায়। ‘দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানাডেমিক’ নামের এই মহামারি কেড়ে নিয়েছিল এক কোটি মানুষের প্রাণ আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা গিয়েছিল দুই কোটি মানুষ।

ইনফ্লুয়েঞ্জার আগে ১৯১৬ সালে নিউইয়র্ক শহর থেকে ছড়িয়ে পরেছিল পোলিও। পোলিও মহামারির আকারে এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হানা দিয়েছে। পোলিওর কারণে অগনিত মানুষ পঙ্গু হয়েছে তবে কতো মানুষ মারা গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এছাড়াও স্মল পক্স বা গুটি বসন্ত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পরেছিল এই উপমহাদেশে। উনিশ শতকে এই উপমহাদেশে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা যায় গুটি বসন্তে। ডেঙ্গু ইদানিং বেশি হানা দিলেও এটা রোগ হিসেবে বেশ পুরোনো। চীনা প্রাচীন নথিতে নবম শতাব্দীতে এমন রোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৭৯ সালে মশা ও ভাইরাসবাহিত এই রোগের নামকরণ করা হয় ডেঙ্গু। বাংলাদেশে ২০০০ সালে যখন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হয় তখন এই রোগকে বলা হয়েছিল ‘ঢাকা ফিভার’।

২০১৮ সালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল (সরকারি হিসেব অনুযায়ী) ১০ হাজার ১৪৮ জন। আর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে এসেছিল ১৫ হাজার রোগী! ঢাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে এবং অনেক মানুষ মারা গেলেও সরকারের মন্ত্রী নেতাদের ভাষ্যটা এমন– ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দক্ষিণের মেয়র সাইদ খোকন সাহেব তার অধীন কিছু ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুমুক্ত ঘোষণা করলেও সেই সব ওয়ার্ডে শতাধিক ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান মিলেছে। হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা সিট পাচ্ছে না। অথচ ফিলিপাইনে এক লাখ মানুষ আক্রান্ত হলে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছিল। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের নেতা মন্ত্রীরা এটাকে মোটামুটি কৌতুকের পর্যায়ে নামিয়ে আনেন। জনপ্রিয় দৈনিক, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন দৈনিকের খবর ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন জনের স্ট্যাটাস সাজালে যা দাঁড়ায় তা এমন–

    এক. এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো! (জন্মহার বেশি বোঝাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক সাহেব এই কথা বলেছিলেন। অবশ্য বহু বছর আগে কাজী নজরুল বলেছিলেন- বাহিরের দিকে বাড়িয়াছি যত ভেতরের দিকে তত/গুনতিতে মোরা বাড়িয়া চলেছি গরু ছাগলের মতো!
    দুই, এডিস মশা হচ্ছে ‘এলিট’ মশা! দেশের মানুষ বড়লোক হচ্ছে। তাই বড়লোকদের অসুখ ডেঙ্গু বাড়ছে!
    তিন. ডেঙ্গু আর গুজব একসূত্রে গাথা!
    চার. প্যান্ট পরুন গোড়লির নীচ পর্যন্ত। প্রয়োজনে মোজা পরুন। মশা কামড়াতে পারবে না (প্রয়োজনে প্রচণ্ড গরমে কোট টাই পরে মশাদের বিরুদ্ধে কামান দাগান!)
    পাঁচ. প্রতিদিন ১৫ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। ১০ জন মানুষ মারা যান সাপের কামড়ে। আর কয়েক মাসে মাত্র ১০ জন ডেঙ্গু রোগী মারা গেছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আমরা এসব খবর রাখি না! স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাহেব এসব বলেই থামেননি। ঢাকা শাহজালাল আর্ন্তজাতিক এয়ারপোর্টের আশেপাশে ২৮টি বিলবোর্ড দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ওনার বাণী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। বিলবোর্ড এর পেছনে হয়তো অনেক এডিস মশা ইতোমধ্যে জন্ম নিয়েছে!

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র জনাব মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সাহেব বলেছেন- ছেলেধরার গুজব আর সাড়ে তিনলাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার গুজব একসূত্রে গাঁথা (তিনি অবশ্য গোড়ালির নীচে প্যান্ট এবং মোজা পরতেও উপদেশ দিয়েছেন। তাঁকে ধন্যবাদ কারণ এখনও তাঁকে ঝাড়ু– দিতে দেখা যায়নি!) এবার তাই গুজবের দিকে নজর দেই-

    এক. এডিস মশা হাটুর উপর কামড়ায় না। ভোর আর সন্ধ্যায় কামড়ায়।
    দুই. কমোডে বা প্যানে আর বেসিনে হারপিক ঢেলে দিলে এডিস ধ্বংস হবে!
    তিন. ল্যাভেন্ডার গাছ লাগান ডেঙ্গু থাকবে না! (কেউ কেউ তুলশী গাছ লাগাতেও বলেছেন)

ডেঙ্গু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে কিন্তু এদেশবাসীর সৃষ্টিশীলতাও বাড়াচ্ছে। কবিতা, গান, গল্প, ছড়া আর কার্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন-
এক.
তোমার স্বামীর হাসপাতালে কেবিন খালি নেই?
ডেঙ্গু নিয়ে দেবদাসটা মরতে আসিবেই!
দুই.
নাম পেয়েছি সিনেমার/ওরা কেন ঝাড়ুদার?
তিন
দেশ ভোগে ডেঙ্গুতে মানুষ অসহায়/তবু তুমি যেতে পার মালয়েশিয়ায়!
চার.
ঢাকায় নাকি অনেক পাগল এডিসের ফাঁদ পাতা
ডেঙ্গু আর ছেলেধরা একসূত্রে গাঁথ!

বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইনে মশা মারার কাজে ব্যবহৃত ফগিং মেশিন ও ধোয়ার ছবি দেখা গেছে। সিটি কর্পোরেশনের মশা মারার ওষুধ কেনা নিয়ে কেলেংকারির সংবাদ ছাপা হয়েছে। একাধিক রিপোর্টে বলা হয়েছে সিটি কর্পোরেশানের মশা মারার ওষুধে এখন আর মশা মরে না তবে ওষুধ কেনাকাটায় অনেকের পকেট ভারি হয়! ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়াতে অনেকের অনেক লাভ! ওষুধ কিনতে যেয়ে কারো পকেট ভারি হয়, সরকার আর নেতা মন্ত্রীদের বাণী-ভাষণ আর বিলবোর্ড তৈরিতে কারো কারো পকেট ভারি হয়। রেডিও টেলিভিশন আর পত্রিকার নিউজ আইটেম বাড়ে। হাসপাতাল ও ওষুধের ব্যবসা বাড়ে, মশা নিধনের ওষুধ ও যন্ত্রের দাম বেড়ে যায়, দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে এসব। আর এই ডেঙ্গুকে সামনে রেখে ভুলিয়ে দেয়া যায় সব। ভুলিয়ে দেয়া যায় ব্যাংক ব্যবস্থার অচলাবস্থা, ব্যাংকের টাকা লুট কিংবা হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের কথা। ভুলিয়ে দেয়া যায় শেয়ার বাজারের ধ্বস আর ২৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা। যারা ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক তারা আত্মহত্যা না করলেও ডেঙ্গুতে ধুকে মরতে পারবে! ভুলিয়ে দেয়া যায় বন্যার কারণে ফসল ধ্বংস, রাস্তাঘাট নষ্ট, ঈদে বাড়ি যাত্রায় ভোগান্তি, রিফাত- মিন্নি কিংবা গডফাদার এমপি পুত্রের ঘটনা কিংবা ক্রমশ প্রকাশিত হতে থাকা ধর্ষণের ঘটনা!

তারপরও ডেঙ্গু না হোক কারো। প্রয়োজনে ঘরের আঙিনা ঝাড়ু দিন,বাসা বাড়ি পরিষ্কার রাখার মতো অন্তরটা পরিষ্কার রাখুন। ফুলের টব, সোফার নীচে কিংবা অপিরষ্কার জায়গায় যেখানে এডিস মশা বেড়ে ওঠে সেসব জায়গা, আঙিনা ও ছাদের গাছপালা পরিষ্কার করে এসবের পরিচর্যা করুন। টবে, ড্রামে-ডাস্টবিনে জমে থাকা পানি বদল, প্রয়োজনে (বড় প্যান্টটা নামাযের সময় গুটিয়ে নিলেই হবে!) হাঁটুর নীচে প্যান্ট পরা কিংবা দিনরাত মশারির ভেতর কাটানোর পরিকল্পনা নিয়ে ডেঙ্গুমুক্ত থাকুন। শুধু ভুলে যেয়েন না যে বা যারা ডেঙ্গু ইস্যুতে সাধারণ মানুষের সাথে মশকরা করছে তাদের। যারা মশকরা করছেন তারা দয়া করে নিজেদের অন্তর ঝাড়ু দিন, আমাদের সামনে ‘মশকরার আরেক নাম ঝাড়ু দিয়া লজ্জা দিবেন না’!
--  রম্য লেখক, নাট্যকার ও কলামিষ্ট
হেড অভ প্রোগ্রাম
বৈশাখী টিভি

 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ