বৃহস্পতিবার , ২১ নভেম্বর ২০১৯ |

একজন দার্শনিকের কথা

  বৃহস্পতিবার , ২৯ আগষ্ট ২০১৯

অধ্যাপক সাইদুর রহমান (১৯০৯-১৯৮৭)

মো: মিজানুর রহমান

অধ্যাপক সাইদুর রহমান  (১৯০৯-১৯৮৭) শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, সমাজসেবক। ১৯০৯ সালের ১ মে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রছুল্লাবাদ গ্রামে তাঁর জন্ম। তিনি বরাবরই একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃতিত্বের পরিচয় দেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে স্নাতক সম্মান (১৯৩১) ও এমএ (১৯৩২) উভয় পরীক্ষায় তিনি অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পরপরই তিনি রাজশাহী কলেজে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পেশাগত জীবনে সাইদুর রহমান বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতার বিখ্যাত বেকার হোস্টেলের সুপার, চট্টগ্রাম বিভাগের ইন্সপেক্টর অব স্কুলস, শিক্ষা বিভাগের স্পেসাল ইন্সপেক্টর অব এডুকেশন, স্পেসাল অফিসার ইন এডুকেশন ইত্যাদি পদে দায়িত্ব পালনে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। সাইদুর রহমান ১৯৫৭ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে বিলেত যান এবং ‘অরগ্যানাইজেশন এন্ড এডমিনিস্ট্রেশন এন্ড ফারদার এডুকেশন’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬৩ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এ সময় তিনি বিভিন্ন সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে কলেজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। কলেজে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া সহশিক্ষার ব্যবস্থা তিনি পুনরায় চালু করেন। বিশাল কলেজের বিপুল সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল কর্মকান্ডকে যুবসমাজ ও দেশবাসীর মধ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি কলেজ বার্তা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর আমলেই এ কলেজে দুই শিফটে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয় এবং নৈশকালীন বি.এসসি কোর্স চালু হয়। এছাড়া তিনি ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন গার্লস কলেজসহ দেশের বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাইদুর রহমান ১৯৭২ সালের ৩ মে থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানী বাবদ প্রাপ্ত তাঁর সমুদয় অর্থ দিয়ে ১৯৭৫ সালে ‘সাইদুর রহমান ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়। ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন অনুষদের মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান, মানবকল্যাণ, মানুষ ও পরিবেশ, বিজ্ঞানের দার্শনিক দিক ইত্যাদি বিষয়ে বক্তৃতামালার আয়োজন করা। এই বক্তৃতামালা প্রথম শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এবং বর্তমানেও তা প্রায় নিয়মিত চলছে। এখানে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন বিষয়ে মননশীল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও বক্তৃতা প্রদান করেন। সাইদুর রহমান নারীশিক্ষা ও নারীর উন্নয়নে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ঢাকায় তেজগাঁও মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত উক্ত কলেজের অবৈতনিক অধ্যক্ষ ছিলেন। সাইদুর রহমান  বাংলাদেশ দর্শন সমিতি র একজন সক্রিয় সংগঠক ছিলেন এবং সমিতির জন্মলগ্ন (১৯৭৩) থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তান দর্শন কংগ্রেসেরও একজন সক্রিয় সংগঠক ও সদস্য ছিলেন।

ছাত্রজীবন থেকেই সাইদুর রহমান মুক্ত ও স্বাধীন চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি সকল প্রকার গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। তাঁর অবিচল আস্থা ছিল মার্কসের সমাজতন্ত্রে। মানবকল্যাণের সহায়ক শক্তি হিসেবে তিনি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা এবং তাঁর প্রগতিশীল কর্মকান্ডের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে মওলানা ভাসানীর ‘এ্যান্টি স্টেট ব্রেইন ট্রাস্ট’ মনে করত। একারণে তৎকালীন সরকার তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করে এবং ছাত্রছাত্রীদের সাহচর্য থেকে দূরে রাখার জন্য তাঁকে এক পর্যায়ে ডি.পি.আই অফিসে অরফেনেজ অফিসার হিসেবে বদলি করে দেয়। এ পদে যোগদান করার ফলে বরং তাঁর পক্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করার সুযোগ ঘটে। তিনি বিভিন্ন এতিমখানা পরিদর্শন করে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি নিউ স্কিমের মাদ্রাসাসমূহকে মাধ্যমিক স্কুলে রূপান্তরিত এবং তাতে বাধ্যতামূলকভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা ও মেয়েদের ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন। সাইদুর রহমান স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তাঁর নিজ বাড়িতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য ছোট একটি হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন। সাইদুর রহমানের একমাত্র গ্রন্থের নাম এ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলামিক কালচার অ্যান্ড ফিলোসফি এবং বিখ্যাত প্রবন্ধসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ‘অবস্থা বনাম ব্যবস্থা’, ‘প্রগতির দর্শন’, ‘সংশয়’, ‘পরার্থপরতার মানসিকতা’ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে দর্শনচর্চার ইতিহাসে সাইদুর রহমানের দর্শন ‘কল্যাণ দর্শন’ নামে পরিচিত। কল্যাণ দর্শনের রূপরেখা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে: জীবনসংগ্রামের লক্ষ্য হবে নবীন পরিবেশ সৃষ্টি এবং তাতে সামষ্টিক কল্যাণ গুরুত্ব পাবে, অবসান হবে শোষণ-বঞ্চনা-অন্ধকুসংস্কারের। কল্যাণ দর্শন হচ্ছে প্রগতির দর্শন। এ দর্শনের অবকাঠামোতে সমাজ গঠনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরার্থপর মানসিকতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা। নিতান্ত সহজ-সরল জীবনযাপনকারী এবং মানবদরদী সাইদুর রহমান দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর অধ্যাপনা এবং সমাজসেবা করে ১৯৮৭ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকাস্থ নিজ বাসভবন ‘সংশয়’-এ মৃত্যুবরণ করেন।


 উপ-সম্পাদকীয় থেকে আরোও সংবাদ

ই-দেশকাল

আর্কাইভ